ঠিক, ঠিক। সকলে মাথা নাড়ল।
টঘুটুঘোটাঙ পাতায় ছাওয়া ছোট্ট এই ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে এখনও গাইডিলিওর কথাগুলি অদ্ভুত রেশের মতো ছড়িয়ে রয়েছে।
বৈদেহী কয়েকটি শব্দ, অথচ কি শরীরময়। দেহেমনে কথাগুলোর ছোঁয়া পর্যন্ত যেন পাচ্ছে তরুণ ছেলেরা।
কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটল। তারপর কেউ কিছু বলার আগেই ঘটল ঘটনাটা।
পাঁচ ছজন পাহাড়ী দুটো অচেতন মানুষকে পাটাতনের ওপর এনে শুইয়ে দিল।
বাইরের উপত্যকায় আর বনে, মাও-এর দিকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া পথে নসু কেহেঙ মাসের রাত্রি ঘন হয়ে নামছে। আকাশে বিবর্ণ তারাগুলোর ফাঁকে ফাঁকে একটা অস্পষ্ট আঁচড়ের মতো ফুটে বেরিয়েছে ছায়াপথটা। ফুটে বেরিয়েছে আনিজা উইখু।
গাইডিলিও তাকালেন আগন্তুক পাহাড়ীদের দিকে। বললেন, কী ব্যাপার জদোনাঙ দাদা? এরা কারা?
জদোনাঙ বলল, জানি না, কোহিমার পথে পড়ে ছিল। মানুষ দুটো ঠাণ্ডায় একেবারে হিম হয়ে গেছে। আর জ্ঞানও নেই।
বাঁশের মাচান থেকে নিচের পাটাতন নেমে এলেন গাইডিলিও, পাটাতনে কেন? মাচানে বিছানা করে শুইয়ে দাও। আমি সেঁক দেবার ব্যবস্থা করি।
পেন্যু কাঠের মশালের আলো এসে পড়েছে নরদেহ দুটোর ওপর। থোকা থোকা রক্ত জমাট হয়ে রয়েছে সমস্ত দেহে। আর রয়েছে ভয়ানক সব ক্ষতচিহ্ন।
অপলক চোখে তাকিয়ে আছে গাইডিলিও। এতক্ষণ যে চোখ জোড়া তার জ্বলছিল এখন সে দুটো থেকে বিন্দু বিন্দু জল ঝরতে শুরু করেছে। ঝাপসা গলায় তিনি বললেন, নিশ্চয় এদের কেউ মেরেছে।
জলদানাঙ মাথা নাড়ল, আমারও তাই মনে হচ্ছে। মানুষ দুটো ওই কোহিমা থানার কাছে পড়ে ছিল। অন্ধকারে পায়ে ঠেকতে তুলে নিয়ে এলাম।
.
৩২.
নসু কেহেঙ মাসের প্রথম দিকে সিঁড়িখেতে জোয়ার বুনে এসেছিল জোয়ান ছেলেমেয়েরা। তামাটে অঙ্কুরে অঙ্কুরে ভরে গিয়েছিল পাহাড়ী উপত্যকা। সেই অঙ্কুর এখন ডাগর হয়েছে। সবুজ লাবণ্যে ঝলমল করে উঠেছে পাহাড়িয়া সিঁড়িখেত। খেতের ফসল-ঘরগুলো আকাশের দিকে মাথা তুলে সারাদিন রোদ ঠেকায়। জোয়ারের চারাগুলো দিনে দিনে বেড়ে ঋতুমতী হবে। তারপর সারা দেহে শস্যের জ্বণ জন্মাবে। তার অনেক আগেই পাহাড়ী মানুষেরা জঙ্গল কাটতে যাবে। গাছপালা পুড়িয়ে তৈরি হবে পাথুরে মাটির সার। সারালো মাটি চৌরস করে বীজধান বোনা হবে।
কেলুরি গ্রামে জঙ্গলকাটার তোড়জোড় চলছে। চলছে ধান বোনার প্রাথমিক প্রস্তুতি। কয়েক দিন পর থেকেই একরাশ গেন্না শুরু। ধারাবাহিক, একটানা। মেথি গিল্ডা কেই নে গেন্না। টসি চি কেতসা গেন্না। টেসে গা গেন্না। এমনি অনেক। গেন্না হল উৎসবের একটা বড় অঙ্গ।
বুড়ি বেঙসানু সিঁড়িখেত পেরিয়ে মালভূমিতে গিয়েছিল সকালবেলায়। বড় একটা মৌচাক কেটে এইমাত্র গ্রামে ফিরল সে। সরাসরি ঘরে এসে গোটা দুই বর্শা নিয়ে আবার বেরুল।
জোরি কেসুঙ থেকে তাকে দেখতে পেয়ে ফাসাও আর নজলি সাঁ সাঁ করে ছুটে এল। দুজন দু’দিক থেকে ঘিরে ধরল বুড়ি বেঙাসানুকে, ঠাকুমা, বড় খিদে পেয়েছে, খেতে দে।
খিদে পেয়েছে? আমি কী করব? তোদের বাপ আছে, মা আছে, দাদা আছে, তাদের কাছে। যা।দাঁত খিঁচিয়ে একটা কদাকার মুখভঙ্গি করল বেঙসানু, হুই শয়তানের বাচ্চা সেঙাইটা সেই যে কোহিমা গেল, আর ফিরবার নাম নেই। সিজিটোটা গিয়েও আর ফেরেনি। সেঙাইও ফিরল না। খেতে জোয়ার বোনেনি। খাবি কী?
