এতক্ষণ একদৃষ্টে লক্ষ করছিল সেঙাই। পাহাড়ী ঘাসের ফাঁক দিয়ে বার বার একটা মাথা বেরিয়ে এসেই আবার অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। এবার মানুষটার মুখ দেখতে পেল সেঙাই। এর আগে টিজু নদীর ওপার থেকে আরো বারকয়েক লোকটাকে দেখেছিল সে। ওঙলে বলেছিল, ওই লোকটার নাম খোনকে। হুই পোকরি বংশের ছেলে।
ঘন ঘাসের আড়ালে খোকের মুখটা ডুবে ছিল। খোকে! রক্তকণাগুলো রাশি রাশি সরীসৃপের মতো কিলবিল করে উঠল সেঙাই-এর শিরায় শিরায়। খোনকে! পোকরি বংশের ছেলে। এই খোকের কোনো পূর্বপুরুষ তার ঠাকুরদাকে হত্যা করেছিল। হঠাৎ কর্তব্য স্থির করে ফেলল সেঙাই। বহুকাল আগে এক ক্ষয়িত চাঁদের রাতে টিজু নদীর নীল ধারায় জোহেরি বংশের অপমান মিশে গিয়েছিল। আজ শীতের দুপুরে খেজাঙের কাটাঝোপে এক উত্তরপুরুষের ধমনীতে বহু বছর পর সেই অপমান যেন জ্বালা ধরিয়ে দিল।
পাহাড়ী ঘাসের বন থেকে খোনকের মাথাটা ফের বেরিয়ে এসেছিল। খোনকের মাথা নয়, যেন পোকরি বংশের উদ্ধত মুকুট, আকাশছোঁয়া চুড়া।
আচমকা রেঙকিলানের পাঁজরায় কনুই দিয়ে একটা খোঁচা দিল সেঙাই। তারপর দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, এই রেঙকিলান, হুই খোনকেকে আমি বর্শা দিয়ে ফুড়ব। তারপর পেছনের খাসেম বন ঘুরে তাকে নিয়ে একেবারে নদীর বাঁকে পালাব। তৈরি হয়ে থাক।
বুকের মধ্যে থেকে একদলা আতঙ্ক কথার রূপ নিয়ে উঠে আসতে চাইল রেঙকিলানের। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই ঘটে গেল ঘটনাটা। সেঙাই-এর মুঠি থেকে প্রকাণ্ড বর্শাটা উল্কার মতো ছুটে গিয়েছে। নির্ভুল লক্ষ্য। আকাশফাটানো আর্তনাদ করে ঘাসের বনে লুটিয়ে পড়ল খোনকে, আ-উ-উ-উ-উ-উ-উ–
ঘটনার আকস্মিকতায় একেবারে হতবাক হয়ে গিয়েছিল সালুয়ালাঙের মানুষগুলো। এমনকি খেজাঙ ঝোপে রেঙকিলানও সেই-এর পাশে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে।
বিহূল অবস্থাটা কেটে যাবার পর পাহাড়ী অরণ্য কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল সালুয়ালাঙের মানুষগুলো। শিকারে আসার আগে তাদের একজন যে এমন শিকার হয়ে যাবে, তা কি তারা ভাবতে পেরেছিল! হো-ও-ও-ও–ও–
চারিদিকে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ছে মানুষগুলো। খোনকেকে শিকার করেছে যে শিকারি, তার সন্ধান চাই। তার মুণ্ডুটা ছিঁড়ে নিয়ে মোরাঙে ঝোলাতে না পারলে সালুয়ালাঙের মর্যাদা চুরমার হয়ে যাবে। পোকরি বংশের সম্মান ধ্বংস হবে।
হো-ও-ও-ও–ও–ভয়ঙ্কর গর্জন ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে পাহাড়ী উপত্যকার দিকে দিকে। মানুষগুলো হিংস্র চোখে তাকাচ্ছে এদিক সেদিক।
