সবুজ ঘাসজমির ওপারে বসে রয়েছে বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি। তার পায়ের কাছে এক দল পোষা কুকুরের মতো ঘন হয়ে বসেছে জনকয়েক পাহাড়ী সর্দার। তাদের সারা দেহে বিচিত্র ধরনের পোশাক আর অলঙ্কারের বাহার। মাঝখানে বসেছে সালুয়ালা গ্রামের বুড়ো সর্দার।
বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি মুঠো মুঠো টাকা সর্দারদের হাতে গুঁজে দিচ্ছে। আর ফিসফিস করে কী যেন বলছে। হয়তো বা যীশু-মেরীর কোনো গূঢ় মন্ত্র। আর পাহাড়ী সর্দারদের মুখে কখনও ভীষণ হাসি, কখনও নিষ্ঠুরতা ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছে।
বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির দৃষ্টি ভয়ানক সজাগ এবং ধূর্ত। সারুয়ামারু আর সেঙাইকে সে ঠিক ঠিক দেখে ফেলল, আরে সেঙাই, এই যে সারুয়ামারু–এখানে এসো।
গুটি গুটি পায়ে ঘাসের জমি পেরিয়ে ম্যাকেঞ্জির কাছে এসে দাঁড়াল দুজনে। সেঙাই-এর কঠোর থাবায় বিরাট বর্শাটা ধরা রয়েছে। দুটো তীক্ষ্ণ, ধারাল এবং নির্মম চোখ মেলে নির্নিমেষে সালয়ালাঙের সর্দারের দিকে তাকিয়ে রয়েছে সেঙাই।
সেঙাই! নামটা শুনে চমকে উঠল সালয়ালাঙের সর্দার। আগে কখনও সে সেঙাইকে দেখেনি। সালুনারুর কথায় সেদিন খাসেম গাছের মগডালে মেহেলীর ছোট্ট ঘরখানায় তাকে পুড়িয়ে এসেছিল। পরে অবশ্য জেনেছিল সেঙাই মরেনি। কোহিমার পাহাড়ে তার জন্য এমন একটা বিপজ্জনক বিস্ময় অপেক্ষা করে ছিল তা কি জানত সে! মুখখানা ভয়ঙ্কর হল তার। প্রখর মুঠিতে বর্শাটা চেপে ধরল।
সেঙাই আর সালুয়ালাঙের সর্দার। দুই প্রতিপক্ষ। তিন পুরুষ ধরে পরস্পরের শত্রু। কোহিমার পাহাড়ে মুখোমুখি হল কেলুরি আর সালুয়ালাঙ। চতুর আর কুটিল হাসিতে পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির মুখখানা ভরে গেল।
ম্যাকেঞ্জি বলল, রাত্তিরে কেমন ঘুমোলে তোমরা?
ভালো, ভালল। খুশির গলায় সারুয়ামারু বলল।
ভুরু কুঁচকে বাঁ চোখটা ছোট করে সেঙাই-এর দিকে তাকাল ম্যকেঞ্জি, মেহেলীকে বিয়ে করতে চাও না তুমি?
হু-হু, চাই তো। মেহেলীকে আমি ছিনিয়ে আনব হুই সালুয়ালাঙ বস্তি থেকে।
কী বললি? খুঁসে উঠল সালুয়ালাঙের সর্দার।
ততক্ষণে বর্শাটাকে বাগিয়ে তাক করেছে সেঙাই। তার দুটো পিঙ্গল চোখে হত্যার প্রতিজ্ঞা জ্বলছে, একেবারে শেষ করে ফেলব তোকে। আহে ভু টেলো!
