ভালো, খুব ভালো।
এক মুহূর্ত ভাবনার মধ্যে তলিয়ে রইল ম্যাকেঞ্জি। তারপর বলল, কী চাই তোমার বল দিকি সেঙাই? কটা কাপড়? কত টাকা?
আশেপাশেই কোথায় যেন ছিল পিয়ার্সন। বাঘের মতো এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল, হোয়াটস দিস ফাদার?
কী হল পিয়ার্সন! ঘাড় ঘুরিয়ে বিরক্ত চোখে তাকাল ম্যাকেঞ্জি, এত উত্তেজিত কেন?
এ ভারি অন্যায়। এভাবে লোভ দেখিয়ে ক্রিশ্চিয়ানিটি স্প্রেড করে কী লাভ? সেন্টদের সারমন আছে, লোভরিপুকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়। উত্তেজনায় থরথর কাঁপছে পিয়ার্সন।
প্রায় হুমকে উঠল ম্যাকেঞ্জি, ডোন্ট ইন্টারফেয়ার। কিসে লাভ হবে, বা না হবে, আমি তোমার কাছে জানতে যাব না। লিভ দিস প্লেস অ্যাট ওয়ান্স–
থ্যাঙ্কস। উদ্ধত পা ফেলে সামনের রাস্তায় গিয়ে নামল পিয়ার্সন।
পিয়ার্সনের গমনপথের দিকে আগ্নেয় চোখে তাকিয়ে ছিল ম্যাকেঞ্জি। যখন একটা উতরাই এর আড়ালে পিয়ার্সনের দেহটা অদৃশ্য হয়ে গেল ঠিক সেই সময় দৃষ্টিটাকে সেঙাই-এর মুখের ওপর এনে ফেলল সে। নাঃ, মেজাজটাকে একেবারে তিক্ত করে দিয়ে গেল লোকটা। একটা। ডেভিল। স্কাউন্ড্রেল।
কী এক দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলছিল সাদা মানুষ দুটো। এক বিন্দুও বুঝতে পারছিল না সেঙাই কি সারুয়ামারু। অবাক এবং ভীরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তারা।
ম্যাকেঞ্জি বলল, যে কথা বলছিলাম। বুঝলে সেঙাই, যা চাইবে তাই তোমাকে দেব। কিন্তু একটা কাজ করতে হবে।
কী কাজ?
তেমন কিছু নয়। ওই আসান্যুদের (সমতলের লোক) সঙ্গে মিশবে না। ওরা লোক বড় খারাপ। সারুয়ামারুকে বলে দিয়েছি, তোমার বাবা সিজিটোকেও বলেছি। কি সারুয়ামারু, বলিনি?
হু-হু– ঘন ঘন মাথা ঝাঁকাতে লাগল সারুয়ামারু, কথাটা ঠিক। হুই আসারা ভারি শয়তান। যারা ধুতি পরে তারা একেবারে শয়তানের বাচ্চা।
ঠিক, ঠিক। যা বলে দিয়েছি, তোমার সব মনে রয়েছে, দেখছি। আত্মপ্রসাদের হাসি ফুটল ম্যাকেঞ্জির মুখে, যাক ও-কথা। গাইডিলিওর কাছে যাওনি তো?
না, না।
ভালো করেছ। ও ডাইনি। একেবারে জানে খতম করে ফেলবে। বিস্ময়কর কৌশলে মুখেচোখে আতঙ্কের সব কটি রেখা ফুটিয়ে তুলল ম্যাকেঞ্জি, খবরদার ওর কাছাকাছি ঘেঁষবে না তোমরা।
ডাইনি! কে বললে ডাইনি? তুই মিথ্যে বলছিস। হুই যে মাধোলাল বললে, ও হল রানী। খুব ভালো ও, ডাইনি নয়। সোজাসুজি তাকাল সেঙাই, তুই সব মিথ্যে বলিস। তুই বড় শয়তান। মাধোলাল কত কী বললে রানীর সম্বন্ধে।
মাধোলাল! চমকে উঠল ম্যাকেঞ্জি, মাধোলাল কে?
