কে তুই?
আমি মেহেলী। একটু থামল মেহেলী। ইতিউতি তাকিয়ে আবার বলল, আমি এবার যাই।
অসীম কৃতজ্ঞতায় মনটা বিগলিত হয়ে গিয়েছিল বুড়ি বেঙসানুর। কিন্তু মেয়েটার নাম শুনেই স্নায়ুগুলো রাগে উত্তেজনায় টগবগ করে উঠল। মেহেলী! পোকরি বংশের মেয়ে, যে বংশ তার আঠারো বছরের যৌবনকে ফালা ফালা করে সাবাড় করেছে, তার জীবনকে নিঃসঙ্গ করে দিয়েছে চিরকালের মতো, তার সোয়ামী জেভেথাঙ ওই পোকরি বংশের মেয়ে নিতিৎসুকে ছিনিয়ে আনতে গিয়ে লড়াই বাধিয়ে খতম হয়ে গিয়েছে। সেই বংশের উত্তরকাল। মেহেলী। অনেকখানি সংশয় পুঞ্জীভূত হল মনে। অস্ফুট চেতনার ওপর দিয়ে কুটিল একটি সন্দেহের ছায়া ঘনিয়ে এল। এই মেহেলীকে নিয়ে পোকরি আর জোহরি বংশে নতুন আত্মীয়তা, না নতুন এক খণ্ডযুদ্ধের সূচনা? কিন্তু মেয়েটার মুখখানা কি সুন্দর! কি আশ্চর্য নির্দোষ! স্নিগ্ধ লাবণ্যে ঝলমল করছে সারা দেহ। এই মেয়েই সেঙাইর লাগোয়া লেন্য, পিরিতের জোয়ানী। সেঙাইর কামনার মানুষী। মোরাঙের নারীহীন শয্যায় সেঙাইর মনে এই মেয়েই একটি সুখস্বাদ স্বপ্নের সঞ্চার করে রাখে! এই মেয়েকে না ভালোবাসা যেন অপরাধের। হঠাৎ সব সংশয়, সব সন্দেহ জলের লেখার মতো মুছে গেল বুড়ি বেঙসানুর চেনা থেকে। প্রসন্ন উদারতায় মনটা ভরে উঠল।
মেহেলী–পোকরি বংশের মেয়ে। সালুয়ালা গ্রামের মেয়ে। বিচিত্র রহস্যময়ী। সে কেমন করে এল কেলুরি বস্তিতে! কিসের প্রেরণায়? এতক্ষণ তন্ময় হয়ে অনেক কিছু ভাবছিল বুড়ি বেঙসানু। এবার সচেতন হয়ে তাকাল সে। আশ্চর্য, কখন যেন অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে মেহেলী। এ কি, ফাসাও আর নজলিও নেই।
চারিদিকে তাকাল বুড়ি বেঙসানু। তিনটে ছেলেমেয়ের একটাকেও কোথাও খুঁজে বার। করতে পারল না সে। আচমকা কেসুঙের পেছন দিক থেকে খিলখিল হাসির শব্দ শোনা গেল। চমকে ঘুরে তাকাল বুড়ি বেঙসানু। তার চোখদুটো খুশিতে মোলায়েম হল। মেহেলী, ফাসাও এবং নজলি বিশাল খাসেম গাছটার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে। গুটি গুটি পায়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়াল বেঙসানু।
মেহেলী উঠে দাঁড়াল, আমি যাই।
যাবি কেন?
তুই তো আমাকে সেঙাইর বউ করবি না; তবে আর থেকে কী করব? চলেই যাই।
কৌতুকের আভাস ফুটে বেরুল বেঙসানুর চোখেমুখে। বলল, গোসা হয়েছে? তুই কেমন করে জানলি, তোকে সেঙাইর বউ করব না?
আমি সদ্দারের ভেতরের ঘর থেকে সব শুনেছি।
হু-হু। কাঁকড়ার দাঁড়ার মাতা শীর্ণ দুটো হাতের আঁজলে পরম মমতায় মেহেলীর মুখখানা তুলে ধরল বুড়ি বেঙসানু, তোকে ছাড়া আর কাউকে সেঙাইর পাশে মানায় না। তোকে তো আগে দেখিনি, দেখলে কি ওকথা বলতাম?
