ভেরি গুড।
স্যার, আমার প্রমোশন–চ্যাটার্জির সগুম্ফ মুণ্ডটা বিগলিত হয়ে ঝুলে পড়ল নিচের দিকে। সমানে হাত কচলাতে লাগল সে।
ঠিক সময়েই হবে। ভাবনার কিছু নেই। এখন তুমি যাও–
দরজার দিকে একটা পা বাড়িয়ে অ্যাবাউট টার্নের ভঙ্গিতে ঘুরে দাঁড়াল বৈকুণ্ঠ, স্যার, একটা কথা–
ভুরু কুঁচকে গেল বসওয়েলের। বিরক্ত মুখে জিগ্যেস করল, কী হল আবার?
একবার চোখ তুলেই সঙ্গে সঙ্গে নামিয়ে নিল বৈকুণ্ঠ। হৃৎপিণ্ডটা লাফিয়ে ঠোঁটের কাছে উঠে এল তার। কণ্ঠনলীটা কেউ যেন কঠিন থাবায় চেপে ধরেছে, স্যার, পাহাড়ী দুটো এতক্ষণ গোঙাচ্ছিল, এখন আর শব্দ করছে না। ব্রিজলালটা বড় গোঁয়ার, ব্যাটন দিয়ে একটু বেশিই মার দিয়ে ফেলেছে।
ইজ ইট! কুটিটা এবার তীক্ষ্ণ হয়েছে বসওয়েলের। এক মুহূর্ত কী যেন ভাবল সে, তারপর বলল, ডোন্ট ওরি। যাও, পাহাড়ী দুটোকে পথে ফেলে দিয়ে এস। শিক্ষাটা ভালো করেই হোক।
পাশের ঘরে চলে গেল বৈকুণ্ঠ।
আর কোমরের পেছনে আঙুলে আঙুলে ফাঁস পরিয়ে মটকাতে মটকাতে বসওয়েল বিড়বিড় করে বলল, আচ্ছা, সব দেখা যাবে। গাইডিলিও, গ্যান্ডি–স্টরচারের গুঁতোয় পাহাড়ীদের মন থেকে ওই নাম দুটো আমি উপড়ে ফেলে দেব। তবে আমার খাঁটি ব্রিটিশ বার্থ। একটা অশ্রাব্য এবং কুৎসিত শপথ আবৃত্তি করল পুলিশ সুপার বসওয়েল। অখ্রিস্টানসুলভ প্রতিজ্ঞা।
.
৩১.
দক্ষিণ দিকের পথটা পাকে পাকে পাহাড় বেয়ে মাও-এর দিকে চলে গিয়েছে। মাও ডিঙিয়ে, অনেক পাহাড়চূড়া আর ঘন বন পেরিয়ে গেলে পৌঁছনো যাবে মণিপুরে, ইম্ফলে। আর বাঁ দিকে সেই পথই দোল খেয়ে উঠে গিয়েছে কোহিমায়। কোহিমার পাহাড় ছুঁয়ে ডিমাপুরের দিকে। তারপর মণিপুর রোড স্টেশনে গিয়ে থেমেছে।
পথের পাশে নিবিড় বনের ভেতর টিলার চূড়ায় একটি ছোট্ট ঘর। বাঁশের দেওয়াল, ওপরে টোঘুটুঘোটাঙ পাতার চাল, ওক কাঠের পাটাতন।
পাটাতনের ফাঁকে ফাঁকে গোটাতিনেক পে কাঠের মশাল জ্বলছে। স্নিগ্ধ আলো। সেই আলো ছড়িয়ে পড়েছে একটি নারীমূর্তির ওপর। সামনের বাঁশের মাচানে স্থির হয়ে বসে রয়েছে। সেই মূর্তি। বড় কপাল, টানা টানা লম্বাটে চোখে দুখণ্ড নীলা যেন জ্বলছে। গলাটা ঘিরে এক পাঁজ মোটা কার্পাস তুলো জড়ানো। সারা দেহে মণিপুরী মেয়েদের মতো ঢোলা পোশাক। আশ্চর্য উজ্জ্বল মুখখানা থেকে আলো ঠিকরে পড়ছে যেন। মনে হয়, এই মুখ থেকে কণা কণা আগুন সংগ্রহ করে ওই পে কাঠের মশাল তিনটে জ্বলছে। বিচিত্র এই নারীমূর্তি। এ মুখের সঙ্গে কোহিমার আকাশে সন্ধ্যাতারাটির কোনো মিল নেই। এ মুখের সঙ্গে পাহাড়ী ভূমিকম্পের যেন আশ্চর্য সঙ্গতি রয়েছে, মিল আছে আকাশ থেকে হঠাৎ খসে যাওয়া একটা উল্কার সঙ্গে। রানী গাইডিলিও।
পাশাপাশি বাঁশের আরো কয়েকটি মাচান। নারীমূর্তির চারপাশে সেই মাচানগুলো সাজানো। সেগুলোর ওপর বসে রয়েছে কয়েকটি যুবক। সমস্ত দেহে কেতাদুরস্ত সাহেবি পোশাক।
গাইডিলিও বললেন, আপনি তো কলকাতা থেকে এলেন, সেখানকার অবস্থা কেমন?
