আর একজন বলল, আমি অঙ্গামী নাগা, আমাদের গ্রামেও এ কথা বলব। ডান দিক থেকে আর একটি কণ্ঠ ফুটে বেরুল, আমি সাঙটাম, আমাদের পাহাড়ও এ ব্যাপারে পিছিয়ে থাকবে না। কালই আমি রওনা হব।
আমরাও, আমরাও–বাকি সকলে জানিয়ে দিল, তাদেরও এতে সায় আছে।
আও, সাঙটাম, কোনিয়াক, অঙ্গামী, রেঙমা, লোহটা, সেমা। নাগা পাহাড়ের দিগদিগন্ত থেকে উদ্দীপ্ত তারুণ্য এই টোঘুটুঘোটাঙ পাতার ঘরে এসে সমবেত হয়েছে। কেউ কলকাতা থেকে, কেউ শিলং-গৌহাটি থেকে এক অপূর্ব প্রতিজ্ঞার অগ্নিকণা বুকে ধরে নিয়ে এসেছে, ধরে এনেছে এক বীর্যবান শপথ। সেই শপথের নাম গান্ধিজি। সেই প্রতিজ্ঞার নাম অসহযোগ। সেই শপথকে নাগা পাহাড়ের গুহায়-অরণ্যে, মালভূমি আর উপত্যকায় বনাগ্নির মতো ছড়িয়ে দেবে তারা।
আচমকা টোঘুটুঘোটাঙ পাতার ঘরখানায় এসে ঢুকল জনকয়েক কিম্ভুত মূর্তি। কার্পাস দড়ির লেপ দিয়ে সমস্ত দেহ জড়ানো। মাথার সামনে ঘোমটার মতো ঢাকনা। তারা পাহাড়ী গ্রামের সর্দার। হাতের লম্বা লম্বা বর্শার ফলায় মশালের আলো ঝকমক করে উঠল।
সর্দারেরা চেঁচামেচি করে উঠল। তাদের একজন বলল, বুঝলি রানী, হুই শয়তান ফাদারেরা আর পুলিশেরা আমাদের টাকা দিতে চায়। বস্তিতে বস্তিতে তোকে ডাইনি বলতে বলে। তা আমরা কেন বেইমানি করব! আমার ছেলে তোর ছোঁয়ায় ভালো হল। কী ব্যারাম যে হয়েছিল! তামুন্যু (চিকিৎসক) বলেছিল, আনিজাতে পেয়েছে। খাদেই ফেলে দিতুম, তুই বাঁচিয়ে দিয়েছিস।
আর-একটি গলা শোনা গেল, বলে কিনা তুই ডাইনি। ভাবলাম, বর্শা দিয়ে একেবারে এফোঁড়-ওফোড় করে ফেলি।
না, না–প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন গাইডিলিও, কক্ষনো মারামারি করবে না। ওরা মারলেও মারবে না।
কী বলছিস তুই! মারলে তার শোধ নেব না! এ কেমন তাজ্জবের কথা! অসহায় গলায় একটি সর্দার বলল।
না। সুকুমার একটি মুখ। সেই মুখের চারপাশে অপরূপ এক জ্যোতির্বলয়। সুঠাম মুখখানার আড়ালে কোথায় যেন একটা বজ্র লুকিয়ে রয়েছে। মণিপুরী পোশাকের আড়ালে ছোট্ট একটি প্রাণকণা টগবগ করে ফুটছে যেন গাইডিলিওর, আমি সব বুঝি, সব জানি। তবুও ওদের গায়ে আমরা হাত তুলব না। খুনোখুনি আমাদের পথ নয়। আর শোন, বস্তির লোকদের বলে দেবে, ফাদারেরা ক্রস আঁকতে বললে, যেন না আঁকে। তা হলে আমাদের আনিজার গোসা হবে। আর ওই সাহেবদের কাছ থেকে কোনো কিছু যেন মাগনা না নেয়।
কেন?