সারাটা দেহে আনন্দর শিহরন খেলে গেল মেহেলীর। খুশি খুশি মুখে তাকিয়ে রইল পাহাড়ী মেয়ে। নির্বাক, একেবারেই চুপচাপ।
বুড়ি বেঙসানু বলল, তুই যে এ বস্তিতে চলে এলি মেহেলী! আমরা তো তোদের শত্রু।
হাসিমুখে মেহেলী বলল, তোর নাতিকে দেখে মন মজেছে। শত্রুতার কথা ভুলে গেছি। আমার বাপ টেমি খামকোয়ান্নর (বাঘমানুষ) সঙ্গে আমার বিয়ে দিতে চায়। সেঙাই ছাড়া আমি কাউকে বিয়ে করব না। তাই নদী পেরিয়ে পালিয়ে এসেছি। তোদের সদ্দারকে ধরমবাপ ডেকে তার বাড়িতে রয়েছি।
অকপট স্বীকারোক্তি। মনোরম একখানা মুখ। মুগ্ধ দৃষ্টিতে মেহেলীর দিকে তাকিয়ে রইল বুড়ি বেঙসানু।
মেহেলী বলল, সেঙাই কোহিমা থেকে কবে ফিরবে ঠাকুমা?
কী জানি। খিঁচিয়ে উঠতে গিয়েও পারল না বুড়ি বেঙসানু। পোকরি বংশের মেয়েটা যেন জাদু করেছে তাকে। কোমল গলায় বলল, বুঝেছি
কী বুঝেছিস?
সেঙাইকে ছাড়া সোয়াস্তি পাস না, ঘুম হয় না। লজ্জা কি, বয়েসকালে আমাদেরও হত না। বুড়ি বেঙসানু মেহেলীকে দেখতে দেখতে তার যৌবনকালকে আস্বাদ করল যেন। গাঢ় গলায় বলল, ভয় নেই, সেঙাই ফিরলে জোড় বেঁধে দেব তোদের।
.
৩৩.
দু’দিন পর চোখ মেলল সেঙাই। টকটকে লাল চোখ। সেই চোখের মণিতে ছায়া পড়ল এক অপরূপ নারীমুখের। অনেকটা সময় নিষ্পলক তাকিয়ে রইল। বিস্ময়ে কেমন যেন দিশেহারা হয়ে গিয়েছে সে। কথা বলতে পর্যন্ত ভুলে গিয়েছে।
অপরিচিত নারীমুখ। পরম মমতায় আর লাবণ্যে সে মুখ মাখামাখি হয়ে রয়েছে। মুখখানা আরো কাছাকাছি ঝুঁকে এল। বলল, এখন কেমন লাগছে?
দু’দিন একেবারে বেহুশ পড়ে ছিল সেঙাই। এর মধ্যে কখন কোথায় কী ঘটেছে, তা সে জানে না। সব কেমন একটা অসত্য স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। একটা অবাস্তব বিভ্রমের মতো আচ্ছন্ন চেতনার ওপর দিয়ে ছায়াছবির মিছিল সরে গেল সেঙাইর। মাথোলাল, গান্ধিজির লড়াই, পাদ্রীসাহেব, সেই চার্চ, বেয়নেট নিয়ে পুলিশের ঝাঁপিয়ে পড়া। তারপরেও একটু হুঁশ ছিল তার। সারুয়ামারুর সঙ্গে কাদের যেন খানিকটা হাতাহাতি, হুমকি, চেঁচামেচি, গর্জন। তারও পর কারা যেন কোহিমার রুক্ষ, শক্ত এবং ধারাল পথের ওপর দিয়ে তাদের একটা ঘরে নিয়ে। গেল। আসান্যুরা (সমতলের লোক) এল। একটা লোকের বিরাট একজোড়া গোঁফ। আরো কয়েকটা নোক এসেছিল অদ্ভুত এক ধরনের লাঠি নিয়ে এর আগে ব্যাটন দেখে নি সেঙাই)। গুফো লোকটা কী একটা বলবার সঙ্গে সঙ্গে তার পিঠের ওপর সেই লাঠির ঘা পড়তে লাগল একটার পর একটা, অনেক। মনে হচ্ছিল, হাড়গুলো গুড়ো গুড়ো হয়ে যাচ্ছে। অসহ্য যন্ত্রণা। তারপর আর জ্ঞান ছিল না। ছবিগুলোর মধ্যে কোনো মিল নেই, কোনো ধারাবাহিকতা নেই। সব টুকরো টুকরো, অসংলগ্ন।
