কিন্তু টিজু নদী আর পার হতে হল না জেভেথাকে। আচমকা একটা প্রকাণ্ড বর্শার ফলা উড়ে এসে কণ্ঠায় ফুঁড়ে গিয়েছিল। মশালের পিঙ্গল আলোতে শুধু পাহাড়ী রক্তের একটা তীব্র ফিনকি তীরের মতো বেরিয়ে টিজু নদীর নীল ধারার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।
আ-ও–ও–ও-উ-উ–আর্তনাদ করে আছড়ে পড়েছিল জেভেথাঙ। টিজু নদীর ওপারে নিতিৎসু নামে এক আদিম কামনা তার অধরাই রইল। বর্শার ফলা তার উন্মত্ত আকাঙ্ক্ষা থেকে চিরকালের জন্য একটি বন্য স্বপ্নকে মুছে নিয়ে গিয়েছে।
জেভেথাঙের দেহটা স্রোতে ভাসতে ভাসতে ওপারে গিয়ে ভিড়েছিল। চকিতে একটা কুড়ালের কোপ দিয়ে ওদিকের কে একজন মুণ্ডটা ছিন্ন করে তুলে নিয়েছিল।
তারপর টিজু নদীর ওপারটা আদিম উল্লাসে এবং চিৎকারে প্রমত্ত হয়ে উঠেছিল। জোহেরি বংশের অন্যায় কামনার উপযুক্ত জবাব তারা দিয়েছে।
প্রথমটা ঘটনার আকস্মিকতায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল খাপেগারা। তারপরেই পঞ্চশটা জোয়ান ভৈরব গর্জনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল টিজু নদীর ওপারে। আ-ও–ও–আ-আ-আ–
সেই ক্ষয়িত চাঁদের রাতে গলাটা মন্থর হয়ে গিয়েছিল বুড়ো খাপেগার, তারপর টিজু নদীর নীল জল লাল হয়ে গেল। অনেক রাত্তিরে ওপারের দশটা মাথা নিয়ে মোরাঙে ফিরে এলাম। আমার উরুটা বর্শার ঘায়ে দুফালা হয়ে গিয়েছিল। যাক সে কথা, কিন্তু বড় আপোশ রয়ে গেল। দশটা মাথা আনলাম বটে, কিন্তু পোকরি বংশের একটা মাথাও আনতে পারিনি। আর জোহেরি বংশের আসল মাথাটাই ওরা নিয়ে গিয়েছিল। যে মাথাগুলো এনেছিলাম, সবই ওপারের অন্য বংশের।
মন্থর হতে হতে একসময় থেমে গিয়েছিল খাপেগার কণ্ঠ। তারপর সেঙাই-এর দিকে তাকিয়ে সে বলেছিল, আমাদের দিন তো শেষ। শরীরে সে তাগদ আর নেই। তোর ঠাকুরদা জেভেথাকে ওরা মেরেছে সেঙাই। দশটা অন্য বংশের মাথায় তার দাম ওঠে না। তোর বাপ তো আবার সাহেব সাধুদের ল্যাজ ধরা। তুই এর শোধ তুলিস। হুই পোকরি বংশের তিনটে মাথা আনতেই হবে। সেদিন ওদেরই জিত হয়েছিল। দশটা মাথা আনলেও আমরা হেরে গিয়েছিলাম। সে হারের বদলা এখনও আমাদের নেওয়া হয়নি।
এই হল সেই রক্তাক্ত অতীতের কাহিনী। এই ভয়ঙ্কর অতীত সেদিন টিজু নদীর দু’পারে জোহেরি আর পোকরি বংশকে চিরকালের জন্য বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। বিশাল এক পাহাড়ী ময়ালের মতো টিজু নদীর আঁকাবাঁকা স্রোত। এই স্রোতের ওপর আর কোনোদিনই অন্তরঙ্গতার সেতুবন্ধ হয়নি। সেই সেতুর ওপর দিয়ে দুই বংশের হৃদয়ের দিকে একটি পদক্ষেপও আর হয়নি। শুধু টিজু নদীর দু’পার থেকে একদিন কুরগুলাঙ গ্রাম মুছে গেল। তার প্রেতাত্মার ওপর জন্ম নিল আজকের এই সালুয়ালাঙ আর কেলুরি। নিতিৎসু আর জেভেথাকে নিয়ে টিজুনদীর দু’পারে যে আগুন জ্বলে উঠেছিল, কালের অনিবার্য নিয়মে তার ওপর খানিকটা বিস্মৃতির ভস্ম জমেছে। কিন্তু সে আগুন এখনও নেভেনি। শুধু মাত্র একটি ফুস্কারের প্রয়োজন, যে ফুকারে ধিকিধিকি আগুন দাবানল হয়ে জ্বলে উঠবে।