ওরা ঘুষ দেয়। তারপর আমাদের মনটাকে কিনে ফেলে। আমাদের ভিখিরি বানায়। একটু একটু করে খ্রিস্টান করে ওদের রাজ্য বড় করে। শাণিত বল্লমের মতো গলাটা ঝকমক করে উঠল গাইডিলিওর, খাসিয়াদের করেছে, মিকিরদের করেছে, গারোদের করেছে, এখন এসেছে। আমাদের এই নাগা পাহাড়ে।
পেন্য কাঠের মশাল থেকে স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে পড়েছে ঘনপক্ষ্ম চোখে। পার্বতী কুমারী। বছর ষোল বয়স; এখনও গাইডিলিওর দেহ থেকে কৈশোর একেবারে মুছে যায় নি। উদ্ভিন্ন যৌবন। দৃষ্টি যেন ধাঁধিয়ে যায়। বার বার তার দিকে তাকিয়ে তরুণ ছেলেরা দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
অবাক চোখে সর্দারেরা তাকিয়ে রয়েছে রানী গাইডিলিওর দিকে। তার একটু আগের কথাগুলো তারা ঠিকমতো বুঝতে পারছে না। অত্যন্ত দুর্বোধ্য এবং রহস্যময় মনে হচ্ছে। তারা বলল, তুই কী যে বলছিস রানী, কিছুই মাথায় ঢুকছে না।
গাইডিলিও বললেন, বুঝতে পারছ না? আচ্ছা বুঝিয়ে দিচ্ছি। তোমরা ফাদারের কাছ থেকে নিমক নাও। তার বদলে হরিণের ছাল, বাঘের দাঁত, বুনো মোষের শিঙ দাও?
না। তার বদলে কিছুই নেয় না ফাদারেরা।
মাগনা নাও কেন নিমক?
মাগনা কোথায়? ওরা যা বলে তাই করি। ক্রস আঁকি, যীশু-মেরীর নাম করি।
ওসব করবে না। ওসব ওদের ধর্ম, ওদের গেন্না। তাতে আমাদের আনিজারা রাগ করবে। বুঝলে?
ওদের গেন্না আমাদের দিয়ে করাচ্ছে? একেবারে কুঁড়ে ফেলব না! এবার আমাদের বস্তিতে ঢুকলে সাবাড় করে ফেলব।উত্তেজনায় চোখের তারা যেন ছিটকে বেরিয়ে আসবে সর্দারদের, এমন মনে হয়।
না, খবরদার মারবে না। বস্তিতে গিয়ে বলবে, কেউ যেন ওই ক্রস আঁকা আর যীশু-মেরীর নামের বদলে নিমক কাপড়-টাকা না নেয়। ওরা অনেক, অনেক দূর থেকে আমাদের দেশে এসেছে। এসেই একেবারে সর্দার হয়ে বসেছে।
না। হুই সব হবে না।
ঠিক বলেছ। এমনি থাকতে চাও, থাকো। সর্দারি করতে গেলে ভাগতে হবে। এখন এমন বাড়াবাড়ি শুরু করেছে যে ভাগাতেই হবে। বলে এক মুহূর্ত কী যেন ভাবলেন গাইডিলিও। তারপর বললেন, শোন সর্দারেরা, দরকার হলে তোমাদের বস্তিতে যাব। থাকবার বন্দোবস্ত করবে তো?
তুই যাবি! তুই গেলে নতুন ঘর করে দেব। নাচ দেখাব, গান শোনাব। আর বস্তির যত ব্যারামী মানুষ আছে তাদের একবার খালি ছুঁয়ে দিবি। সব রোগ চলে যাবে। তুই যাবি তো? সর্দারেরা হইচই করে উঠল।
যাব, যাব। সুন্দর শান্ত হাসিতে মুখখানা ভরে গেল রানী গাইডিলিওর।
হঠাৎ সামনের মাচান থেকে লিকোক্যুঙবা বলল, কী ব্যাপার, ওদের বস্তিতে যাবেন নাকি?
কখন কাদের বস্তিতে যেতে হয়, তার ঠিক আছে? ব্রিটিশদের তাড়াবার জন্যে আন্দোলন হবে। তারা কি সহজে ছেড়ে দেবে? আটক করবে, আন্দোলনকে দাবিয়ে দেবার চেষ্টা করবে।
তা ঠিক।
পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে দেশের মানুষদের যদি ব্রিটিশদের মতলব, মিশনারিদের কাজকর্ম সম্বন্ধে খানিকটা বুঝিয়ে দিতে পারি, কাজ হবে। ধরুন আমি, আপনি কি আরো পাঁচজন হয়তো ধরা পড়লাম। সেই সঙ্গে কি স্বাধীনতা আন্দোলন মরে যাবে? তা হয় না। আমরাও সমস্ত ভারতেরই একটা অংশ। স্বাধীনতার জন্যে সবাই যখন অহিংসা দিয়ে লড়াই করছে তখন আমাদের এই নাগা পাহাড় পিছিয়ে থাকবে কেন?
