কে? ও মাধোলাল মাড়োয়ারি। চল, চল সেঙাই–সারুয়ামারু সেঙাই-এর একটা হাত চেপে ধরল। পাথর কাটা পথ থেকে নিচে নেমে দুজনে মাধোলালের দোকানের দিকে এগুতে শুরু করল।
ছোট্ট শহর এই কোহিমা। নাগা পাহাড়ের কেন্দ্রবিন্দু। সমতল থেকে বাণিজ্যের পসরা সাজিয়ে এসে বসেছে অসমীয়া, মাড়োয়ারি। এসেছে গুজরাটি আর ভুটিয়া। রকমারি সম্ভার, মনোহারি সামগ্রীতে নানা রঙের বাহার। আশেপাশের পাহাড় থেকে শুকনো মরিচ, আনারস আর পাহাড়ী আপেল নিয়ে খোলা আকাশের নিচে অস্থায়ী বাজার বসিয়েছে কুকীরা। এসেছে মিকিরেরা। মণিপুরীরাও এই বাণিজ্যমেলা থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখেনি।
কাঁচের কঙ্কণ, লবণ, পাটনাই চালের বস্তা নিয়ে রেল স্টেশন মণিপুর রোড থেকে এই কোহিমার বাজারে আসে একটার পর একটা লরি। বাঘের ছাল, হরিণের শিঙ, কস্তুরী, ওক আর পাইন কাঠ, কমলা আর রাশি রাশি বনজ ফল ইত্যাদি নানা পণ্যভারে বোঝাই হয়ে আবার রেল স্টেশনে ফিরে যায়।
দোকানপসারের জটলা পেছনে রেখে মাথোলালের দোকানে এসে বসল সেঙাই আর সারুয়ামারু।
মাধোলাল বলল, কি সারুয়ামারু, তুমি তো আর আজকাল আসো না নিমক নিতে। তোমার বাবা, তোমার ঠাকুরদা, সবাই আমার খদ্দের ছিল। আজকাল এত দোকান হয়েছে। আসানুরা (সমতলের লোকেরা) এসে কোহিমার বাজার ঘেঁকে ধরেছে। কিন্তু আমি যখন এখানে আসি তখন আসাদের একটা দোকানও ছিল না। তোমাদের গোসা হয়েছে নাকি আমার ওপর?
না, না–সারুয়ামারু মাথা ঝাঁকাল।
তবে আসো না কেন? অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে সামনে এসে দাঁড়াল মাধোলাল।
আজকাল হুই ফাদার নিমক দেয়, তাই আর আসি না।
আরে রাম রাম। তাই নাকি? তা নিমকের বদলা কী দাও? আগ্রহে বুড়ো মাধোলাল আরো খানিকটা এগিয়ে এল।
কিছু না, খালি ক্রস আঁকি আর যীশু-মেরীর নাম করি। নির্বিকারভাবে বলে গেল সারুয়ামারু, হুই ফাদার বলেছে, ক্রস আঁকলে আর যীশু-মেরীর নাম করলে কিছুই দিতে হবে না।
হায় রাম–প্রায় আর্তনাদ করে উঠল মাথোলাল, ওই কাম করলে তোমাদের আনিজার গোসা হবে। পাদ্রীসাহেবরা ভারি শয়তান আছে, তোমাদের ধরম নষ্ট করে দিচ্ছে। খাসিয়া। পাহাড়ে যখন ছিলাম তখন দেখেছি, খাসিয়াদের সব খেস্টান করে দিল। এবার তোমাদের। ধরেছে। হায় রাম।
আজমীড় কি মাড়োয়ারের কোনো এক দেহাতে মাথোলালের দেশ, তা আজ আর বিশেষ মনে পড়ে না তার। সূর্য ওঠার আগে আকাশের চক্ররেখায় যেমন এক আস্তর ছায়া-ছায়া রং লেগে থাকে, ঠিক তেমনই একটা অস্পষ্ট স্মৃতি মনের মধ্যে বিবর্ণ হয়ে রয়েছে। জনারের খেত, কপিরং রুক্ষ মাটি, মহিষ চারণের জমি, এছাড়া আর কিছু নয়। দশ বছর বয়সে বাপ ক্ষেত্রীলালের সঙ্গে এই উত্তর-পূর্ব ভারতে এসেছে সে। রেলের চাকার নিচে অদৃশ্য হয়েছে বিহার, তারপর সুশ্যাম বাংলা মুল্লুক, তারও পর আসামের নিঃসীম সমতল পেরিয়ে খাসিয়া পাহাড়। নঙ পো, শিলং, চেরাপুঞ্জি। তারও পর হাফলঙে কিছুদিন থেকে এই কোহিমা। তাও আজ চল্লিশ বছর পার হতে চলল।