একেবারে সামনের মাচানে বসে রয়েছে যে যুবকটি তার নাম লিকোক্যুঙবা। সে বলল, অবস্থা সাঙ্ঘাতিক। গান্ধিজির নামে সারা দেশ মেতে উঠেছে। আমাদের মেডিকেল কলেজের ছেলেরা ছাড়াও অন্য সব কলেজের ছেলেরা, স্কুল আর ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা, কেউ বাদ যায় নি। স্ট্রাইক হচ্ছে, নন-কো-অপারেশনের ডাকে সবাই সাড়া দিয়েছে। আজব শহর কলকাতা, আন্দোলনের নামে একেবারে খেপে উঠেছে।
তারপর?
আমি নিজে গান্ধিজির বক্তৃতা শুনেছি। ব্রিটিশাররা ভারত না ছেড়ে যাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না। শুধু কলকাতায় নয়, বোম্বাই পাঞ্জাব গুজরাট–সমস্ত ভারতবর্ষ একেবারে পাগল হয়ে উঠেছে।
ঠিক। রানী গাইডিলিওর দুচোখে নীলা জ্বলছে। কিন্তু কণ্ঠ কি শান্ত, কি গম্ভীর, আমি অনেক ভেবে দেখেছি, আমাদের এই পাহাড় থেকে সাহেবদের হটিয়ে দিতে হবে। ওরা এসে জোর করে খ্রিস্টান করছে, আমাদের ধর্ম নষ্ট করছে। সমতলের বাসিন্দাদের সঙ্গে আমাদের ঝগড়া বাধিয়ে দিচ্ছে। পাহাড়ে এসব চলবে না।
ঠিক, ঠিক কথা। ঘরের বাকি সবাই একসঙ্গে সায় দিল, আমাদের নাগা পাহাড়ে একটা সাহেবকেও থাকতে দেব না।
গাইডিলিও বললেন, দু-চারজনের পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব না। তা ছাড়া খুনখারাপি করে ওদের আমরা তাড়াব না। আমাদের পথ হবে গান্ধিজির মতো অহিংস। এর জন্যে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে সব মানুষকে বোঝাতে হবে। সকলকে এক করতে হবে।
ঠিক, ঠিক।
আপনারাও তো শিলং-গৌহাটির ছাত্র। সেসব জায়গার খবর কী? বাঁ পাশের যুবকদের দিকে তাকালেন গাইডিলিও।
গোপীনাথ বরদলৈ, রোহিণী চৌধুরির লিডারশিপে নন-কো-অপারেশন শুরু হয়েছে। একটি যুবক বলল।
দেখুন, আমাদেরও, মানে পাহাড়ী মানুষদের সংগঠন করতে হবে। সাহেবরা, পাদ্রীরা অনেককে টাকাপয়সা দিয়ে বশ করে ফেলেছে। সে যা হোক, আমাদের অনেক অসুবিধা। গ্রামের পাহাড়ীরা যারা কোনোদিন শহর দেখেনি, যেখানে এখনও মাথা কাটার দল রয়েছে, তাদেরও বোঝাতে হবে। তার জন্যে আপনাদেরই সব দায়িত্ব নিতে হবে।
নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।
লিকোক্যুঙবা বলল, আমি লোহটা নাগা। আমাদের গ্রামে ফিরে গিয়ে সাহেবদের মতলবের কথা বলব। গান্ধিজির কথা বলব। গ্রামের লোকেরা বড় সরল, ওদের বুঝিয়ে দিলে ঠিকই বুঝবে।