*
খেজাঙের ঝোঁপ থেকে খানিকটা দূরে সালুয়ালাঙের মানুষগুলো এখনও চিৎকার করছে। কপিশ চোখে তাদের শিকারের সন্ধান। |||
||||||| খেজাঙ ঝোঁপের মধ্যে একটা ক্ষিপ্ত বাঘের মতো এবার শরীরটা ফুলে ফুলে উঠছে সেঙাই এর। ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে। বুকের কঠিন পেশীগুলো উঠছে, নামছে। তার চেতনার মধ্যে কয়েকদিন আগে শোনা খাপেগার কাহিনীটা বিষের জ্বালা ছড়িয়ে দিচ্ছে। খেজাঙের কাটায় ফালা ফালা হয়ে যাচ্ছে দেহ, সেদিকে এতটুকু ভ্রূক্ষেপ নেই। পায়ের পাতার ওপর দিয়ে পিছলে পিছলে যাচ্ছে সরীসৃপ, সেদিকে একবিন্দু মনোযোগ নেই। শুধু বর্শার বাজুর ওপর হাতের মুঠিটা শক্ত হয়ে বসেছে। আর বর্শার ফলায় যেন প্রতিশোধের দুর্বার স্পৃহা ঝকমক করে উঠছে। দেহমন উত্তেজনায় তরঙ্গিত হচ্ছে সেঙাই-এর। একটু আগে অপরিসীম ভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছিল সে। এখন সে ভয় মুছে গিয়েছে। খাপেগার সেই কাহিনী স্মৃতির মধ্য থেকে এক আদিম প্রেরণায় তাকে ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। হ্যাঁ, ঠাকুরদার হত্যার প্রতিশোধ সে নেবে। তাকে নিতেই হবে।
আর সেঙাই-এর ঠিক পেছনেই উবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রেঙকিলান। অস্বাভাবিক আতঙ্কে তার হৃৎপিণ্ডটা যেন ঝিমিয়ে আসছে। শরীরের রক্ত চলাচল থেমে যাচ্ছে। চোখের মণিদুটো এক অব্যক্ত যন্ত্রণায় ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মৃত্যু আজ অনিবার্য। অপঘাত আজ নিশ্চিত। সালুয়ালাঙের মানুষগুলো বর্শার মুখে নির্ঘাত তার মুণ্ডুটা গেঁথে নিয়ে যাবে।
রেঙকিলান মিথ্যা কথা বলেছে সেঙাইকে। কাল রাত্রে সে মোরাঙে শুতে যায়নি। বউয়ের সঙ্গে এক শয্যায় শীতের রাত কাটিয়ে সেই কলুষিত দেহমন আর সেই অপবিত্র জঙগুপি কাপড় নিয়েই সে চলে এসেছে শিকারে। শিকারে আসার আগে শুদ্ধাচারের রীতি সে রক্ষা করেনি। সেই পাপে দূরন্ত বেগে ধেয়ে আসছে বনদেবীর অভিশাপ। হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে সে শুনতে পাচ্ছে আনিজার অট্টহাসি। মৃত্যু আজ নিশ্চিত। আর ভাবতে পারছে না রেঙকিলান। সমস্ত দেহের পেশীগুলো তার থরথর কাঁপছে। সমস্ত চেতনাটা আলোড়িত করে একটি চিন্তাই তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। সে চিন্তা মৃত্যুর চিন্তা। তার নিবন্ত দৃষ্টির সামনে যেন নাচতে শুরু করেছে সালুয়ালাঙের মৃত্যুমুখ বর্শাগুলি।
