চেতনার ওপর ওই সব ভয়ানক ছায়াছবির সঙ্গে এই মমতাময় মুখখানার কোনো সঙ্গতিই খুঁজে বার করতে পারল না সেঙাই। নির্মিমেষ তাকিয়েই রইল। কেমন করে সে পাদ্রী, সমতলের বাসিন্দা, মারধর এবং আতঙ্ককর পরিবেশ থেকে এই করুণাময়ীর কাছে এল,বুঝেই উঠতে পারছে না সেঙাই। এ তার ধারণার বাইরে। আবছা সন্ধ্যার এই ছায়াছায়া অন্ধকারে কি একটা অবিশ্বাস্য স্বপ্ন দেখছে সে?
নারীমুখটি আরো অনেকটা ঝুঁকে এল, নাম কী তোমার?
সেঙাই। হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে উঠল সেঙাই। মাচানের বিছানায় উঠে বসতে বসতে বলল, সারুয়ামারু কোথায়? সে তো আমার সঙ্গেই ছিল।
এই তো। পাশের মাচানে একটা ক্ষীণ স্বর শোনা গেল, একেবারে নড়তে পারছি না রে সেঙাই। শয়তানের বাচ্চারা মারের চোটে হাড় পাঁজরা চুর চুর করে দিয়েছে। কাতরাতে কাতরাতে উঠে বসল সারুয়ামারু।
সেঙাই বলল, শয়তানেরা মারাত্মক। ইজা হুবুতা।
একটুক্ষণ চুপচাপ।
আচমকা সেঙাই চেঁচিয়ে উঠল, আমরা এখানে কেমন করে এলাম রে সারুয়ামারু?
রানী গাইডিলিওর লোকেরা নিয়ে এসেছে। আমাদের নাকি হুই পুলিশরা কোহিমার রাস্তায় ফেলে দিয়ে গিয়েছিল। একেবারে হুঁশ ছিল না, এমন মার দিয়েছিল রামখোর ছায়েরা। একটু থামল সারুয়ামারু। একসঙ্গে এতগুলো কথা বলে রীতিমতো হাঁপানি ধরে গিয়েছে। ফুসফুস ভরে হুস হুস করে বারকয়েক বাতাস টেনে আবার বলতে শুরু করল সে, রানী গাইডিলিও না থাকলে কোহিমার পাহাড়ে মরেই থাকতাম আমরা।
রানী গাইডিলিও! কে? কই! বিস্ময়ে গলাটা কাঁপা কাঁপা শোনাতে লাগল সেঙাই-এর।
হুই যে। সামনের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিল সারুয়ামারু।
সেই নারীমুখ–দু’দিন পরে চোখ মেলে যাকে প্রথম দেখেছে সেঙাই। এক অপরূপ জ্যোতি সেই মুখের চারপাশে স্থির হয়ে রয়েছে। রানী গাইডিলিও। এঁকে নিয়ে এক অদ্ভুত, বিস্ময়কর গল্প বলেছিল মাধোলাল। রানী গাইডিলিও। এঁকে নিয়ে পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির সঙ্গে তার বচসা হয়েছিল। ধারাল বিরাট বর্শা ছুঁড়ে ক্ষতবিক্ষত করেছিল তার কবজি। সেই গাইডিলিও, যাঁর ছোঁয়ায় দেহ থেকে মৃত্যু পলাতক হয়, জরা ফেরারি হয়। সেই গাইডিলিও, হাত বাড়িয়ে এখন তাকে ছোঁয়া পর্যন্ত যায়। বিস্ময়ে, অদ্ভুত ধরনের ভয়ে, নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেঙাই। তার কপিশ চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসবে।
একসময় অস্ফুট গলায় চিৎকার করে উঠল সেঙাই, তুই রানী গাইডিলিও!
