সব শুনে গর্জন করে উঠেছিল জেভেথাঙের বাপ। সে গর্জনে শিউরে উঠেছিল কুরগুলাঙ গ্রামের হৃৎপিণ্ড। একটা উদ্দাম তুফানের মতো ছুটে এসেছিল সে মোরাঙে। তারপর বুকের ওপর প্রচণ্ড একটা চাপড় মেরে চিৎকার করে উঠেছিল, ইজাহান্টসা সালো! আ–ও—ও–ওয়া–আ–আ-আ–
পরিচিত সংকেত। ওক বন, ভেরাপাঙের জঙ্গল, মেশিহেঙের ঝোঁপ–পাহাড়ী অরণ্যের দিগদিগন্ত থেকে ঝড়ের মতো ছুটে এসেছিল জোয়ান ছেলেরা। ওই চিৎকারের মধ্যে একটা অনিবার্য ইঙ্গিত রয়েছে। জোয়ানদের ধমনীতে ধমনীতে পাহাড়ী রক্ত দাবাগ্নির মতো জ্বলে উঠেছিল। আদিম অরণ্যের আহ্বান। হত্যা তাদের ডাক দিয়েছে। বর্ষার ফলায় এই হত্যার ঘোষণাকে তারা ছড়িয়ে দেবে টিজু নদীর ওপারে।
জেভেথাঙের বাপের চোখ দুটো যেন দুটুকরো জ্বলন্ত অঙ্গার, শোন জোয়ানের বাচ্চারা, কতকালের বনেদি আমাদের এই জোহেরি বংশ। ওপারের হুই পোকরি বংশ আজ আমাদের অপমান করেছে। এর শোধ তুলতে হবে। মোরাঙ থেকে বর্শা, তীর-ধনুক, কুড়াল বার করে নিয়ে যা।
জোয়ান ছেলেরা এতক্ষণ উৎকর্ণ হয়ে শুনছিল। এবার তাদের চিৎকার উদ্বেল হয়ে উঠল। অনেকগুলো শান্ত শিষ্ট সভ্য দিনের পর এই আদিম আহ্বান তাদের রীতিমতো উত্তেজিত করে তুলেছে। পাহাড়ী বনের হিংস্র আত্মা যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল। জেভেথাঙের বাপের এই ডাক আবার নতুন করে তার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে।
জেভেথাঙের বাপ বলেছিল, হু-হু, খাপেগার ওপর সব ভার দিলাম। আজ রাতের মধ্যে পোকরি বংশের তিনটে মাথা চাই। যা মরদের বাচ্চারা। এই মোরাঙের দেওয়াল চিত্তির করব পোকরি বংশের রক্ত দিয়ে। মনে থাকে যেন।
একটু পরেই পঞ্চাশটা জোয়ানের মুঠিতে তীক্ষ্ণধার বর্শা উঠল। বেলাশেষের রোদে ঝকমক করে উঠেছিল ফলাগুলো। একটা রক্তাক্ত প্রতিজ্ঞার আগুন নেচে নেচে যাচ্ছিল জোয়ান। চোখের মণিতে মণিতে।
আ-ও–ও–ও-য়া-আ-আ-আ–টিজু নদীর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল জোয়ানেরা।
আ-ও–ও–ও-য়া–আ-আ-আ– ওপার থেকেও চিৎকার ভেসে আসছিল। আদিম পৃথিবীর এই আহ্বানে তারাও সাড়া দিয়েছে। তাদের বর্শার ফলায় ফলায়, তাদের তীরের ঝকমকে দ্যুতিতে একই মৃত্যুর শপথ।
একসময় টিজু নদীর দু’পারে মুখোমুখি হয়েছিল জোহেরি আর পোকরি বংশের অগুনতি বর্শা। কোনো কথা নয়। তীর আর ধনুকের মুখে মুখে মর্যাদার লড়াই শুরু হয়ে যাবে।
