খাপেগা বলেছিল, লাফিয়ে উঠলাম আমি। সারা কুরগুলাঙ বস্তির মধ্যে সবচেয়ে তাগড়া জোয়ান ছিলাম আমিই। সে সব দিন আর নেই। মানুষের মাথা কেটে এই মোরাঙের দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখাই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় খেলা। সে সব খেলার রেওয়াজ আজকাল উঠে গিয়েছে। বড় আপশোশ হয়। জীর্ণ বুকটা কাঁপিয়ে কাঁপয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসেছিল প্রাচীন মানুষ খাপেগার, যাক সে কথা। আমার নাম খাপেগা। জানিস তোরা আমার নামের মানে?
সেঙাই বলেছিল, জানি। খাপেগা মানে যে মানুষ দুটো শত্রুর মাথা কেটেছে।
ঠিক তাই। যেতে দে ওকথা। তারপর কী হল বলি। খাপেগা আবার শুরু করেছিল, তখন আমাদের জোয়ান রক্ত। চারদিকে একবার তাকালাম। জেভেথাঙের ফাটা মাথার চারপাশে উবু হয়ে বসেছে নিয়োনো, নড্রিলো, গ্যিহেনি, এমনি অনেকে। আমি বললাম, ঠিক আছে। জেভেথাঙের ফাটা মাথার বদলা পোকরিদের তিনটে মাথা চাই।
কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপরেই মোরাঙ-ফাটানো চিৎকার উঠেছিল। নড্রিলোরা একসঙ্গে গলা মিলিয়েছে, হু—উ—উ—উ–য়া–য়া–আ–আ–পোকরিদের তিন মাথা চাই।
সে চিৎকার টিজু নদীর নীল ধারার ওপারে বনময় পাহাড়ে ধেয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু আশ্চর্য! শান্ত গলায় জেভেগাঙ বলেছিল, তিনটে মাথা নিশ্চয়ই নেব। কিন্তু তার আগে নিতিৎসুকে চাই।
খাপেগা বলেছিল, কী সর্বনাশ, হুই শয়তানীকে নিয়ে কী করবি?
বিয়ে করব।
মোরাঙের নিচে পাহাড়ী পৃথিবীটা যেন আর একবার দুলে উঠেছিল।
আবার খানিকক্ষণ চুপচাপ। তারপরেই সকলের টুকরো টুকরো কথা মিলে একটা জটিল স্বরজাল বোনা হয়েছিল, হু—উ—উ—উ—য়া—আ–আ-হু-হু; হুই শয়তানীকে বর্শা দিয়ে কুঁড়ে নিয়ে আসব। বিয়ে হবে তারপর।
তীব্র, চিৎকার, হু-হু, একটা পেত্নী, নিতিৎসুটা একটা পেত্নী।
নড্রিলো বলেছিল, তোর বাপ এই বস্তির সর্দার। তাকে একবার জানানো দরকার। কী বলিস জেভেথাঙ?
হু-হু। গোল করে কামানো মাথা নেড়ে নেড়ে সায় দিয়েছিল সকলে।
পূর্ববর্তী পরের দিনের সকাল। অগুনতি পাহাড়ের ওধারে, বর্মার চেইনেরও ওপার থেকে সূর্য উঠেছে। তার সোনালি রোদ ঢলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে পাহাড়ী উপত্যকায়।
খাপেগা আর জেভেখাঙ মোরাঙ থেকে বেরিয়ে চলে এসেছিল টিজু নদীর পাড়ে। সরাসরি জেভেখাঙ তাকিয়েছিল খাপেগার দিকে, কি রে, আমি যাব নিতিৎসুদের বস্তিতে?
তুই একটু দাঁড়া। আমি নিতিৎসুর শোওয়ার ঘরখানা দেখে আসি। রাত্তিরে তুই সেই ঘরে যাবি। যদি রাজি না হয়, বর্শা দিয়ে গেঁথে নিয়ে আসব। টিজু নদীতে চমক দিয়ে তীক্ষ্ণ শব্দ করে হেসে উঠেছিল খাপেগা, কি রে, সাহসে কুলোবে তো? না, আমাকেও তোর সঙ্গে নিতিৎসুর ঘরে যেতে হবে রাত্তিরে? আমি গেলে কিন্তু বখরা দিতে হবে।
থাম থাম। মেলা বকর বকর করতে হবে না। যাবি আর আসবি।
একটু পরেই ফিরে এসেছিল খাপেগা। মুখখানা তার ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে। চোখের কোণে ঝিলিক মেরে যাচ্ছে একটা অনিবার্য পূর্বাভাস, এক সর্বনাশা ইঙ্গিত।
একটা খাসেম গাছের আড়াল থেকে রুদ্ধশ্বাসে দৌড়ে এসেছিল জেভেখাঙ, কি রে, কী ব্যাপার? দেখে এসেছিস?
