সেঙাই বলল, মাধোলাল যে বললে, তোরা অন্য দেশ থেকে এসেছিস, তোরা বিদেশি। তোরা এখানে কী করতে এসেছিস?
মাথোলাল! নামটাকে দাঁতের ফাঁকে কড়মড় করে চিবোতে লাগল ম্যাকেঞ্জি। আচ্ছা, ওই হাফ-নেকেড গান্ধির চেলার সঙ্গে পরে দেখা হবে। বিড়বিড় করে কথাগুলো বলে একটা অখ্রিস্টানসুলভ গালাগালি আওড়াল ম্যাকেঞ্জি।
সেঙাই তখনও বলছে, কী করতে এখানে এসেছিস তোরা?
এ জিজ্ঞাসার উত্তর জানা আছে ম্যাকেঞ্জির। কিন্তু সে উত্তর অন্তত এদের কাছে দেওয়া চলবে না। একটি অর্ধনগ্ন পাহাড়ী মানুষের প্রশ্ন যে এত মারাত্মক, এত জটিল, তা কি আগে জানত পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি।
ধীরে ধীরে সুকৌশলে মধুর হাসিতে মুখখানা ভরিয়ে তুলল ম্যাকেঞ্জি। বলল, আচ্ছা সেঙাই, সালুয়ালাঙ বস্তির সঙ্গে তোমাদের খুব ঝগড়া, তাই না?অন্য একটি প্রসঙ্গে সরে গেল সে।
সেঙাই মাথা নাড়ল, হু-হু, ওরা আমাদের শত্রু।
আচমকা চিৎকার করে উঠল সারুয়ামারু, কি রে সেঙাই, মাধোলাল না গান্ধিজির লড়াই আর রানী গাইডিলিওর কথা বলতে বারণ করে দিয়েছিল?
হু-হু– প্রবলবেগে মাথা দোলাতে লাগল সেঙাই। তারপরেই রক্তচোখে তাকাল ম্যাকেঞ্জির দিকে, হুই শয়তানটা সব জেনে নিল। ওর জান একেবারে খতম করে দেব। হুই শয়তানটা আমাদের বেইমান করল।
আমরা বিশ্বাসঘাতী হলাম। বেইমানি করলাম।
হু-হু, আহে ভু টেলো! আমরা পাহাড়ী মানুষ; আমাদের কেউ অন্তত বেইমান বলতে পারে না। হু-হু, আনিজার গোসা এসে পড়বে। সব হুই শয়তান সায়েবটার জন্যে। পাশ থেকে বর্শাটা তুলে নিল সেঙাই। অব্যর্থ লক্ষ্য। সাঁ করে সেটার ফলা কবজিতে গেঁথে গেল পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির। এক ঝলক তাজা রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এল। চার্চের চত্বরে মানবপুত্রের পবিত্র নামের ওপর এই পাহাড়ী পৃথিবী খানিকটা রক্তের কলঙ্ক মেখে দিল।
মার্ডার! মার্ডার! অ্যারেস্ট! অ্যারেস্ট–সন অব আ বিচ–আর্তনাদ করে উঠল ম্যাকেঞ্জি।
নিমেষে সেঙাইর ওপর মণিপুরী পুলিশ দুটো ঝাঁপিয়ে পড়ল। একজনের বেয়নেটের আধাআধি ফলা কোমরে গেঁথে গিয়েছে সেঙাইর। রাইফেলের কুঁদো দিয়ে তার মাথায় প্রচণ্ড এক ঘা বসিয়ে দিল অন্য জন।
আউ-উ-উ– চিৎকার করে সবুজ ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ল সেঙাই।
চার্চের দুটো বাড়ির পর আউট-পোস্ট।
ম্যাকেঞ্জি মণিপুরী পুলিশ দুটোর দিকে তাকাল। যন্ত্রণায় তার মুখখানা বিকৃত হয়ে গিয়েছে, শয়তানটাকে আউট-পোস্টে নিয়ে যাও। পাহাড়ী তেজ সব কমে যাবে ঠিকমতো ওষুধ পড়লে।
কবজির ক্ষতের ওপর আঙুল টিপে দাঁড়িয়ে রয়েছে ম্যাকেঞ্জি। আর এক পাশে বোধহীন, ভাবহীন, অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে সারুয়ামারু। ঘটনার আকস্মিকতায় একেবারে বোবা হয়ে গিয়েছে সে।
