আমি দেব? কেন? তেরছা নজরে তাকাল বুড়ি বেঙসানু।
তোর নাতির বউকে খাওয়াচ্ছি। সেই খাওয়ার দামটা দেবে কে?
আমার নাতির বউ! সে আবার কে? বিস্ময়ে বুড়ি বেঙসানুর গলা অদ্ভুত শোনায়, সেঙাইর বিয়ে হল কবে?
হু-হু, সেঙাইর বউ। হুই পোকরি বংশের মেয়ে। নাম হল মেহেলী। বিয়ে এখনও হয়নি। কোহিমা থেকে সেঙাই ফিরলেই হবে। সেই বউর খোরাকি দিয়ে যাবি এখন থেকে।
ইজা রিহুগু! কদর্য একটা খিস্তি আউড়ে বুড়ি বেঙসানু বলল, আমার ঘরে এক দানা খাবার নেই। তার ওপর নাতির বউকে খাওয়াব! এখনও বিয়েই হয়নি যার সঙ্গে!
এতক্ষণ গভীর সংযমের পরীক্ষা দিয়েছে বুড়ো খাপেগা। এবার সে হুঙ্কার দিয়ে উঠল, তোর নাতি জোয়ান ঘুড়িটাকে নিয়ে মজা মারবে, আর আমি বুঝি খাইয়ে পরিয়ে তাকে পুষব? তার তাজা শরীর পাহারা দেব? মাগনা ওসব হবে না।
তার আমি কি জানি। সেঙাই এলে তার কাছে চাল মাংস চাইবি। তার বউ হবে, সে বুঝবে। সে তার বউকে খাওয়াবার আর পুষবার ভাবনা ভাববে। তুই আমাকে চাল দে, মাংস দে। ফাসাও আর নজলিটা না খেয়ে রয়েছে। শেষ দিকে কথাগুলো বড়ই করুণ শোনাল বুড়ি বেঙসানুর।
চাল নিবি! মাংস নিবি! তার দাম এনেছিস?,
হু-হু– পাশ থেকে জঙগুপি কাপড়ের একটা বোঁচকা সামনে টেনে এনে খুলে ফেলল বেঙসানু। সদ্যকাটা একটা মৌচাক আর দুটো বর্শা।বর্শার ফলা রোদের আলোয় ঝকমক করে উঠল।
আচমকা ঘটে গেল ঘটনাটা। বাদামি রঙের পাথরখানা থেকে মৌচাক আর বর্শার ফলা দুটোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল বুড়ো খাপেগা। সেগুলো তুলে নিয়ে সাঁ করে সামনের ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল মুহূর্তে।
প্রথমে ঘটনার আকস্মিকতায় থ মেরে গিয়েছিল বুড়ি বেঙসানু। বোকা বোকা চোখে দেখছিল, কেমন করে বুড়ো খাপেগার দেহটা বিদ্যুৎগতিতে সামনের ঘরখানায় অদৃশ্য হল। মাত্র কয়েকটি মুহূর্ত। তারপরই বুড়ি বেঙসানু একটানা খিস্তি আওড়াতে শুরু করল, সাসুমেচু! ওরে শুয়োরের বাচ্চা, আমার বর্শা আর মৌচাক নিলি যে? এখুনি ফিরিয়ে দে। নইলে রেনজু আনিজা তোর গুষ্টিকে পাহাড় থেকে খাদে ফেলে সাবাড় করবে। মর, মর তুই। তোর ঘাড় মুচড়ে রক্ত খাব। নে রিহুগু!