এই এই, কী হচ্ছে! এটা চার্চ! হাঁ হাঁ করে লাফিয়ে উঠল পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি।
খুনোখুনি হলে চার্চের পবিত্র চত্বরে পাহাড়ী রক্তের কলঙ্ক লাগবে! যেশাসের পুণ্যনাম কলুষিত হবে! সারপ্লিসের আড়ালে ম্যাকেঞ্জির দেহটা কেঁপে উঠল। ব্রেটব্রুকশায়ারের সেই আউটল রক্ত নিয়ে মাতামাতির খেলায় প্রেরণা দিতে পারত। সারপ্লিসের খোলস যেদিন দেহে উঠেছে তখন থেকেই অনেকটা নিরুত্তেজ হয়ে পড়েছে ম্যাকেঞ্জি। এখন তাকে অনেক সংযত থাকতে হয়।
সাঁ করে সেঙাই-এর একটি হাত চেপে ধরে টানতে টানতে তাকে সিজিটোর ঘরে রেখে। এল ম্যাকেঞ্জি। বলল, কোনো চিন্তা নেই। মেহেলীকে তোমার সঙ্গে বিয়ে আমি দেব। তবে একটা কাজ করতে হবে তোমাকে।
কী কাজ?
পরে বলব!
বাইরে বেরিয়ে সালুয়ালাঙের সর্দারের কাছে চলে এল ম্যাকেঞ্জি। তাকে নিয়ে অন্য একটি ঘরে ঢুকল।
ম্যাকেঞ্জি বলল, ভেবো না সর্দার, আমি যখন আছি তখন মেহেলীকে তোমরা পাবেই। আরো অনেক টাকা দেব। যে কাজের কথা বললাম মনে আছে তো?
হু-হু, নিমকহারামি আমরা করি না। আমরা পাহাড়ী মানুষটাকা নিয়েছি, বেইমানি করব না।
এই তো চাই। বস্তিতে গিয়ে যে কথা বলেছি তা চাউর করে দাও।
হু-হু, আমরা এবার যাই। কিন্তু তুই দেখিস ফাদার, হুই শয়তানের বাচ্চা সেঙাইটাকে একেবারে খতম করব। বলতে বলতে বাইরের ঘাসবনে নামল সালুয়ালাঙের সর্দার। সেখান থেকে কোহিমার আঁকাবাঁকা পথে।
পরের দিনও সকাল থেকে শেষ বেলা পর্যন্ত কোহিমার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াল সেঙাই আর সারুয়ামারু। চড়াই উতরাইয়ে দোল খাওয়া পথ। দোকানপসার। সমতলের বাসিন্দাদের বাণিজ্যমেলা। ইম্ফল আর ডিমাপুরের দিকে প্রসারিত পথের রেখা। বিচিত্র সব মানুষ, বিচিত্রতর ভাষার হইচই।
কেলুরি গ্রামের এক পাহাড়ী যৌবন প্রথম শহরে এসে একটার পর একটা বিস্ময়ের মুখোমুখি হয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল। সারুয়ামারু এই শহরে অনেক বার এসেছে। সে সেঙাইকে উদয়াস্ত চারিদিক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাতে লাগল।
.
সেদিন সন্ধ্যার একটু আগেই ঘটনাটা ঘটল।
বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি চার্চের একটা কাজের লোককে সেঙাই আর সারুয়ামারুকে ডেকে আনতে বলল।
কোহিমার আকাশে এখনও খানিকটা আবছা আলো লেগে রয়েছে। সবুজ ঘাসের জমিতে বেতের চেয়ারে জাঁকিয়ে বসে আছে ম্যাকেঞ্জি। দু’পাশে দুটো মণিপুরী পুলিশ। হাতে খাড়া রাইফেলের মাথায় বেয়নেটউদ্ধত হয়ে রয়েছে। বিদেশি চার্চের শান্তি এদেশি মানুষের পাহারায় নির্বিঘ্ন। বেথেলহেমের ধ্রুবতারাটি কোহিমার পাহাড়ে সুরক্ষিত রয়েছে রাইফেলের হিংস্রতায়। যেশাস। মানব-পুত্রের স্বপ্ন কি চরিতার্থ হল এই পাহাড়ী টিলার দেশে, এই বনময় শৈলশিখরে? এই রাইফেলের, এই বেয়নেটের পাহারায়? কে জানে?
ইতিমধ্যে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সেঙাই আর সারুয়ামারু। সারাদিন কোহিমার পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছে দুজনে। তারপর খানিক আগে সিজিটোর ঘরে ফিরে এসেছিল।
ম্যাকেঞ্জির মুখে সস্নেহ হাসি, এই যে সেঙাই, এই যে সারুয়ামারু, এসো, এসো। তারপর শহর কেমন দেখলে সেঙাই?