হু। মাথা নেড়েছিল খাপেগা, খুব সাবধান। ওপারের মোরাঙে জোয়ানরা বর্শায় শান দিচ্ছে। আমাকে দেখে কটমট করে তাকাল।
আচ্ছা–
অসহ্য উত্তেজনায় কেঁপে কেঁপে উঠেছিল খাপেগা, মাগী একটা টেফঙের বাচ্চা, একটা পাহাড়ী পেত্নী। সব বলে দিয়েছে নিতিৎসু। আগে থেকে ওরা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মোরাঙের মান রাখতে হবে। নদীর ওপার থেকে মাথা আমাদের চাই-ই। আর আজ রাত্তিরেই নিতিৎসুর শোওয়ার ঘরে তোকে যেতে হবে।
যাব। শরীরের স্নায়ুগুলো ধনুকের ছিলার মতো টান টান হয়ে গিয়েছিল জেভেথাঙের। তীক্ষ্ণ গলায় সে বলেছিল, হু-হু, এপারের মান রাখতেই হবে।
বুড়ো খাপেগা একমুঠো কাঁচা তামাকপাতা মুখে পুরে, খকখক কেশে আবার শুরু করেছিল, এর আগেই জেভেখাঙ বিয়ে করেছে। একটা ছেলে হয়েছে। সেই ছেলেই সেঙাইর বাপ। কিন্তু নিতিৎসুকে দেখে মজে গিয়েছিল জেভেখাঙ। তাই এই বিপত্তি। জানিস তো, পাহাড়ী মানুষ আমরা। হাতের মুঠোয় লম্বা বর্শাটা যার ধরা রয়েছে শক্ত করে, এই পাহাড় আর এই জোয়ান মেয়েমানুষের দুনিয়াদারি তারই। যাক, সেকথা এখন নয়। আসল গল্প শোন–
দুপুরের দিকে নড্রিলো গিয়েছিল জেভেথাঙের বাপের কাছে। তারপর রসিয়ে রসিয়ে নিতিৎসুজেভেথাঙের কাহিনিটা বলে তার মুখের দিকে তাকিয়েছিল, এবার তুই কী করতে বলিস সর্দার?
ভারি তরিবতের লোক জেভেথাঙের বাপ। একটা হুজুগ পেলে আর রক্ষা নেই। বলেছিল, ঠিক আছে, হুই মেয়েই চাই। আর একটা ছেলের বউ আসবে ঘরে। এ বেলাই আমি মেয়ের পণ পাঠিয়ে দিচ্ছি। বিকেলের দিকে জেভেথাঙের পিসি বউ-পণ দেবার জন্যে একশোটা বর্শা, পিতল আর কড়ির শৌখিন গয়না, কোহিমা থেকে কেনা এণ্ডি কাপড় নিয়ে টিজু নদীর ওপারে চলে গিয়েছিল। সঙ্গে চলনদার গেল নড্রিলো আর গ্যিহেনি। জোহেরি আর পোকরি বংশের মধ্যে একটা মনোরম সেতুযযাগের প্রস্তুতি। কিন্তু সন্ধ্যার একটু আগে, বেলাশেষের আকাশ থেকে যখন রাশি রাশি সোনালি কুহক ছড়িয়ে পড়েছে পাহাড়ী উপত্যকায়, ঠিক সেই সময় ফিরে এল জেভেথাঙের পিসি। নড্রিলো আর গ্যিহেনির কাছ থেকে কন্যাপণের বর্শা আর শৌখিন গয়না সব ছিনিয়ে রেখে দিয়েছে টিজু নদীর ওপারের মানুষগুলো। আর নিতিৎসুর জেঠা শাসিয়ে দিয়েছে, এপারের লোক ওপারে গেলে মুণ্ড নিয়ে ফিরে আসতে হবে না। ধারাল নখের তর্জনীটা তুলে সে হিসহিস করে উঠেছিল, খুব সাবধান, নিতিৎসুর সঙ্গে তোদের জেভেথাঙ কথা বলেছে, এই বর্শা আর কাপড়-গয়না রেখে তার দাম নিলাম রামখোর বাচ্চারা। এদিকে আর আসিস না জানের মায়া থাকলে।
