আরো কিছু বলত বসওয়েল, তার আগেই জন তিনেক নাগা সর্দার ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। হাতের থাবায় বর্শা, মাথায় মোষের শিঙের মুকুট, সারা গায়ে দড়ির লেপ জড়ানো, গলায় সাপের হাড়ের মালা।
বসওয়েল গদগদ ভঙ্গিতে অভ্যর্থনা জানাল, এসো সর্দারেরা, তারপর খবর কী?
তিনজনেই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল, না না, আমরা পারব না। এই দ্যাখ, গাইডিলিওকে ডাইনি বলতে গিয়েছিলাম সিকুয়ামাক বস্তিতে। আমাদের বর্শা দিয়ে ফুঁড়ে দিয়েছে।
একজন পিঠ দেখাল। একজন হাত। আর একজন কণ্ঠার কাছের নরম জায়গা। বর্শার ফলায় তিনজন ক্ষতবিক্ষত হয়ে এসেছে। টোঘুটুঘোটাঙ ফুলের মতো থাকা থোকা রক্ত জমে রয়েছে আঘাতের জায়গাগুলোতে।
এই নে তোর টাকা। গাইডিলিওকে ডাইনি বলতে গিয়ে শেষে জান দেব নাকি? বক্তির লোকেরা সব খেপে গেছে। তিনজনেই কোমরের তলার গোপন থলে থেকে একরাশ কাঁচা টাকা ঝনঝন করে ওক কাঠের পাটাতনে ছুঁড়ে দিল।
নিচের কদাকার দাঁতের পাটিটার ওপর ওপরের পাটিটা নেমে এল বসওয়েলের। চোয়াল কঠিন হল। তামাটে ভুরু বেঁকে গেল। চোখ দুটো দাবাগ্নির মতো ধকধক করে জ্বলছে।
আচমকা পাশের ঘরে পাহাড়-ফাটানো আর্তনাদ উঠল, আউ—উ–উ–
ছোট দারোগা বৈকুণ্ঠ চ্যাটার্জির দলন-মলন শুরু হয়েছে। এই হল আদিপর্ব। চমকে উঠল তিন পাহাড়ী সর্দার, কী হল রে সাহেব? কাকে মারছে?
বসওয়েলের দুচোখে একটা কুটিল ছায়া খেলে গেল। কপালের ওপর কয়েকটা জটিল রেখার হাবিজাবি ফুটে উঠল। বিশাল এবং ভয়ানক মুখখানা তিনটি সর্দারের মধ্যে নামিয়ে আনল সে। ফিসফিস গলায় বলল, আসান্যুরা পাহাড়ীদের মারছে।
কেন? গর্জে উঠল পাহাড়ী সর্দারেরা, একেবারে সাবাড় করে ফেলব শয়তানদের।
আরে চুপ, চুপ। বেশি চেঁচামেচি কোরো না। আসান্যুরা ভারি শয়তান। বন্দুক আছে ওদের। গুলি মেরে খতম করে ফেলবে। অপরিসীম ভয়ের ভঙ্গি করে বসওয়েল বলল।
বন্দুকের মহিমা সম্বন্ধে অতিমাত্রার সচেতন এই পাহাড়ী সর্দারেরা। কয়েকদিন আগেই তারা দেখেছে, কেমন করে একটা মণিপুরী পুলিশ বড় বড় দুটো ময়াল সাপকে গুলি মেরে খতম করেছে। অতএব, পুরোপুরি নিভে গেল তিনজন বন্য মানুষ। রুদ্ধ গলায় তারা বলল,
তুই হুই আসান্যুদের ভাগিয়ে দে। নইলে ওরা বন্দুক দিয়ে আমাদের মারবে।
হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ভাগিয়ে দেব। তা হলে একটা কাজ করতে হবে।
কী কাজ?
যা বলেছি–ওই গাইডিলিওর নামে বস্তিতে বস্তিতে ডাইনি বলে আসবে।
বসওয়েলের কথা শেষ হবার আগেই পাশের ঘরের আর্তনাদটা তুমুল হয়ে উঠল। কিল, চড় আর ঘুষির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মিলিয়ে ব্যাটনের ঘা পড়ছে। মাঝখানে ইটের পাতলা দেওয়াল। সেটা যেন আঘাতের আওয়াজ আর আর্তনাদে এক নিমেষে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়বে।
এ-ঘরে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছে তিনটি পাহাড়ী সর্দার, আসান্যুরা মারছে কেন?
