বুধোলালই আজকাল দোকানের জিনিসপত্র আমদানি করে–আমিনগাঁ থেকে, করিমগঞ্জ থেকে, তিনসুকিয়া কি হাফলঙ থেকে রেলের ওয়াগনে করে। তারপর ডিমাপুর থেকে লরিতে চাপিয়ে এই শহর কোহিমা। আর বুড়ো ক্ষেত্ৰীলাল যেখানে বসে সন্ত তুলসীদাসের রামায়ণ পাঠ করত, যেখান থেকে একটি ভক্তিন সুরের তরঙ্গে এই পাহাড়ী পৃথিবীকে অমৃতময় করে তুলত, ঠিক সেই মাচানটির ওপর বসে বুড়ো মাধোলাল পাহাড়ী মানুষগুলোর সঙ্গে গল্প করে। আজমীড় কী মাড়োয়ারের সেই দেহাতি গ্রামটির আবছা স্মৃতি, রেলের গল্প, পাণ্ডু-আমিনগাঁ কাটিহারের গল্প, খাসিয়া আর গারো পাহাড়ের গল্প। কলকাতায় সাহেবদের সঙ্গে সেই বাঙালিবাবু সুরেন বানারজি না কার যেন সেই লড়াই-এর ইতিহাস। শিলং-চেরাপুঞ্জিতে পাদ্রী সাহেবদের কীর্তিকথা। আরো যে কত কাহিনী তার লেখাজোখা নেই। তার ষাট বছরের বিরাট অতীত জুড়ে আর দেহের প্রতিটি কুঞ্চনে যে রাশি রাশি গল্প, রাশি রাশি কাহিনি পুঞ্জীভূত হয়ে রয়েছে সেই সব গল্প বলে মাধোলাল।
সামনে চুপচাপ বসে রয়েছে সারুয়ামারু। তার পাশে সেঙাই।
মাথোলাল বলতে লাগল, হায়, রাম রাম। এই পাদ্রীগুলো সব ধরমনাশা। নিমকের বদলা ধরম নিয়ে নেয়–
বলিস কী মাথোলাল! আমাদের ধরম নিচ্ছে হুই ফাদার?
হাঁ হাঁ, এ কথা আবার কাউকে বোলো না। তোমার ঠাকুরদা ছিল আমার আসাহোয়া (বন্ধু)। সে আমার দোকান থেকে নিমক নিত। তারপর আসত তোমার বাবা। তারও পর আসতে তুমি। তুমি তো এখন হুই পাদ্রীদের পাল্লায় গিয়ে পড়েছ। তোমাদের তিন পুরুষের সঙ্গে আমাদের কারবার। তাই সত্যি কথা বললুম। সাহেবদের কাছে আবার এসব বোলো না। তা হলে আমার দোকান তুলে দেবে।
এখানকার ভাষা কী চমৎকার আয়ত্ত করেছে মাথোলাল! বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেঙাই।
না না, বলব না। আগে তো ঠিক বুঝিনি। আনিজার নামে শুয়োর বলি দিতে ফাদার বারণ করে। একেবারে বর্শা দিয়ে ফুড়ে ফেলব না! সহজ মানুষ সারুয়ামারু খুঁসে উঠল।
ফিসফিস গলায় মাধোলাল বলল, তোমাদের ওই যে রানী গাইডিলিও আছে তার কাছে জিগ্যেস কোরো। হক কথা বলবে।
না, ওর কাছে যাব না। ও তো ডাইনি। একটা সন্ত্রস্ত ছায়া এসে পড়ল সেঙাই-এর মুখেচোখে। সারুয়ামারুও চকিত হয়ে উঠেছে।
ডাইনি! কে? রানী গাইডিলিও? বিস্ময়ে গলাটা চৌচির হয়ে গেল মাথোলালের, কে বললে এ কথা?
ফাদার বলেছে।
মিছে কথা, ষোল আনা মিছে। এক আজব কাহিনির ওপর থেকে যবনিকা তুলল বুড়ো মাথোলাল, জানো সারুয়ামারু, আমাদের দেশে এক মহারাজ আছেন। তার নাম হল গান্ধিজি। এই সায়েবদের সঙ্গে তার লড়াই বেধেছে। আমার ছেলে বুধোলাল দু’দিন আগে কলকাতা থেকে ফিরেছে। সে সেই লড়াই দেখেছে।
সেঙাই বলল, এই সাহেবেরা কোত্থেকে এল?
