সারুয়ামারু বলল, তোরাও তো এসেছিস। তোরাও তো বিদেশি। তোরা আসান্যু।
হায়, রাম রাম–মাপা আধ হাত জিভ কাটল মাধোলাল, আমরা আসা, তা ঠিক কথা। কিন্তু এ দেশটা আমাদের। তোমরা আমরা এক দেশি। আমরা থাকি নিচু জমিতে, তোমরা থাকো পাহাড়ে। দুইয়ে মিলিয়ে গোটা ভারত।
তবে ফাদার যে বলে আসান্যুরা শয়তান, ওরা ভিনদেশি?
সব মিছে। তোমাদের রানী গাইডিলিওকে জিগ্যেস করে দেখো।
কোহিমার আকাশে রাত্রি নামছে। ঝাপসা রঙের কুয়াশা বাতাসে মিশে যাচ্ছে। সামনের পাহাড়চূড়া অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে।
সেঙাই আর সারুয়ামারু উঠে পড়ল। সারুয়ামারু বলল, এখন যাই। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেল। বড় শীত করছে।
গ্যাসবাতি ধরাতে ধরাতে মাধোলাল বলল, তোমরা আছ কোথায়?
ফাদারের কাছে।
ও। বিড়বিড় করে অস্ফুট গলায় কী যে বলল মাধোলাল, বোঝা গেল না। একটু পরেই সে সরব হয়ে উঠল, গান্ধিজির কথা, রানী গাইডিলিওর কথা তোমাদের ফাদারকে বোলো না কিন্তু। আর নিমক দরকার হলে আমাদের দোকান থেকে নিয়ে যেয়ো। অন্য সব দোকান থেকে দরে সুবিধে করে দেব।
আচ্ছা।
কোহিমার পথে পা বাড়িয়ে দিল সেঙাই আর সারুয়ামারু।
চলতে চলতে সারুয়ামারু বলল, মজার গল্প বলে মাথোলাল। গান্ধিজির লড়াই, রানী গাইডিলিও। কী সুন্দর গল্প! ভারি ভালো।
হু-হু– মাথা নাড়ল সেঙাই।
গান্ধিজির যুদ্ধ। রানী গাইডিলিও। সেঙাইর বন্য পাহাড়ী মনে কি পাষাণ-লেখা পড়ল? আঁকা হল দুর্বোধ্য কোনো শিলালিপি?
.
২৭.
পাহাড়ী মনের উত্তেজনা। সে তো ঘাসের ওপর শিশিরকণার পরমায়ু। রাত্রিবেলা মাচানে একটা বুনো মোষের মতো ভোস ভোঁস শব্দ করে ঘুমিয়েছে সারুয়ামারু। মসৃণ ঘুমে সে রাতটা কাবার করে দিয়েছে।
কিন্তু অনেকটা সময় পর্যন্ত ঘুমোতে পারেনি সেই। রাত যখন গভীর আর নিবিড় হয়েছিল, ঠিক সেই সময় ঢেউটিনের চালের ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়েছিল সে। মোষের পিঠের মতো ঘন কালো আকাশ। অসংখ্য মিটমিটে তারা। আঁচড়ের মতো ফুটে বেরিয়েছে আবছা ছায়াপথ।
কাল সন্ধ্যায় মাধোলাল কার সঙ্গে যেন সাহেবদের লড়াইর কথা বলছিল, রানী গাইডিলিওর কথা বলছিল। গাইডিলিও নাকি ডাইনি নয়। অথচ ফাদার বলেছে, সে ডাইনি। গ্রাম থেকে আসার সময় বুড়ো খাপেগা বার বার বলে দিয়েছিল, রানী গাইডিলিওর সঙ্গে দেখা করতে। রানী গাইডিলিও আর ডাইনি গাইডিলিও–এই দুই নামের মধ্যে সেঙাই-এর পাহাড়ী মনটা অনেকক্ষণ দোল খেয়েছে। স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি–গাইডিলিওকে দেখতে যাবে, কি যাবে না।
