ভয়ানক কিছু একটা ঘটে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব ছিল না। কিন্তু তার আগেই চারিদিক থেকে বিহারি, অসমিয়া আর বাঙালি পুলিশরা ঘিরে ধরেছে সারুয়ামারুকে। ঝকঝকে বেয়নেটের ফলাগুলো বুক, পিঠ-সারাদেহের দিকে হিংস্রভাবে উদ্যত হয়ে রয়েছে। অসহায় দৃষ্টিতে চনমন করে তাকাল সারুয়ামারু। পায়ের কাছে সেঙাই পড়ে রয়েছে, প্রায় অচেন। সবুজ ঘাসের জমিতে তাজা এবং ঘন, রক্ত জমে আছে। থোকা থোকা লাল টোঘুটুঘোটাঙ ফুলের মতো।
গর্জে উঠল ম্যাকেঞ্জি, শয়তানটাকে নিয়ে যাও আউট-পোস্টে। ওই ডেভিলের বাচ্চাটাকেও তুলে নিয়ে যাও। সেঙাইর দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিল ম্যাকেঞ্জি, আমি একটু পরেই যাচ্ছি। শয়তানটাকে আচ্ছা করে দাওয়াইর ব্যবস্থা কর। পাহাড়ী তেজ আমি উপড়ে দিয়ে যাব, তবে আমার নাম ম্যাকেঞ্জি।
অদ্ভুত করিৎকর্মা। নিমেষের মধ্যে সেঙাই আর সারুয়ামারুর দেহ দুটো টেনে টেনে, কোহিমার রুক্ষ উঁচুনিচু পাথুরে পথের ওপর দিয়ে আউট-পোস্টের দিকে নিয়ে গেল পুলিশেরা।
.
২৯.
খানিকটা পরেই আউট-পোস্টে এল ম্যাকেঞ্জি। কবজির ওপর বিরাট ব্যান্ডেজ।
আসুন, আসুন ফাদার–পুলিশ সুপার বসওয়েল এখনও তার কোয়ার্টারে ফিরে যায়নি। ম্যাকেঞ্জিকে দেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, কী ব্যাপার, পুলিশরা সব রিপোর্ট দিয়েছে। ব্লাডশেড ইন দ্য চার্চ! এ তো বড় সাংঘাতিক ঘটনা! এই হিদেনগুলো সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
কবজিটা সামনে তুলে ধরল ম্যাকেঞ্জি। বিবর্ণ মুখে হাসল, এই দেখুন, বর্শা দিয়ে আমাকে কুঁড়েছে।
চার্চে গিয়ে মিশনারির গায়ে হাত দেওয়া, এ আমি বরদাস্ত করব না। দরকার হলে নাগা হিলস থেকে পাহাড়ী শয়তানদের চিহ্ন মুছে দেব। হাউ ডেঞ্জারাস! অব্যক্ত একটা আর্তনাদ করল বসওয়েল।
ডেঞ্জারাস, সত্যি ডেঞ্জারাস। তবে আমি ভাবছি অন্য কথা। বাছা বাছা সব জাঁদরেল লোককে গভর্নমেন্ট পাঠিয়েছে এই নাগা পাহাড়ে। এই দেখুন, আপনি ফাস্ট গ্রেট ওয়ারে কর্নেল ছিলেন। আমার অতীত জীবনটা নিশ্চয়ই বীডস কাউন্ট করে কাটে নি। তবু দেখুন, এই প্যাগানগুলোকে বাগে আনতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছি।
দ্যাটস রাইট। কোনো সন্দেহ নেই। সরবে সমর্থন জানালো বসওয়েল।
এই দেখুন না, প্লেনসমেনদের সঙ্গে এদের মিশতে বারণ করেছি। কত সাবধান হয়ে এদের ওয়াচ করছি, কিন্তু যা হবার তা হয়েছে। চোখেমুখে হতাশা ফুটে বেরুল ম্যাকেঞ্জির।
কী হল, কী ব্যাপার? চেয়ারটাকে টেনে ম্যাকেঞ্জির কাছাকাছি অন্তরঙ্গ হয়ে বসল বসওয়েল।
ডিমাপুরের পথের ওপর যে বাজারটা রয়েছে সেখানে গ্যান্ডির এক চেলার দোকান আছে। লোকটার নাম মাথোলাল।
কী সর্বনাশ! ওহ ক্রাইস্ট! চিৎকার করে উঠল বসওয়েল, তারপর?