গাইডিলিওকে ওই পাহাড়ীরা ডাইনি বলেনি, তাই মারছে। শিগগির টাকা নিয়ে বস্তিতে বস্তিতে গাইডিলিওর নামে ডাইনি বলে এসো। নইলে আসান্যুরা রেহাই দেবে না। ওরা কিন্তু আনিজার মতো শয়তান। এবার বেতের কেদারা থেকে পাহাড়ী সর্দারদের মধ্যে উঠে এল বসওয়েল। অন্তরঙ্গ গলায় বলল, আরো টাকা দেব।
কাজ হল। কাঠের পাটাতন থেকে টাকাগুলো তুলে ফের কোমরের গোপন থলিতে চালান করে দিল সর্দারেরা। তারপর উঠতে উঠতে বলল, আমরা এবার যাই। তুই কিন্তু হুই বন্দুকওলা আসান্যুদের পাহাড় থেকে ভাগিয়ে দিবি। নইলে আমাদের মেরে ফেলবে।
নিজের কৃতিত্বে প্রায় লাফিয়ে উঠল বসওয়েল, নিশ্চয়ই। ব্রাদার-ইন-লদের সব ভাগিয়ে দেব পাহাড় থেকে। তোমাদের কিছু ভাবতে হবে না।
বাইরে অজগরের দেহের মতো কোহিমার আঁকাবাঁকা পথ। সেই পথে রাত্রির ঘন অন্ধকারে মিলিয়ে গেল তিন পাহাড়ী সর্দার। শয়তানের তিনটি শিকার।
তারপর অনেকটা সময় পার হয়ে গিয়েছে। কোহিমার পাহাড়ে রাত্রি এখন গম্ভীর হয়েছে, নিবিড় হয়ে নামছে অন্ধকার।
গ্যাসের আলোটা জ্বলছে, থেকে থেকে দমকা বাতাসে কাঁপছে। কটু দুর্গন্ধ আরো উগ্র হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
তিনটি পাহাড়ী সর্দার অনেকক্ষণ আগে মিলিয়ে গিয়েছে কোহিমার পথে। পাদ্রী ম্যাকেঞ্জিও বিদায় জানিয়ে চার্চে চলে গিয়েছে। ঘরের মধ্যে একটি মানুষও আর নেই। সামনের টেবলটার ওপর মাথা রেখে বসে রয়েছে বসওয়েল। একেবারেই নিশ্চল, একেবারেই নিথর সমাধিস্থ। এতক্ষণ পাশের ঘরে পাহাড়ী দুটোর অবিরাম চিৎকার আর আঘাতের শব্দ সুন্দর সিমফোনির মতো মনে হচ্ছিল বসওয়েলের। নেশার মতো মনোরম এক আনন্দে সেই সিমফোনি তার সারাটা চেনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।
এখন আর পাশের ঘর থেকে দেওয়াল ভেদ করে একটু শব্দও আসছে না এদিকে। শুধু গ্যাসের আলোর চারপাশে একটা খারিমা পতঙ্গ চক্রাকারে ঘুরপাক খেয়ে চলেছে।
স্যার—
খাটসঙ কাঠের টেবল থেকে মাথা তুলল বসওয়েল। সামনেই ছোট দারোগা বৈকুণ্ঠ চ্যাটার্জি।
কী ব্যাপার?
স্যার, যা বলেছিলেন সব ঠিক ঠিক করেছি। একটুও এদিক ওদিক হয়নি। নিজের কৃতিত্বে অদ্ভুত এক ধরনের হিংস্র আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল যেন বৈকুণ্ঠ চ্যাটার্জি, স্যার, পাহাড়ী দুটোকে টাটকা দাওয়াই দিয়েছি। একটা তো আধ-মরাই ছিল। আর একটাকে আমাদের ব্রিজলাল আর সাধু তেওয়ারী বেশ বানিয়েছে।