অনেক কিছু দেখেছে মাধোলাল। এই চল্লিশ বছরের স্মৃতিতে জমা হয়ে রয়েছে অনেক ঘটনা, অজস্র অভিজ্ঞতা। জীবনের এই চার দশকের প্রতিটি প্রহরের পাতায় পাতায় কত ইতিহাস লেখা রয়েছে মাধোলালের, তার শুকনো হাড়ে হাড়ে কত পাষাণলিপি আঁকা হয়েছে তার হিসেব নেই, সীমা-পরিসীমা নেই। বাপ ক্ষেত্ৰীলাল কোহিমা পাহাড়ে এই তেল-লবণ আলুর দোকান খুলেছিল। বুড়া বাঁশের মাচানের ওপর বসে দুলে দুলে সন্ত তুলসীদাসের রামায়ণ পড়ত। সেও আজ কতদিন পার হয়ে গেল। বাপ মরল একদিন। বছর দুয়েক পর কলকাতা শহর থেকে তাদের মুল্লুকের দেহাতি কিশোরী ফুলপিয়ারিকে শাদি করে আনল মাথোলাল। সেবার.কী হুজুগ আজীব শহর কলকাতায়। মিছিল, সভা, বক্তৃতা। কে এক সুরেন বানারজি না কী যেন, নামটা ঠিক মনে পড়ছে না, মুখে কাঁচা-পাকা দাড়ির জঙ্গল, বাঙালিবাবুর কালিজার জোর আছে, তাগদ আছে রক্তের। তাকে নিয়ে কী মাতামাতি! একটু একটু শুনেছিল মাধালাল, তার চেয়েও কম বুঝেছিল। বাঙালিবাবুরা নাকি সাহেবদের সঙ্গে লড়াই শুরু করেছে। পঁচিশ তিরিশ বছর আগের সেসব ঘটনা মাথোলালের স্মৃতিতে ইতিহাস হয়ে রয়েছে।
শাদি করার পরের বছর পাণ্ডুতে বাড়ি তুলল মাধোলাল। শরমের কথা, তবু সত্যি বৈকি, শাদির প্রথম বছরেই বাচ্চা হল। সেই ছেলে বুধোলাল এখন পঁচিশ বছরের তাজা জোয়ান। বুনো ঘোড়ার মতো উদ্দাম। তার একটা শাদি দিতে হবে। অবশ্য শাদি একরকম ঠিকই হয়ে রয়েছে। রঙ্গিয়ার মেয়ে। নাম বিরজা। অসমিয়া মেয়ে পুত্রবধূ হবে। তাতে আপত্তি নেই মাধোলালের। এত বছর এই উত্তর-পূর্ব ভারতে রয়েছে মাধোলাল। নানা দিক থেকে আত্মীয়তার শিকড়ে বাকড়ে তাকে জড়িয়ে ধরেছে এই আসাম, এই খাসিয়া পাহাড়, এই নাগা মুল্লুক।
আজ দশ বছর ধরে কোহিমা পাহাড়ে স্থির হয়ে বসেছে মাধোলাল। মাঝে মাঝে মণিপুর রোড স্টেশন থেকে রেলে চড়ে পাণ্ডুর বাড়িতে যায়। দু-চার দিন কাটিয়ে আবার ফিরে আসে। কোহিমার দোকানে। সমতল থেকে অনেক উঁচুতে এই পাহাড়ী শহর তাকে শত বাহু দিয়ে যেন বন্দি করে রেখেছে। বুধোলাল অনুযোগ দেয়। এই বুড়ো বয়সে এবার পাণ্ডুর বাড়িতে গিয়ে থাকলেই হয়। যে বয়সের যে ধরম। সামনেই ক্যামাখ্যা মন্দির। সেখানে গিয়ে পরকালের সুরাহা করলেও তো পারে বুড়ো মাধোলাল। আর কটা দিনই বা বাকি আছে পরমায়ুর? পরপারে যাবার সময় হল বলে। ডাক আসতে কতক্ষণ। সব বোঝে মাধোলাল। কিন্তু কোহিমা। যেন পাহাড়ী ডাইনির মতো তাকে কুহকিত করেছে। বিচিত্র তার ইন্দ্রজাল, তার বাহুর বেষ্টনী থেকে মুক্তির বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই।