দ্যাট ডেভিলস সন পাহাড়ীদের মধ্যে গ্যান্ডির নন-কো-অপারেশনের খবর প্রচার করছে। গাইডিলিওকে রানী বলে সকলকে মন্ত্র দিচ্ছে। যে পাহাড়ী দুটোকে একটু আগে এই আউট পোস্টে নিয়ে এসেছে পুলিশরা, সেই শয়তান দুটো ওই সব শুনে এসেছিল। এই নিয়ে কথাবার্তা হতে হতে আমাকে বর্শা ছুঁড়ে মেরেছে সেঙাইটা।
ইজ ইট! মাথোলাল! গ্যান্ডি। গাইডিলিও! নামগুলিকে কড়মড় করে চিবিয়ে ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে লাগল পুলিশ সুপার বসওয়েল, আচ্ছা, আমি জানি কেমন করে গ্যান্ডি আর গাইডিলিওকে পাহাড়ীদের মন থেকে মুছে দিতে হয়। তারপরেই চড়া, কর্কশ গলার স্বরটা
অনেক উঁচুতে উঠল বসওয়েলের, চ্যাটার্জি, চ্যাটার্জি
ছোট দারোগা বৈকুণ্ঠ চ্যাটার্জি জ্যা-মুক্ত তীরের মতো ঘরের মধ্যে ছুটে এল। বুটে বুটে খটাখট শব্দ করে একটা সসম্ভ্রম সেলাম ঠুকল, ইয়েস স্যার–
ছোট দারোগা বৈকুণ্ঠ চ্যাটার্জি। নাকের নিচে একজোড়া কাঁচাপাকা ঘন গোঁফ সগৌরবে বিরাজ করছে। প্রান্ত দু’টি সূক্ষ্ম এবং সূচিতীক্ষ্ণ। মোটা বদখত নাকটা সামনের দিকে ঝুলে রয়েছে। বুক আর পেটের মাঝখানে চামড়ার চওড়া বেল্ট। বেল্টের মাঝখানে পেতলের প্লেটটা ঝকমক করছে। তার ওপর কোহিমা পুলিশের নাম খোদিত রয়েছে। বেখাপ্পা চেহারা, বেটপ আকৃতি। সমস্ত শরীরে রাশি রাশি, কালো রোমশ মাংস। মাংসপিণ্ডগুলির সুষ্ঠু এবং সুসংবদ্ধ ব্যবহার হয় নি। খুশিমতো হাতে-পায়ে, বুকে-মুখে যেখানে ইচ্ছা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে যেন।
পুলিশ সুপার বসওয়েল বলল, চার্চ থেকে যে পাহাড়ী দুটোকে ধরে এনেছে পুলিশরা, তাদের একটু দলাই-মলাইর ব্যবস্থা করতে হবে।
দলাই-মলাই!
ইয়াস। ওদের সারা গায়ে বড় ব্যথা। আই মীন, সেই বেদনার জন্যে একটু ম্যাসাজ। বুঝলে তো? অর্থপূর্ণ একটা প্রাকুটি হানল বসওয়েল।
একটু ইতস্তত করল বৈকুণ্ঠ চ্যাটার্জি। খানিকক্ষণ আমতা আমতা করে সে বলল, কিন্তু স্যার, এই পাহাড়ীরা তো বোঝে না, আপনাদের কুম আমরা তামিল করি। ওরা মনে করে, আমরাই দোষী। ওরা স্যার, আমাদের একেবারেই দেখতে পারে না। আমরা এই ইন্ডিয়ার প্লেনসম্যানরা ওদের দুচোখের বিষ।
ধক করে বসওয়েলের চোখদুটো জ্বলে উঠল। মাত্র একটি মুহূর্ত। তারপরেই বাৎসল্যের হাসি ছড়িয়ে পড়ল তার বিশাল এবং ভয়ানক মুখখানায়, আইসোর! পাহাড়ীরা তোমাদের প্লেনসম্যানদের দেখতে পারে না! বোঝোই তো, এরা হল ওয়াইল্ড বীস্টস। যাক, সেদিন তুমি পাণ্ডুতে ট্রান্সফার হবার দরখাস্ত দিয়েছিলে না?
