ইয়েস স্যার, তা হলে বড় ভালো হয়। আমি বেঁচে যাই। একেবারে বিগলিত হয়ে গেল বৈকুণ্ঠ চ্যাটার্জি। সেই সঙ্গে হাত কচলাতে শুরু করল।
তোমাকে মাসকয়েক পর ট্রান্সফার করব। আর ছোট দারোগা নয়, এবারে ওসি হয়ে যাবে তুমি। তির্যক দৃষ্টিতে বৈকুণ্ঠ চ্যাটার্জির খুশিটা জরিপ করতে লাগল পুলিশ সুপার বসওয়েল। দেখতে লাগল, কেমন করে তার কথাগুলো ওই নিগারটার সগুফ মুখখানায় একটি লোলুপ প্রতিক্রিয়া আঁকছে।
ওসি! উল্লাসে প্রায় অব্যক্ত একটা শব্দ করে উঠল বৈকুণ্ঠ চ্যাটার্জি, প্রমোশন স্যার!
ইয়াস, প্রমোশন। তার আগে ওই পাহাড়ীগুলোকে একটু শায়েস্তা করতে হবে। বেশ ভালো করে, বুঝলে তো। দলাই-মলাইর ব্যাপারে তুমি তো পাকা আর্টিস্ট। যাও, যাও উৎসাহ দিতে লাগল পুলিশ সুপার বসওয়েল, তোমার স্কিল দেখতে চাই।
রীতিমতো প্রেরণা পেয়েছে বৈকুণ্ঠ। প্রচণ্ড উৎসাহে ভারী বুটে খট খট আওয়াজ তুলে পাশের ঘরে চলে গেল। পাকা আর্টিস্ট! নাঃ, অনেকদিন পর, অনেক অনেক বছরের শীতবসন্ত পেরিয়ে শজারুর কাটার মতো কালো কালো গোঁফের প্রায় অর্ধেক পাকিয়ে ফেলেছে বৈকুণ্ঠ। কিন্তু বরাতটা এমনই খারাপ যে ছোট দারোগা হয়েই বিশ বছর কাটিয়ে ফেলল সে। অথচ প্রমোশনটা আকাশের তারার মতো নাগালের বাইরেই রয়ে গিয়েছে। পাণ্ডু থানার ওসি! ধমনীতে রক্তের কণিকাগুলি উত্তাল হয়ে ভেঙে পড়তে লাগল। কোহিমা পাহাড়ের নিঃসঙ্গ গুয়াহাটি। বছরে একবার তার সেবা, আদর এবং সোহাগ পায় কি না পায়; ছুটিই মেলে না। পাঁজরের হাড়ে হাড়ে যক্ষ বিরহীর প্রাণকে বন্দি করে এক আঁজলা ছুটির তৃষ্ণায় দিনের পর দিন গুনে যায় বৈকুণ্ঠ। ছটফট করে। তীক্ষ্ণ যন্ত্রণায় মনটা ফালা ফালা হয়ে যায় যেন। এই কোহিমা শহর, সমতল থেকে অনেক উঁচুতে এই পাহাড়চূড়া। চারপাশে চড়াই উতরাই, টিলা, গুহা আর আদিম নিবিড় অরণ্য, উপত্যকা আর মালভূমি। ঋতুতে ঋতুতে এর রংবদলের পালা, এর রূপবদল। ফুলে ফুলে, লতায় পাতায় এর মনোরম সাজসজ্জা। বৈকুণ্ঠের মনে হয়, জন্মাবধি এই পাহাড়চূড়ায় নির্বাসিত হয়ে রয়েছে। এক এক সময় সন্দেহ জাগে, সে আর রক্তমাংসের মানুষ নয়, একটা প্রেতের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে কোহিমার পাহাড়ে পাহাড়ে।
শুধু নাগা আর নাগা। একটি মানুষ নেই কথা বলবার, একটি মানুষ নেই কথা শুনবার। মানুষ নয়, সব যেন পাহাড়ী বুনো জানোয়ার। তিন বছর এখানে এসেছে, তাদের ভাষা এখনও পুরোপুরি রপ্ত করে উঠতে পারে নি বৈকুণ্ঠ। এরা ছাড়া আর আছে সমতলের বেনিয়ারা। তাদের সঙ্গে আড্ডা জমানো দূরের কথা, আলাপ পরিচয় রাখতে ছোট দারোগার মর্যাদায় কোথায় যেন আঘাত লাগে। এক-এক সময় এই কোহিমা পাহাড় থেকে পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করে বৈকুণ্ঠর।