সারুয়ামারু বলল, হুই যে বড় দোকান আছে ডিমাপুর যাবার পথে, সেই দোকানের মালিক মাধোলাল। কত কথা বললে মাথোলাল। ও তো আসান্যু, ধুতি পরে। অথচ কত ভালো। আমার বন্ধু হুই মাথোলাল। আমার বাবা ওর দোকান থেকে নিমক নিত, আমার ঠাকুরদা
সারুয়ামারুকে থামিয়ে দিল ম্যাকেঞ্জি, থাম থাম। আর কী বললে মাথোলাল? উত্তেজনায় চোখের মণি দুটো যেন ছিটকে বেরিয়ে আসবে ম্যাকেঞ্জির।
এবার সেঙাই বলল, হু-হু, সায়েবদের সঙ্গে কোথায় যেন আসাদের লড়াই হচ্ছে। কার যেন নাম বলল মাধোলাল। কি রে সারুয়ামারু, বল না হুই আসাদের সদ্দারটার নাম। আমার মনে পড়ছে না।
সারুয়ামারু বলল, আসান্যুদের সদ্দারটার নাম গান্ধিজি। মাথোলাল বললে, ওদের মহারাজ যেমন গান্ধিজি, আমাদের তেমনই রানী গাইডিলিও।
গান্ধিজি! কী ভয়ঙ্কর একটি শব্দ! সমতলের দেশ থেকে সব বাধা, সব ব্যবধান পেরিয়ে এই বনময় গিরিচূড়ায় এসে পৌঁছেছে। এই পাহাড়ের টিলায় টিলায়, গুহা আর অরণ্যে, ওই নামটা কী এক ইন্দ্রজালে বাতাসে বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। গান্ধিজি। নাম নয়, একটা ভয়াল ভোজবাজি। একটা দুর্বোধ্য ভেলকি। এ ভোজবাজির রহস্য অন্তত পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির অজানা। নাম নয়, ম্যাকেঞ্জির মনে হল, বিচিত্র এক বিস্ফোরণ। কলকাতা, সবরমতী, মহারাষ্ট্র হিমালয়ের পাদপীঠ থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত বিশাল ভারতবর্ষের হৃৎপিণ্ড ওই একটি নামের মধ্যে উথলপাথল হয়ে যাচ্ছে। ওই একটি নাম দুর্গম নদী, বন-পাহাড়-সমতল অতিক্রম করে এই বুনো মানুষগুলির অস্ফুট চেতনায় কি অক্ষয় শিলালিপির মতো আঁকা হল? যেমন করে হোক, এই পাহাড়ী পৃথিবী থেকে, বন্য মানুষের চেতনা থেকে ওই শব্দটাকে চিরকালের জন্য মুছে দিতে হবে। নইলে উপায় নেই, রেহাই নেই। একটা দুর্বল রন্ধ্র পেলে ওই নামটা দুকুল ভাসিয়ে হু-হু–বন্যা নিয়ে আসবে। কোন অতল তলায় তলিয়ে যাবে এই উত্তুঙ্গ নাগাপাহাড়। অন্তত খবরের কাগজ এবং মাধোলালের মতো শয়তানদের মুখে মুখে সেই ভয়াবহ সংবাদই দেশের শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ছে। ম্যাকেঞ্জি ভাবল, আজই একবার পুলিশ সুপার মিস্টর বসওয়েলের সঙ্গে দেখা করতে হবে।
এদিকে সেঙাই বলতে শুরু করেছে, তোরা সায়েব। মাধোলাল বলল, তোদের সবাইকে ওদের দেশ থেকে ভাগিয়ে দেবে। আমাদের রানী গাইডিলিও নাকি তোদের সঙ্গে লড়াই করবে।
আশঙ্কার পাত্রটা এবার কানায় কানায় ভরে উঠেছে। রানী গাইডিলিও! লড়াই! বলে কী সেঙাই!
ব্রেটনব্রুকশায়ারের সেই দুর্দান্ত আউটল এবং আজকের পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি জীবনে যেন প্রথম ভয় পেয়েছে। ঝাপসা গলায় সে বলল, সব মিথ্যে। আমাদের সঙ্গে তো লড়াই নয়; আমরা তোমাদের বন্ধু। ওরা, ওই সমতলের বাসিন্দারা বিদেশি।