বাইরের ঘরে ঢোকার পথটা একখানা অতিকায় পাথর দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে বুড়ো খাপেগা। এবার সেই নিরাপদ এলাকা থেকে সমানে সে জবাব দিতে লাগল, টেমে নটুঙ! যা, যা এবার। তোর নাতির বউকে পুষছি, তার দাম নিলাম।
গালাগালিতে দুপক্ষই সমান ওস্তাদ। কেউ কারো চাইতে কম যায় না। খিস্তিখেউড়ে পাহাড়ী দুপুরটা কুৎসিত হয়ে উঠল।
চারপাশের কেসুঙগুলো থেকে মজা দেখতে সবাই এসে জমায়েত হয়েছে; গোল করে ঘিরে ধরেছে বুড়ো খাপেগার ছোট্ট বাড়িটাকে। ফিসফিস গলায় বলছে, সদ্দারটা একটা সাসুমেচু (অত্যন্ত লোভী মানুষ)।
আমার মৌচাক আর বর্শা দে। আমি মেহেলীর সঙ্গে সেঙাইর বিয়ে দেব না। তার খাবারও দেব না।
পাটের ফেঁসোর মতো এক মাথা রুক্ষ চুল ছিঁড়ে, কদর্য খিস্তিগুলো নানা অঙ্গভঙ্গি করে আউড়ে, অনেক শাপশাপান্ত করে, শ্রান্ত হয়ে পড়ল বুড়ি বেঙসানু। এতক্ষণ ঘোলাটে চোখদুটো তার দপদপ করে জ্বলছিল, ক্ষয়ে যাওয়া শেষ কটা দাঁত কড়মড় শব্দ করছিল। জীর্ণ শুকনো বুকটা থরথর করে কাঁপছিল। এবার হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল বুড়ি বেঙসানু, তোর গুষ্টি সব খতম হবে। ফাসাও আর নজলি খায়নি এখনও।
কিন্তু সে কান্নায় কোনো ফলই হল না। এক মুঠো চাল কি দু খণ্ড মাংস দেওয়া দূরে থাক, মুখ বাড়িয়ে একবার উঁকিও দিল না বুড়ো খাপেগা। বেঙসানুর কান্না তাকে টলাতে পারে নি, তার কঠোর কঠিন মনটাকে এতটুকু গলাতে পারেনি। বন্ধ ঘরে চুপচাপ বসে রয়েছে বুড়ো খাপেগা। একটুও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না তার।
অনেকক্ষণ পর বিড়বিড় করে বকতে বকতে আর হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে তিনটে টিলা পেরিয়ে নিজেদের কেসুঙে ফিরে এল বুড়ি বেঙসানু। দুপুরের রোদে তখন বিকেলের আমেজ লেগেছে।
কেঁদে কেঁদে দুটো চোখ জলে ঝাপসা হয়ে গিয়েছে। বাড়ি ফিরে আবছা দৃষ্টিতে বেঙসানু এক রূপবতী যুবতাঁকে দেখতে পেল। উজ্জ্বল তামাটে দেহ। মসৃণ, সুঠাম উরুতে একটি ভঁজের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। সামনে এক ফালি ঘাসের জমিতে বসে রয়েছে মেয়েটা। তাকে দু’দিক থেকে ঘিরে ধরেছে ফাসাও আর নজলি। ঝরনার শব্দের মতো কলকল হাসি আর গল্পে মেতে রয়েছে তিনজনে।
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল বুড়ি বেঙসানু। কে মেয়েটা? আগে কোনোদিন একে তো দেখেনি। কোত্থেকে, কোন পাহাড় না বন থেকে, কি আকাশ ছুঁড়ে এই সুন্দর মেয়েটা তাদের কেসুঙে এসে পড়েছে! ভেবে ভেবে থই পায় না বুড়ি বেঙসানু।
হঠাৎ মেয়েটা তাকাল বুড়ি বেঙসানুর দিকে। উঠে দাঁড়াল সে, তারপর ছুটতে ছুটতে একটা বেতের ঝোড়া নিয়ে তার কাছে চলে এল। বলল, এই যে ঠাকুমা, চাল আর মাংস এনেছি।
লাল লাল একরাশ চাল আর একখণ্ড শুয়োরের মাংস সমেত বেতের ঝোড়াটা সামনে। বাড়িয়ে দিল মেয়েটা।
একটা ভোজবাজি যেন। অবিশ্বাস্য এবং দুর্বোধ্য। এই ঢলে-পড়া দুপুরে স্বপ্ন দেখছে নাকি বুড়ি বেঙসানু? হাত বাড়িয়ে ঝোড়াটা নিতে ভুলে গেল সে।
ইতিমধ্যে ফাসাও আর নজলি ঘাসের জমিটা থেকে উঠে এসেছে।
মেয়েটা বলল, আমি সদ্দারের পেছনের ঘর থেকে তোকে দেখেছি, তোর কথা শুনেছি। তাই এই চাল আর মাংস নিয়ে এলাম। এগুলো নে।