নিরুত্তর দাঁড়িয়ে রইলেন গাইডিলিও। শুধু একটি প্রসন্ন হাসি একটু একটু করে সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল তার।
সারুয়ামারু তৎপর হয়ে উঠেছে, হুই যে তোকে বলেছিলাম, রানী গাইডিলিও ছুঁয়ে দিলে সব রোগ সেরে যায়। দ্যাখ, গেল কিনা? সায়েবের লোকেরা আমাদের মেরে তো বেহুঁশ করে দিয়েছিল। কোহিমার পাহাড়ে পচে পচে মরে যেতাম। রানীর লোকেরা আমাদের তুলে নিয়ে এল। রানী ছুঁয়ে দিল। সব রোগ চলে গেল। তাই না? আমার তো কালই জ্ঞান ফিরেছে। তুই তখন ব্যথার ঘোরে বিড়বিড় করে কী যেন বকছিস। ভাবলাম আনিজাতে পেয়েছে।
তারপর? আতঙ্কে শ্বাসনলীটা যেন চেপে এল সেঙাইর। মনের ওপর খোনকের মুখখানা ভেসে উঠল। সালয়ালা গ্রামের তামুন্যু (চিকিৎসক) ব্যারামের ঘোরে বিড়বিড় করার জন্য খাদে ফেলে দিয়েছিল খোনকেকে। গ্রামে থাকলে তার বরাতেও খোকের মতো অপঘাত ছিল। ভয়ে আতঙ্কে আর্তনাদ করে উঠল সেঙাই, তারপর কী হল সারুয়ামারু?
হুই রানী গাইডিলিও তোকে বাঁচিয়ে দিয়েছে, আমাকে বাঁচিয়েছে। সব আনিজা ভেগে গেছে।
অসীম কৃতজ্ঞতায় পাহাড়ী জোয়ান সেঙাই-এর মনটা ভরে গেল। আবার তাকাল সে রানী গাইডিলিওর মুখের দিকে। আচমকা সেই মুখের ওপর আর একজনের ছায়া পড়ল। মেহেলীও একদিন তাকে সালুয়ালা গ্রামের অতল খাদ থেকে উদ্ধার করেছিল( নিশ্চিত অপমৃত্যুর হাত থেকে তুলে এনে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। সেঙাই ভাবতে লাগল। তার ভাবনাটা সুষ্ঠু শৃঙ্খলাবদ্ধ না হলেও, এলোমেলো হলেও, মোটামুটি এইরকম। মেহেলী আর গাইডিলিও। দুজনের মধ্যে এক জায়গায় মিল রয়েছে। সে মিলটি সেবার, মমতার। দুজনেই তাকে বাঁচিয়েছে। এ ছাড়া আপাতত অন্য কোনো সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
মেহেলীর সুন্দর তামাটে শরীর সারাদেহের কামনাকে দাবানলের মতো জ্বালিয়ে তোলে। আর গাইডিলিওর এই কমনীয় মুখখানার দিকে তাকালে রিপুর ফণারা টলে পড়ে। এতকাল ভয়, বিস্ময়, রোষ এবং প্রতিহিংসা ছাড়া অন্য কোনো বোধ জাগত না সেঙাইর মনে। এখন, এই মুহূর্তে গাইডিলিওকে দেখতে দেখতে স্থূল, অতি স্পষ্ট আদিম কতকগুলি অনুভূতির সঙ্গে সভ্য জগতের একটা অদ্ভুত অনুভূতি মিশে গেল। তার নাম সম্ভ্রম। পাহাড়ী মানুষ সেঙাইর অস্ফুট চেতনা সম্ভ্রমের এক অনুভূতিতে ভরে গেল। এমনটা এর আগে আর কোনোদিনই হয়। নি তার।
মেহেলী আর গাইডিলিও। মেহেলী যেন দু’টি বাহুর মধ্যে দেহের ভোগ এবং উপভোগের জন্য একপিণ্ড কোমল সুস্বাদু নারীমাংস। গাইডিলিও ধরাছোঁয়ার মধ্যে থেকেও অনেক দূরের। তার দিকে হাত বাড়ানো যায় না। অশুচি মন তার উপস্থিতিতে অবশ, আড়ষ্ট হয়ে যায়।
আচমকা সেঙাই বলল, তুই নাকি সায়েবদের সঙ্গে লড়াই করবি?
চমকে উঠলেন রানী গাইডিলিও, কে বললে তোমাদের?
মাথোলাল। হুই যে কোহিমাতে তার দোকান রয়েছে। সেঙাই বলতে লাগল, মাধোলালের কাছে তোর আর গান্ধিজির কথা জেনে এসেছিলাম। ফাদার আমাদের কাছ থেকে সেসব শুনে নিল। মাধোলাল তোর আর গান্ধিজির কথা বলতে বারণ করে দিয়েছিল। হুই ফাদার শুনে নিয়ে আমাদের বেইমান বানাল। বিশ্বাসঘাতক করল। উত্তেজনায় সেঙাইর চোখ দুটো ঝকমক করতে লাগল।