আর খেজাঙ ঝোপে আরেলা পাতার মতো সাদা হয়ে গিয়েছে রেঙকিলানের মুখখানা। প্রবল অপরাধবোধে সমস্ত মন তার অসাড় হয়ে গিয়েছে। শিকারে এসেছে সে অশুচি দেহমন নিয়ে। আর উপায় নেই, আর রেহাই নেই। মৃত্যুর পাত্র ষোলকলায় পূর্ণ হয়েছে তার। ভাবতে ভাবতে একেবারেই নিথর হয়ে গিয়েছে রেঙকিলান।
আচমকা সেঙাই-এর থাবা এসে পড়ল কবজির ওপর। তারপর সেই থাবাটা একটা হালকা পাখির মতো রেঙকিলানের দেহটাকে উড়িয়ে নিয়ে চলল যেন। অস্ফুট চেতনার মধ্যে রেঙকিলান একটু একটু বুঝতে পারছে, পায়ের তলা দিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে ঝোঁপঝাড় আর বুনো ঘাসের বন। মাথার ওপর থেকে সরে সরে যাচ্ছে খাসেম পাতার ছাদ, ভেরাপাঙের নিবিড় ডালপালা। একসময় টিজু নদীর দূর বাঁকে এসে থামল সেঙাই; বজ্রমুঠি আলগা করে ছেড়ে দিল রেঙকিলানকে। কদর্য গালাগালি দিয়ে উঠল, ইজা হান্টসা সালো। একটা কুত্তী হয়ে গেছিস একেবারে।
পাহাড়ী শীতের দুপুরেও দর দর করে ঘাম নেমে আসছে রেঙকিলানের। আশ্চর্য, সে তো ভীরু নয়। বর্শার ফলা হাতের থাবায় ধরা থাকলে রক্তে রক্তে সে-ও তো আদিম অরণ্যের আহ্বান শোনে, হত্যার প্রেরণা পায়। এর আগে অনেকবার সে এসেছে শিকারে। তবে আজ কেন তার হাত-পা এমন শিথিল হয়ে আসছে? বার বার চেতনার দিগন্ত থেকে উঁকি দিচ্ছে একটা ভয়ানক আনিজার মুখ?
সেই অপরাধ। স্ত্রীর সঙ্গে এক বিছানায় শুয়ে অপবিত্র দেহমন নিয়ে শিকারে আসা। পাপবোধটা যেন শ্বাসনালির ওপর চেপে চেপে বসছে রেঙকিলানের। ভয়াতুর চোখে সে তাকাল সেঙাই-এর দিকে।
সেই আবার হুঙ্কার দিয়ে উঠল, তোকে নিয়ে শিকারে আসাই আমার ভুল হয়েছে। সাধে কি বলি, বিয়ে করে একটা ছাগী হয়ে গেছিস।
একটি শব্দও করল না রেঙকিলান। প্রতিবাদের একটি উত্তরও জুগিয়ে এল না তার ঠোঁটে।
টিজু নদীর এই বাঁক থেকে সালুয়ালাঙের মানুষগুলোর চিৎকার ক্ষীণতম একটা রেশের মতো শোনাচ্ছে। আর ভাবনার কোনো কারণই নেই। নিরাপদ ব্যবধানে সরে আসতে পেরেছে তারা। তবু রেঙকিলানের স্নায়ুগুলো থরথর করে কাঁপছে।
দুপুরের ঝকঝকে রোদ এখন ম্যাড়মেড়ে। পশ্চিম পাহাড়ের চূড়াটার ওপর সূর্য স্থির হয়ে রয়েছে। উতরাই-এর দিকে এখনই ছায়া-ছায়া অন্ধকার। উপত্যকার ঢাল বেয়ে রোদের নিস্তেজ রং পাহাড়ী বনের ঝাপসা সবুজের সঙ্গে মিশতে শুরু করেছে।
ঘন ঘন কয়েকটা নিশ্বাস ফেলল সেঙাই। তারপর কিছুক্ষণ জিরিয়ে রেঙকিলানকে নিয়ে টিজু নদী পার হয়ে ওপারে চলে গেল।
.
২.
রোদের মধুর আমেজটুকু গায়ে এসে লাগছে স্নিগ্ধ মমতার মতো। শীতের শুরুতে বিকেল বেলাতেই বাতাস হিমাক্ত হয়ে উঠেছে।
রেঙকিলান আর সেঙাই শ্রান্ত শরীর টানতে টানতে একটা বড় ভেরাপাঙ গাছের ওপর এসে বসল। অনাবৃত দেহে অনেকগুলো রক্তাক্ত আঁচড়ের দাগ ফুটে বেরিয়েছে।