একটার পর একটা ভাবনার ঢেউ চেতনার ওপর দিয়ে সরে গিয়েছে। কাদের যেন লড়াইয়ের কথা বলেছিল মাধোলাল। বর্শা দিয়ে ফুড়ছে না, সুচেন্যু দিয়ে কোপাচ্ছে না, মার খাচ্ছে অথচ মরছে না। আজব দেশ, সব যেন রূপকথা। কোথায় সেই দেশ, কোথায় সেই অদ্ভুত মানুষেরা? সব যেন মিথ্যে মনে হয়। বিভ্রান্তির মতো লাগে। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না। তাদের এই পাহাড়ী পৃথিবীর বাইরে কোথায় কোন সমতলের দেশ রয়েছে, সেখানে সাহেবদের সঙ্গে লড়াই চলছে, ভাবতেও কেমন লাগে পাহাড়ী জোয়ান সেঙাইর। নাঃ, এই পাহাড়, এই উপত্যকা, এই মালভূমি, এই বন-ঝরনা-জলপ্রপাত আর এই কোহিমা শহরের বাইরে কোথাও কোনো দেশ আছে, কিংবা থাকতে পারে, তা তার ধারণার অতীত। অবিশ্বাসী বুনো মনটা প্রবলভাবে প্রতিবাদ করতে চায়।
একসময় গান্ধিজির যুদ্ধ, রানী গাইডিলিও, বুড়ো মাথোলাল, এই সুন্দর কোহিমা শহরসমস্ত কিছু মন থেকে সরে গেল সেঙাইর। মেহেলীর কথা মনে পড়ল। অনেকদিন আগে এক নিঃশব্দ ঝরনার পাশে তাকে প্রথম দেখেছিল। তারপর সালুয়ালা গ্রামে তাকে শেষবারের মতো দেখে এসেছে। বন্য, আদিম মানুষ। চিন্তাগুলি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ক্রিয়া করে। নিমেষে এক ভাবনা থেকে অন্য ভাবনায় মনটা সরে সরে যায়। সেঙাই ভাবল, মেহেলীকে তার চাই। উন্মাদ ভোগে, তীব্র কামনায় শত্রুপক্ষের মেয়েকে পেতেই হবে। কোহিমা শহরের নিঃসঙ্গ বিছানায় মেহেলীর চিন্তায় বাকি রাতটা উত্তেজিত হয়ে ছিল সেঙাই। প্রায় না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিয়েছে।
কোহিমার পাহাড় তার জন্য এত সব বিচিত্র ভাবনা সাজিয়ে রেখেছিল, তা কি জানত সেঙাই!
.
২৮.
আকাশে শেষ রাত্রির আবছা অন্ধকার লেগে রয়েছে এখনও। একটা উদাত্ত সুর ভেসে এল চার্চের ভজনালয় থেকে। সেই অপূর্ব সুরের মূৰ্ছনা সমস্ত চেতনাটাকে ভরে দিতে লাগল।
পাশের মাচান থেকে সারুয়ামারু বলল, ছোট ফাদার যীশু-মেরীর গান গাইছে।
গানে কী কথা বলছে রে? সেঙাই জিগ্যেস করল।
ওদের কথা বুঝি না।
ছোট পাদ্রী অর্থাৎ পিয়ার্সন। পরম পিতার কাছে রাত-প্রভাতের প্রার্থনা জানাচ্ছে। তার একটি কথারও অর্থ বোঝে না সেঙাই, পরমার্থও তার কাছে দুয়ে। তবু পিয়ার্সনের সুললিত কণ্ঠে এমন একটা পবিত্রতা রয়েছে যাতে তার মন বিবশ হয়ে যাচ্ছে। একটু আগে মেহেলীর কথা ভাবতে ভাবতে সমস্ত স্নায়ুমণ্ডলী উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিল। এখন এই গানের শান্ত মধুর সুরে, বিচিত্র আবেশে সোই-এর অস্ফুট মন ভরে গিয়েছে। মেহেলীর ভাবনা থেকে পিয়ার্সনের এই অদ্ভুত গানটার কত তফাত! এই গানের সঙ্গে মাথোলালের গল্পের একটা আশ্চর্য সঙ্গতি রয়েছে যেন। ঠিক ধরতে পারে না সেঙাই।
একসময় পুবের পাহাড়চূড়া আলো করে সূর্য উঠল। কুয়াশা মুছে গেল। সিজিটোর ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল সেঙাই আর সারুয়ামারু। আর বেরিয়েই এই সুন্দর সকালে মনটা বিষিয়ে গেল সেঙাই-এর।
