সাঁ করে সারুয়ামারুর পেছনে এসে দাঁড়াল সেঙাই।
সারুয়ামারু বলল, কি রে সেঙাই? কী হল?
হুই দ্যাখ, সালুয়ালাঙ বস্তির সদ্দার এসেছে। তুই দাঁড়া, আমি বাপের ঘর থেকে বর্শাটা নিয়ে আসি।
কেন?
কেন আবার, যদি একটা লড়াই বেধে যায়?
আরে না, না। ফাদার রয়েছে। এখানে লড়াই চলবে না। তা হলে হুই আসান্যুরা (সমতলের মানুষ) বন্দুক হাঁকড়ে মেরে ফেলবে।
ঘাসের জমির মাঝখানে পাহাড়ী মানুষগুলোর কাছে এসে দাঁড়িয়েছে ম্যাকেঞ্জি। মধুর হাসিতে মুখখানা ভরে গিয়েছে তার। ম্যাকেঞ্জির হাসির পেছনে অনেক সাধনা আছে। সারা মুখে যে-কোনো সময় যে-কোনো ভঙ্গির হাসি সে অবলীলায় ফোঁটাতে পারে। সারপ্লিসটা গোছগাছ করতে করতে ম্যাকেঞ্জি বলল, এই যে সর্দারেরা, তোমরা সব এসেছ। ভালোই হল, নইলে খবর পাঠাতে হত। তোমাদের সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে।
হু-হু। মাথা ঝাঁকিয়ে, মোষের শিঙের মুকুট দুলিয়ে সায় দিল পাহাড়ী সর্দারেরা, কী কথা বলবি ফাদার?
ওপাশে এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে সেঙাই আর সারুয়ামারু। সারুয়ামারু বলল, পাহাড়ী বস্তি থেকে সদ্দারেরা এসেছে। ফাদার ওদের সঙ্গে এখন কথা বলবে। চল, আমরা ভাগি। শহর। দেখে, ভূষণ ফুকন আর মাধোলাল মাড়োয়ারির দোকান দেখে, রাস্তাঘাট বাজার দেখে, ফিরব।
হু-হু, তাই চল—
সকলের আগোচরে লোহার গেটটা পেরিয়ে কোহিমার পথে এসে নামল সেঙাই আর সারুয়ামারু।
আর পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি পাহাড়ী মানুষগুলোর জটলার মাঝখানে বসে পড়ল, একান্ত অন্তরঙ্গ হয়ে।
সর্দারেরা তারস্বরে হল্লা করেছে, ফাদার, আমার বস্তিতে সকলে যীশু-মেরী করে আর কর (স) আঁকে।
আমার বস্তিতেও।
আমার বস্তিতেও।
হল্লাটা একটু একটু করে তুমুল হয়ে উঠতে লাগল।
গুড, ভেরি গুড–প্রসন্নতার একটি চিকন আভা ঝলমল করছে ম্যাকেঞ্জির মুখেচোখে, খুব খুশি হলাম।
একটু আগে সারুয়ামারুর মুরগি বলির কথা শুনে মেজাজটা যে পরিমাণ খিঁচড়ে গিয়েছিল, এই মুহূর্তে এতগুলি গ্রামের এতগুলি পাহাড়ী সর্দারের গলায় যীশু-মেরীর নাম শুনতে শুনতে তার একশো গুণ বেশি আত্মপ্রসাদ অনুভব করল ম্যাকেঞ্জি। তবে তার প্রিচিঙ একেবারে অসফল নয়, ব্যর্থ হয়ে যায় নি তার মিশনারি জীবনের কঠিন শপথ। পাহাড়ী প্রাণের শিলাফলকে যীশু-মেরীর যে নাম বার বার অবিরাম প্রেরণায় লিখতে চেয়েছে ম্যাকেঞ্জি, আজ যেন তার প্রথম সুস্পষ্ট হরফ দেখতে পেল সে। দেখে মুগ্ধ হল। সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলির ওপর একটা সুখের শিহরন খেলে গেল প্রৌঢ় ম্যাকেঞ্জির।
এবার আশ্চর্য শান্ত এবং সস্নেহ গলায় ম্যাকেঞ্জি বলল, তোমাদের নিমকের দরকার তো?
