এবার সরাসরি পাহাড়ী মানুষগুলোর দিকে তাকাল ম্যাকেঞ্জি, একটা কাজ করতে হবে তোমাদের, বুঝলে সর্দারেরা। যত টাকা চাও, যত নিমক চাও, দেব। গাইডিলিওর নাম শুনেছ তো?
হু-হু–পাহাড়ী মানুষগুলো মাথা নেড়ে নেড়ে সায় দিল।
ওই গাইডিলিও একটা ডাইনি। তোমাদের বস্তিতে বস্তিতে এই কথাটা রটিয়ে দিতে হবে। যত টাকা চাও, দেব। আরো নিবিড় হয়ে বসল ম্যাকেঞ্জি।
কে ডাইনি? হুই গাইডিলিও? চোঙলি সর্দার সিনামঙ্কো হুঙ্কার দিয়ে উঠল, একথা বললে একেবারে বর্শা দিয়ে ফুঁড়ে ফেলব। আমার ছেলেটাকে অঙ্গামীরা তো সুচেন্যু দিয়ে কুপিয়ে গেল। তামুন্যু বলল, ও আর বাঁচবে না। হুই গাইডিলিওর ছোঁয়ায় সে বেঁচে উঠল। তাকে ডাইনি বলছিস!
হু-হু–আও আর সাঙটাম সর্দারেরা উঠে দাঁড়াল, আমাদের বস্তির অনেক লোক ভালো হয়ে গেছে রানীর ছোঁয়ায়। তাকে ডাইনি বলতে বলছিস!
হো-ও-ও-ও-য়া-য়া–
চিৎকার করে উঠে দাঁড়াল লোটা, কোনিয়াক আর রেঙমা সর্দারেরা, চাই না, চাই না তোর টাকা, তোর নিমক। যে আমাদের বাঁচাল তাকে ডাইনি বলব না।
যীশুর নাম বলব না। মেরীর নাম বলব না।
আর ক্রস আঁকব না।
হো-ও-ও-ও-য়া-য়া–
শোরগোল উদ্দাম হয়ে উঠল, রানী গাইডিলিওর সঙ্গে বেইমানি করতে বলছিস! তুই তো শয়তান আছিস।
তোর কাছে আর আসব না।
নিরুপায় আক্রোশে চোখদুটো ধকধক জ্বলছে ম্যাকেঞ্জির। সে কী জানত, এই হিদেন পাহাড়ীগুলোর মনে যীশু-মেরীর নামে যা গড়ে তুলেছিল, তার নিচে কঠিন ভিত্তি নেই! আবার তার দৃষ্টিটা চার্চের জানালায় একটা মুখের ওপর এসে পড়ল। পিয়ার্সনের মুখে সেই সূক্ষ্ম পর্দার মতো একটি বিদ্রপের হাসিই কি আটকে রয়েছে? সারা দেহের শিরায় শিরায় ব্রেটনব্রুকশায়ারের অতীত জীবন যেন চমক দিয়ে উঠল ম্যাকেঞ্জির। খ্যাপা একটা নেকড়ের মতো গর্জন করে উঠতে যাচ্ছিল ম্যাকেঞ্জি, তার আগেই ঘটে গেল ঘটনাটা। লোহার গেটে কাঁচ করে শব্দ হল।
হো-ও-ও-ও-য়া-য়া-–
চিৎকার করতে করতে কোহিমার পথে নেমে গেল পাহাড়ী সর্দারেরা।
সমস্ত মনটা যেন ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে ম্যাকেঞ্জির। আগ্নেয় চোখের মণিদুটো যেন কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। কিছুই শুনছে না ম্যাকেঞ্জি। সব ঝাপসা হয়ে গিয়েছে। একটা নিরাকার অন্ধকারে তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে তার চেতনাটা। জীবনে কোনোদিন এমন অসহায় মনে হয়নি নিজেকে।