ভিনদেশ থেকে। সাত সমুদ্র তেরো নদী ডিঙিয়ে। অনেক, অনেক দূরে সে দেশ। কোহিমা পাহাড় থেকে এক অনির্দেশ্য দিগন্তের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিল মাথোলাল, আমরা তো আসান্যু (সমতলের লোক)। আমাদের দেশ থেকেও অনেক দূরে সায়েবদের দেশ।
সে দেশে তুই গেছিস?
না।
আচমকা সারুয়ামারু বলল, হুই যে বললি লড়াই বেধেছে তা বর্শা দিয়ে, সুচেন্যু দিয়ে, তীর-ধনুক দিয়ে মানুষ খুঁড়ছে তো? মাথা কেটে মোরাঙে ঝোলাচ্ছে? বেশ মজা কিন্তু, আমাদের পাহাড়ে অমন লড়াই অনেকদিন বাধেনি।
তেমন লড়াই নয়। গান্ধিজির লোকেরা সায়েবদের মারে না। সায়েবরাই তাদের মারে। এ দেশ থেকে সায়েবদের ভাগতে বলেছেন গান্ধিজি।
এ কেমন লড়াই! মার খাবে, অথচ মারবে না! তাই কখনও হয়? আমাদের পাহাড়ে লড়াই হলে সায়েবদের ছুঁড়ে ফেলতুম। উত্তেজনায় ঝকমক করছে সেঙাইর চোখ দুটো। পেশীগুলো ফুলে ফুলে উঠছে।
এ লড়াই তোমরা বুঝবে না। এ বড় মজার লড়াই। আমার ছেলেটা বলল, গান্ধিজির লোকেরা মার খেয়ে খেয়ে জিতে যাচ্ছে। একটু চুপচাপ। তারপর আবার শুরু করল মাধোলাল, ওই দেখ, খালি বকেই চলেছি। এর কথা তো কিছু বললে না সারুয়ামারু। এ কে? সেঙাইর দিকে তাকাল মাধোলাল।
এ হল সেঙাই। সিজিটোর ছেলে।
ও, রাম রাম। তারপর শোন, আমাদের দেশে যেমন গান্ধিজি, তোমাদের এই পাহাড়ে তেমনই হল রানী গাইডিলিও। সাহেবদের সেও দেখতে পারে না। তার কথা শুনলে বুঝবে। এই কোহিমাতেই আছে রানী গাইডিলিও। অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল বুড়ো মাথোলাল।
সেঙাই সারুয়ামারুদের প্রত্যক্ষ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ, সচেতন বোধ আর অনুভূতি এবং অস্ফুট ধারণার বাইরে বিস্ময়কর অনেক কিছু আছে। তার খবর দিয়েছে বুড়ো মাথোলাল।
গান্ধিজির সঙ্গে সাহেবদের লড়াই, রানী গাইডিলিও–এই অদ্ভুত নামগুলি, মাথোলালের অপরূপ সব গল্প তাদের অস্পষ্ট বন্য চেতনাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ী মনে দোলা লেগেছে।
সেঙাই শুধলো, তোদের দেশে সাহেবদের সঙ্গে লড়াইটা বাধল কেন? কী হয়েছিল? ঘরের বউ ছিনিয়ে নিয়েছিল নাকি?–এরা বিদেশি। আমাদের দেশ এসে আমাদের মারবে, আমাদের খাবার কেড়ে নেবে। কতকাল সইব? এই ধর তোমাদের বস্তি, সেখানে কেউ যদি এসে সর্দার হতে চায়, তোমাদের মারতে চায়, তাহলে সইবে?
না, না। একেবারে খতম করে ফেলব। গর্জে উঠল সেঙাই।
সায়েবরা এসেছে বিদেশ থেকে। এসেছিস যখন থাক, তা নয়, সর্দারি করতে শুরু করল। এই দেখ না তোমাদের পাহাড়েও এসেছে। সর্দারি করছে।