তা আমরা কি জানি! খিদে পেয়েছে। বায়না শুরু করে দিল ফাসাও আর নজলি।
গায়ে কি আমার জোয়ান কালের তাগদ আছে? তা থাকলে নয় শিকার-টিকার করে নিয়ে আসতাম। খাবি কী? আমার হাত-পা ঝলসে খা।
কেমন লাগবে তোর মাংস?ফাসাও আর নজলির মুখেচোখে সবিস্ময় কৌতূহল।
আরে শয়তানের বাচ্চারা, আমার মাংস গিলতে চাইছিস! বুড়ি বেঙসানুর ঝাপসা চোখ দুটোর ওপর নকল শঙ্কা ঘনিয়ে এল। একটু পর আবার বলতে শুরু করল সে, তোরা বাইরের ঘরে গিয়ে বোস, আমি খাপেগা সদ্দারের বাড়ি থেকে চাল নিয়ে আসি। আর যদি পাই একটু মাংস।
তাড়াতাড়ি আসবি। খিদেতে পেট কামড়াচ্ছে।
ফাসাও আর নজলি নিজেদের ঘরের দিকে চলে গেল। আর বেঙসানু তিনটে বড় বড় টিলা ডিঙিয়ে এল বুড়ো খাপেগার বাড়ি।
একখানা বাদামি রঙের পাথরের ওপর বসে রয়েছে বুড়ো খাপেগা। বাঁশের সরু চোঙায় তামাক পুড়ছে। তরিবত করে সেই চোঙার ফোকরে মুখ রেখে দীর্ঘ টান দিয়ে চলেছে সে। তামাকের মৌতাতে চোখদুটো বেশ ঢুলুঢুলু হয়ে উঠেছে।
বুড়ো খাপেগা এবার সরব হয়ে উঠল, আয় বেঙসানু, তারপর খবর কী বল?
খবর আবার কী, ঘরে এক দানা খাবার নেই। আমার এত বয়েস হয়েছে কোত্থেকে কী জোগাড় করব, বল? হুই সিজিটো আর সেঙাইর মা মাগীটা তো কোহিমা গেল। তারপর আজ কদিন হল সেঙাইও গেছে। একটারও ফিরবার নাম নেই। ফাসাও রয়েছে, নজলি রয়েছে। ওদের তো কিছু দিতে হবে খেতে।
হু-হু। তা তো ঠিকই। সংক্ষিপ্ত জবাব। মৌজ করে সমানে তামাক টেনে চলল বুড়ো খাপেগা।
তাই তোর কাছে এলাম।
বিরক্তি এবং সন্দেহে মুখচোখ কুঁচকে গেল বুড়ো খাপেগার। বলল, আমার কাছে কেন?
বেঙুসানু বলে, কেন আবার, আমাকে খানিকটা মাংস আর চাল দে। নইলে কি না খেয়ে মরব?
চাল! মাংস! কোথায় পাব? আমার নেই ওসব। তা ছাড়া চাল-মাংস তুই নিবি কি, আমাকেই বরং দিয়ে যাবি। ভস ভস করে একরাশ তামাকের ধোঁয়া ছাড়ল বুড়ো খাপেগা। ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় তার মুখটা ঢেকে গেল।