আবার চেঁচিয়ে উঠল ম্যাকেঞ্জি, নিয়ে যাও, হারি-ই আপ–
প্রায় অচেতন দেহ। সেঙাই-এর হাত ধরে ঘাসবনের ওপর দিয়ে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে চলল পুলিশ দুটো।
আচমকা নিষ্ক্রিয় অবস্থাটা কাটিয়ে উঠল সারুয়ামারু। পুলিশ দুটোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সেঙাইকে ছিনিয়ে নিল সে, ইজা হুবুতা! সেঙাইকে নিয়ে যাবে! একেবারে সাবাড় করে ফেলব।
সেঙাইকে ঘাসবনে ফেলে রেখে ফোঁস ফোঁস করে বারকয়েক নিশ্বাস ফেলল সারুয়ামারু।
মার্ডার, মার্ডার! পুলিশ, পুলিশ! চার্চ থেকে ম্যাকেঞ্জির চিৎকার আউট-পোস্টের দিকে। ধেয়ে গেল।
কয়েকটি মুহূর্ত। কোহিমার পথে ভারী বুটের আওয়াজ শোনা গেল। পাহাড়ী ঝড়ের মতো বাঙালি, বিহারি আর অসমিয়া পুলিশরা চার্চের নিরাপত্তায় ছুটে এসেছে।
সেঙাইকে কাঁধের ওপর তুলে পালিয়ে যায় নি সারুয়ামারু। এতক্ষণ তার চোখে শুধু পিঙ্গল আগুন ধকধক জ্বলেছে। সেঙাই-এর পাশে দাঁড়িয়ে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে সমানে খিস্তি করে গিয়েছে সে, আহে ভু টেলো। সব টেফঙের বাচ্চা। সেঙাইকে একবার ছুঁলে সাবাড় করে ফেলব। ফাদার হয়েছে! করস আঁকব না। চাই না কাপড়। মাথোলাল ঠিক বলেছে, তোদের মতো শয়তানের সঙ্গে লড়াই করতে হবে। আমাদের পাহাড়ে এসে আমাদেরই মারবে!
পরশু বিকেলে সেঙাইকে খানকয়েক রঙচঙে বাহারে কাপড় দিয়েছিল পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি। সিজিটোর ঘর থেকে সেগুলো নিয়ে এসে ম্যাকেঞ্জির গায়ের ওপর ছুঁড়ে মারল সারুয়ামারু। প্রবল ঘৃণায় মুখখানা কুঁকড়ে গিয়েছে তার। একদলা থুতু ম্যাকেঞ্জির মুখে ছিটিয়ে দিল, থুঃ থুঃ, এই নে তোর কাপড়। সেঙাইকে মারবে! আমাদের বস্তিতে একবার পেলে তোকে ছিঁড়ে ফেলব। থুঃ থুঃ
মুখের ওপর একদলা থকথকে বিজাতীয় তরল। ককিয়ে উঠল ম্যাকেঞ্জি, ওহ! সন্স অব ডেভিল। ব্যাস্টার্ডস। হিলি হিদেনস। আই মাস্ট সি–
এতকাল গালাগালিগুলো বিড়বিড় করে উচ্চারণ করত ম্যাকেঞ্জি। এমন মহিমা যে, কেউ শুনতে পেত না। আজ প্রথম সারপ্লিসের ছদ্মবেশ ফালা ফালা করে ছিঁড়ে ব্রেটনকশায়ারের। সেই আউটল আত্মপ্রকাশ করল। প্রচণ্ড ঘুষি বাগিয়ে সারুয়ামারুর দিকে ছুটে এল পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি। কিন্তু যত সহজে ঘুষিটা হানা যাবে ভাবা গিয়েছিল, কাজটা আদপেই তত সহজ। নয়। বর্শাটা থাবার মধ্যে বাগিয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে সারুয়ামারু। তার দু’টি পিঙ্গল চোখের মণিতে এক বিচিত্র শিকার ছায়া ফেলেছে। হুন্টসিঙ পাখির পালকের মতো ধবধবে এক সাহেব।
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল ম্যাকেঞ্জি। পাহাড়ী মানুষের থাবায় বর্শার ফলা বড় বন্য, বড় আদিম এবং নিষ্ঠুর। এ সত্য তার জানা।