নাগা যুদ্ধের নিয়ম অনুযায়ী দুই দল দু’পাশের কিছুটা জঙ্গল পরিষ্কার করল। তারপর দু’দিকেই দুটো মশাল জ্বালিয়ে পুঁতল। তারও পর যুদ্ধ আরম্ভের প্রাথমিক রীতি মেনে দুদলই পরস্পরের দিকে ডিম ছুড়ল। এই ডিম ছোঁড়া ভয়ানক অসম্মানের চিহ্ন। টিজু নদীর দু’পারে দুই প্রতিপক্ষ। কারো মাথায় মোষের শিঙের বাহারি মুকুট। হাতের মুঠোয় ভয়াল কুড়ালের মতো দা, কাঁধে বেতের খাঁচায় রাশি রাশি তীর। বুকের সামনে খাসেম গাছের ছাল দিয়ে বানোনো ঢাল। মাথায় মোষের ছালের পেরঙ (শিরস্ত্রাণ), তাতে পিতলের কারুকাজ। তলপেটে গুঙ খেকঙ (লোহার আবরণ) আর বাহুসন্ধি পর্যন্ত বাঘছালের আমেজঙ খেকঙ (ঢাকনা)।
উপত্যকার চড়াই-উতরাই কাঁপিয়ে কাঁপয়ে, দুই দলই হিংস্র চিৎকার করে উঠেছিল।
আ–ও–ও–আ—আ–
হো–ও–ও—ও–আ–আ—আ–
একসময় পাহাড়ের চূড়া থেকে বেলাশেষের রং মুছে গেল। আবছা রহস্য ছড়িয়ে ছড়িয়ে নেমে এসেছিল ক্ষয়িত চাঁদের রাত্রি। আকাশে মিটিমিটি তারা ফুটেছে। অস্ফুট চাঁদের আভাস দেখা দিয়েছে। নদীর দু’পারে শোরগোল উদ্দাম হয়ে উঠেছে। পাহাড়, বনভূমি, সমস্ত কিছু যেন খণ্ড খণ্ড হয়ে যাবে সে চিৎকারে। টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়বে মহাশূন্যে। এই অরণ্য, এই দিনরাত্রির অস্তিত্বে ঘেরা পাহাড়ী পৃথিবী প্রচণ্ড কোলাহলে যেন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
আ-ও–ও–ও-আ-আ-মরদের বাচ্চা হলে এদিকে আয় দেখি।
হো–ও–ও-আ-আ-আ– জানের মায়া থাকলে ঘরের ছা ঘরে যা।
দু’পারে একসময় মশাল জ্বলে উঠেছিল। টিজু নদীর খরধারায় কয়েকটি অগ্নিবিন্দুর প্রতিচ্ছায়া পড়েছিল। কিন্তু দুই গ্রামের একটি মানুষও নদী পার হয়নি। পার হওয়ার নিশ্চিত পরিণতি ঘাড়ের ওপর দুহাত লম্বা একটা কুড়ালের কোপ এসে পড়া। কিংবা জীমবো পাতার মতো বাঁকা বর্শায় হৃৎপিণ্ডটা এ-ফোঁড় ওফোড় হয়ে যাওয়া।
একসময় খাসেম কাঠের ঢালটা তুলে গর্জন করে উঠেছিল খাপেগা, ছাগীর মতো এপারে বসে থাকলে নিতিৎসুকে পাবে নাকি, কি রে জেভেথাঙ? ওপারের কুত্তাগুলো এগিয়ে আসবে না আগে। আমাদেরই হুই পেত্নীটাকে ছিনিয়ে আনতে হবে। জোহেরি বংশের মান খোয়াসনি জেভেথাঙ। সর্দার বলে দিয়েছে, অন্তত তিনটে মাথা চাই পোকরি বংশের।
টিজু নদীর অবিরত গজরানির ওপর গলা তুলে চিৎকার করে উঠেছিল জেভেথাঙ। খাপেগার কথাগুলো থেকে আদিম প্রেরণা পেয়েছে সে, আ-ও–ও–
টিজুনদীর যৌবন বর্ষার সঙ্গে সঙ্গে মুছে গিয়েছে। গ্রীষ্মের টিজুতে রাশি রাশি হাড়ের মতো নানা রঙের পাথর ছুঁড়ে বেরিয়েছিল। চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে একটা পাথরের ওপর লাফিয়ে পড়েছিল জেভেথাঙ। উত্তেজনায় ঢালটা তুলে নিতে ভুলে গিয়েছিল সে। শুধু ডান হাতের মুঠোতে একটা অতিকায় বর্শা মাত্র ধরা ছিল। মশালের পিঙ্গল আলোতে ভয়ঙ্কর হিংস্র হয়ে উঠেছে জেভেথাঙের দৃষ্টি। তামাটে মুখখানা অস্বাভাবিক রক্তাভ দেখাচ্ছিল। আ-ও–ও–ও—আ-আ–