হু-হু, সেই জন্যেই তো এলুম ফাদার।
আচ্ছা, আচ্ছা–এবার অনেক নিমক দেব। টাকাও দেব। কিন্তু একটা কাজ করতে হবে তোমাদের।
হো-ও–ও–ও-য়া-আ-আ–ফাদার নিমক দেবে, টাকা দেবে।
সমতল থেকে অনেক, অনেক উঁচুতে কোহিমার এই পাহাড়চূড়ায় একটা উল্লসিত শোরগোল ঝড়ের মতো ভেঙে পড়ল। সে চিৎকারে আকাশের কোনো নিঃসীম শূন্যে বেথেলহেমের একটি উজ্জ্বল ধ্রুবতারা হয়তো বা চমকে উঠল। ঘাসের জমিটার এক কিনারে কাঠের শুভ্র ক্রসে সে কোলাহল থেকে খানিকটা কালিমা ছিটকে গিয়ে লাগল যেন।
ম্যাকেঞ্জি সতর্কভাবে পাহাড়ী মানুষগুলোর মুখের ওপর দিয়ে দৃষ্টিটাকে পাক খাওয়াতে খাওয়াতে চার্চের একটি জানালায় এনে স্থির করল। দেখল, দু’টি শাণিত নীল চোখ মেলে স্থির দাঁড়িয়ে রয়েছে পিয়ার্সন। পলক পড়ছে না। একটা শিলামূর্তি যেন। বাঘের ঘরে ঘোগের আস্তানা। আচ্ছা, তার নামও ম্যাকেঞ্জি। পাদ্রী-জীবনের নেপথ্যে ব্রেটেনব্রুকশায়ারের রাঙা মাটিতে মাটিতে তার অতীতকে রেখে এসেছে সে। সে অতীতের খবর জানা নেই পিয়ার্সনের। সে অতীত মানুষের তাজা রক্তে রক্তে ভীতিকর। আশপাশের পঁচিশটা শায়ার তার নামের দাপটে সেদিন তটস্থ থাকত। একটা ভিলেজ রোগ। একটা ব্যান্ডিট। সেদিন তার নাম করে দূরন্ত ছেলেদের ঘুম পাড়াত মায়েরা। তার নামে ছড়া বেঁধেছিল অজানা গ্রাম্য কবিরা।
ব্যান্ডিট থেকে ধর্মযাজক। আশ্চর্য জন্মান্তর বটে! সেই ব্রেটনব্রুকশায়ারের রাঙা মাটি ঘোড়ার খুরে খুরে ক্ষতবিক্ষত করে, শিকারি নেকড়ের মতো একদল অনুচর নিয়ে ঘুরে বেড়াত একটা ঘৃণিত আউটল। তার ঘোড়ার খুরের শব্দে একটা আসন্ন অপঘাতের আশঙ্কায় শিউরে উঠত পঁচিশটা শায়ারের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকুনি।
ব্যান্ডিট থেকে মিশনারি।
কী কুৎসিত সে জীবন। নিরীহ মানুষের রক্তে রক্তে, নারীর ইজ্জত শিকারে সে জীবন কী কদাকার! সেদিন কী অব্যর্থ ছিল তার রাইফেলের লক্ষ্য। রিভালভারের ট্রিগারের ওপর তর্জনীটা এতটুকু কাপত না সেদিন।
আউটল থেকে ধর্মযাজক! কত পথ পাড়ি দিয়ে আসতে হয়েছে ম্যাকেঞ্জিকে! সে কাহিনী অন্য সময় বলা যাবে। কিন্তু ব্রেটনব্রুকশায়ারের সেই ভয়ঙ্কর জীবন এখনও তার শিরায় শিরায় বিষাক্ত একটা রক্তকণিকার মতো মিশে রয়েছে। সেই কলুষিত জীবনে ফিরে যেতে চায় না পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি। অজস্র মানুষের ধর্মবোধের ওপর প্রভুত্ব করার মধ্যে এক ধরনের মাদকতা আছে। এমন এক বিচিত্র রকমের নেশা আছে যার আকর্ষণ অতীত জীবনটা সম্বন্ধে অরুচি ধরিয়ে দেয়। কিন্তু পিয়ার্সনটা বড় একগুঁয়ে, বড় জেদী। যদি প্রয়োজন হয়–চার্চের জানালায় একটা বিরক্ত ভ্রুকুটি হেনে বিড়বিড় করে কী যেন বলল ম্যাকেঞ্জি। নিশ্চয়ই হোলি বাইবেলের মহাজন-বাণী আবৃত্তি করল না।