একসময় পায়ের কাছ থেকে কয়েকটা গলা বুদ্বুদের মতো ফুটে বেরুল। তাদের মধ্যে কুকী সর্দার আছে, মিজো দলপতি আছে, আর রয়েছে সালুয়া গ্রামের বুড়ো সর্দার। তিনটে পাহাড়ী মানুষ সাপের মতো ক্রুর চোখ মেলে অনুগত কুকুরের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে আছে যেন। ফাদার, আমরা তোর নিমক খেয়েছি। ওদের মতো নিমকহারামি করব না। গাইডিলিওকে ডাইনি বলে আমাদের নিজেদের বস্তিতে আর চারপাশের বস্তিগুলোতে রটিয়ে দেব। তবে অনেক টাকা আর নিমক দিতে হবে।
দেব, নিশ্চয়ই দেব–একটা অবলম্বন পেয়েছে ম্যাকেঞ্জি, একটা আশ্রয়। এই আশ্রয়ের ওপর দাঁড়িয়ে সে ভেলকি দেখিয়ে ছাড়বে, তোমরা যা চাও, তাই দেব। সব পাবে।
আচমকা সালুয়ালা গ্রামের সর্দার বলল, ফাদার, আমাদের বস্তির মেহেলীকে কেরি বস্তির লোকেরা আটক করে রেখেছে। তাকে ফিরে পেতে হবে। হুই বস্তির সেঙাই ওকে বিয়ে করতে চায়। ইদিকে নানকোয়া বস্তি থেকে মেহেলীর জন্য টেনেন্যু মিঙ্গেলু (বউপণ) দিয়েছে। কেলুরি বস্তির লোকেরা আমাদের শত্রুর।
ঠিক আছে। চারিদিকে একবার দ্রুত দেখে নিল ম্যাকেঞ্জি। গেল কোথায় সেঙাই আর সারুয়ামারু? এই তো এখানেই ছিল একটু আগে। তবে কি অন্য পাহাড়ী সর্দারদের সঙ্গে তারাও চার্চের সীমানা পেরিয়ে চলে গিয়েছে? কুটিল একটা সন্দেহে মনটা কালো হয়ে গেল ম্যাকেঞ্জির। দাঁতে দাঁত ঘষে হুমকে উঠল সে, ঠিক আছে। মেহেলীকে তোমাদের বস্তিতে ফিরিয়ে আনব। দরকার হলে কোহিমা শহরের সব বন্দুক নিয়ে কেলুরি বস্তি মাটিতে মিশিয়ে দেব।
সালুয়ালা গ্রামের বুড়ো সর্দারের চোখদুটো উল্লাসে হিংস্রভাবে জ্বলতে লাগল।
.
২৬.
কোহিমা। সমতল থেকে অনেক, অনেক উঁচুতে পাহাড়ী শহর। পাথরের ভাঁজে ভাঁজে, চড়াই-উতরাই-এর ফাঁকে ফাঁকে টালি আর ঢেউটিনের বাড়ি। ময়াল সাপের মতো এঁকেবেঁকে পথের রেখা উঠে গিয়েছে, তার পরেই নিশ্চল ঢেউ-এর মতো নিচের দিকে দোল খেয়ে নেমে এসেছে।
পাথর কাটা আঁকাবাঁকা পথ। পাইন আর ওক বনের আড়ালে আড়ালে, কালো পাথরের টিলায় টিলায় ছোট ছোট বাড়ি দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছে সেঙাই আর সারুয়ামারু। সেঙাই-এর দুচোখে মুগ্ধ বিস্ময়। তার অস্ফুট মন এই কোহিমা শহরটাকে গোগ্রাসে গিলছে। যেন।
একসময় ডিমাপুর যাওয়ার পথটার কাছে এসে দাঁড়াল দুজনে। জায়গাটা মোটামুটি সমতল। সামনের দিকে বনময় চড়াই পাহাড়ের দিকে উঠে গিয়েছে। এপাশে ঠাসবুনন দোকানপসার। ঢেউটিনের চাল, খাটসঙ কাঠের দেওয়াল, নিচে ওক কাঠের পাটাতন।
সারুয়ামারু বলল, ইস, অনেক দোকান বেড়ে গেছে। আগে তো এত ছিল না। আসান্যুরা (সমতলের লোকেরা) সব ঋক বেধে আসছে রে সেঙাই। কোহিমা শহর একবারে ছেয়ে ফেলেছে। দেখছিস?
হু-হু–
আরে সারুয়ামারু যে, এদিকে এসো। এসো আসাহোয়া (বন্ধু)। সামনের একটা দোকান থেকে সাদর ডাক ভেসে এল।