আপাতত খুশিতে ফুসফুসটা বেলুনের মতো ফুলে ফুলে উঠছে। পাণ্ডু থানার ওসি! এতদিনের লালিত স্বপ্নটা হাতের মুঠোয় একটা পাহাড়ী আপেলের মতো নেমে এসেছে। তার আগে একটা কর্তব্য বাকি রয়েছে বৈকুণ্ঠর। অদ্ভুত নৈপুণ্যে অভিভূত করে ফেলতে হবে পুলিশ সুপারকে। সন্ধ্যার একটু আগে যে পাহাড়ী দুটোকে চার্চ থেকে টেনে নিয়ে এসেছে পুলিশরা, তাদের সমস্ত দেহে চাবুক এবং হান্টারের আঘাতে তার নৈপুণ্য এঁকে রাখবে। অন্তর্নিহিত বীর রসের প্রেরণায় ভারী বুটজোড়া পাথুরে মেঝের ওপর ঠুকতে লাগল বৈকুণ্ঠ। শব্দ হতে লাগল–খট খট।
৩০. ঘরের মধ্যে গ্যাসের আলো
৩০.
ঘরের মধ্যে একটা মণিপুরী পুলিশ গ্যাসের আলো জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছে। গ্যাসজ্বলা তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে।
বসওয়েল তাকাল ম্যাকেঞ্জির দিকে। বলল, কী মনে হয় ফাদার?
কিসের কথা বলছে? দুচোখে কৌতূহল নিয়ে ম্যাকেঞ্জি তাকাল।
এই যে ব্যাপারটা। দেখলেন তো, প্লেনসম্যানদের পাহাড়ীরা দেখতে পারে না। চ্যাটার্জির কথাগুলো নিশ্চয়ই শুনেছেন। বলে একটু থামল বসওয়েল। তারপর বিরাট মুখখানা ম্যাকেঞ্জির কানের কাছে নিয়ে এল, খবরদার, ভুল করেও পাহাড়ীদের গায়ে আমাদের ব্রিটিশারদের হাত ভোলা চলবে না। যদি ঠেঙাতে হয়, তবে প্লেনসম্যানদের দিয়েই এই অপ্রিয় কাজটি করাতে হবে।
অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ম্যাকেঞ্জি। কিছুই যেন ধরতে পারছে না সে। বসওয়েল বলল, বুঝতে পারলেন না তো ফাদার? এটা ডিপ্লোম্যাসি। পোলিটিকস। প্লেনসম্যানদের সঙ্গে ওই হিলি হিদেনগুলোর ইউনিয়ন হলেই মুশকিল। রাজ্যপাট মাথায় উঠে যাবে। সবসময় প্লেনস আর হিলসের মধ্যে একটা ফিউড বাধিয়ে রাখতে হবে।
ব্রিলিয়ান্ট! সত্যি, এটা আমার মাথায় স্ট্রাইক করেনি তো। ম্যাকেঞ্জির গলা বিস্ময়ে কাঁপতে লাগল।
আইভরি পাইপের মধ্যে সুরভিত তামাক পুরতে লাগল বসওয়েল। অখণ্ড মনোযোগে, নির্বিকার গাম্ভীর্যে ম্যাকেঞ্জির বিস্ময়টা উপভোগ করছে সে। শুধু একটি আত্মপ্রসাদের হাসি তার সারা মুখে অদ্ভুতভাবে ফুটে রইল।
হঠাৎ ম্যাকেঞ্জি বলল, বড় মুশকিল হয়েছে পিয়ার্সনকে নিয়ে। তলে তলে ও এই পাহাড়ীদের সিমপ্যাথাইজ করে। প্রিচিঙের বিরুদ্ধে কথা বলে–বুঝলেন মিস্টার বসওয়েল।
আপনি আগেও বলেছেন। আচ্ছা পরে এই ব্যাপারটা ভাবা যাবে। আত্মপ্রসাদের যে হাসিটা এতক্ষণ ফুটে ছিল বসওয়েলের মুখে, সেটা শ্লেটের লেখার মতো মুছে গেল। গম্ভীর, থমথমে গলায় বলল, একটু ওয়াচ–
