পশ্চিমের পাহাড়চূড়ায় বেলাশেষের বিষণ্ণ রোদ আটকে রয়েছে।
সিজিটোর ঘরে এল সারুয়ামারু। একপাশে বাঁশের একটা মাচান। তার ওপর সেঙাই বসে রয়েছে। এর মধ্যে খাবারগুলো শেষ করে ফেলেছে সে।
ঘরের মধ্যে আবছা অন্ধকার।
সারুয়ামারু বলল, কি রে সেঙাই, সব খাবার গিলেছিস? আমার জন্যে রাখিসনি?
না, সব খেয়ে ফেলেছি। বড্ড খিদে পেয়েছিল।
হু-হু, ঠিক আছে। ফাদারের কাছ থেকে আবার চেয়ে নেব’খন।
সারুয়ামারু বলল, চল, কোহিমা শহর তোকে ঘুরিয়ে আনি। মাধোলাল মাড়োয়ারির দোকান, ভূষণ ফুকনের দোকান-যেখান থেকে আমরা নিমক নিই, সব দেখিয়ে আনব। তোকে। সমস্ত কিছু চিনিয়ে দেব।
এবার উৎসাহিত হয়ে উঠল সেঙাই। মাচান থেকে লাফিয়ে নিচে নামল, সেই যে বলেছিলি, রানী গাইডিলিও বলে কে আছে, তাকে দেখাবি না? তুই বলেছিলি, তার ছোঁয়ায় নাকি সব রোগ সেরে যায়। তামুন্যুর (চিকিৎসক) চেয়েও সে বড়। সদ্দার তাকে দেখে যেতে বলেছে।
হু-হু, নিশ্চয়ই দেখাব। চল, বেরিয়ে পড়ি।
চার্চের সামনে সবুজ ঘাস-জমিটার কাছাকাছি আসতেই পেছন থেকে একটা ডাক ভেসে এল। নির্ঘাত পাত্রীসাহেব। ফিরে তাকাল দুজন।
এই সারুয়ামারু, এই সেঙাই–কোথায় যাচ্ছ তোমরা?
ঘাস-জমির ওধারে বেতের চেয়ারে বসে হোলি বাইবেলের বিশেষ একটা অধ্যায়ে মনটাকে ডুবুরির মতো নামিয়ে দিয়েছিল পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি। সেঙাইদের বেরুতে দেখে মুখ তুলল।
গুটি গুটি সামনে এসে দাঁড়াল সারুয়ামারু। ফিসফিস গলায় বলল, সেঙাইকে একটু শহর দেখাব। হুই মাধোলালের দোকান যেখান থেকে আমরা নিমক নিই, সেই আস্তানাটাও দেখিয়ে দেব। দরকার হলে বস্তি থেকে এসে ও নিমক নিয়ে যাবে।
আর কোথায় যাবে? উৎসুক চোখে তাকাল ম্যাকেঞ্জি।
আর হুই যে রানী গাইডিলিও আছে, তাকে একবার দেখব।
রানী গাইডিলিও! সাপের ছোবল পড়ল যেন ম্যাকেঞ্জির কানে। হাতের বাইবেলখানা সশব্দে বন্ধ করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল সে, খবরদার, ওদিকে কেউ যাবে না। গাইডিলিও একটা ডাইনি। সর্বনাশ করে ছাড়বে।
ডাইনি! চমকে উঠল সারুয়ামারু। তার মুখেচোখে একটা সন্ত্রস্ত ছায়া পড়ল।
ইতিমধ্যে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সেঙাই। সেও বলল, ডাইনী!
হ্যাঁ—হ্যাঁ–লালচে চুল ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে, কটা চোখের মণি ঘুরিয়ে দু’টি পাহাড়ী মানুষকে যাচাই করতে লাগল ম্যাকেঞ্জি। ডাইনি! দেখতে লাগল, ওই একটি শব্দ কেমন করে তাদের মুখেচোখে কী প্রতিক্রিয়া ফুটিয়ে তুলছে। নিপুণ শিল্পীর মতো কথার তুলিতে, উচ্চারণের ঢংয়ে একটা ভয়ের ছবি আঁকতে লাগল ম্যাকেঞ্জি। বার বার সেঙাই আর সারুয়ামারুর কানের কাছে মুখখানা ঘনিষ্ঠ করে পরম শুভার্থীর মতো বলতে লাগল, খবরদার, জানের মায়া থাকলে গাইডিলিওর কাছে যেয়ো না তোমরা। গাইডিলিও একটা খারাপ আনিজা। বুকের রক্ত শুষে শুষে সাবাড় করে ফেলবে তোমাদের।
কাঁপা গলায় সেঙাই বলল, ডাইনি যখন, নিশ্চয়ই বশীকরণ ওষুধ জানে গাইডিলিও?
হ্যাঁ হ্যাঁ, জানে। খুব সাবধান। দু’টি পাহাড়ী মানুষের মনে গাইডিলিও সম্পর্কে একটা ভয়াবহ ধারণা গড়ে তুলতে লাগল ম্যাকেঞ্জি, এমন বশ করবে, একেবারে পোষা বাঁদর বানিয়ে ছাড়বে।
ভালোই হল। আমাদের পাশের বস্তি সালুয়ালাঙে আমার গোয়া লে আছে। তাকে আমার চাই। তার জন্যে গাইডিলিও ডাইনির কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে যাব। আমাদের হুই দিকে ডাইনি নাকপোলিবা রয়েছে। কিন্তু তার কাছে ঘেঁষতে বড় ভয় করে।
একটু থতমত খেল ম্যাকেঞ্জি। পরক্ষণে বিক্ষিপ্ত মনটাকে ঠিকঠাক করে নিল, এ ডাইনি তোমাদের ওই নাকপোলিবার চেয়েও সাআতিক। এর কাছে যেয়ো না। আমি তোমাকে সেই সালুয়ালাঙ বস্তির লগোয়া লেকে এনে দেব। তা হলে খুশি তো?
দিবি তো, দিবি তো, ও সায়েব? গভীর উৎসাহে ম্যাকেঞ্জির পাশে এসে নিবিড় হয়ে দাঁড়াল সেঙাই, তুই যদি এনে দিস তবে আর গাইডিলিওর কাছে যাব না। বলতে বলতে কয়েক মুহূর্তের জন্য ভাবনার মধ্যে তলিয়ে গেল সেঙাই। তারপর কাঁপা, ভীরু গলায় বলল, কিন্তু আমাদের সদ্দার যে গাইডিলিওকে দেখে যেতে বলেছে।
তোমাদের সদ্দার জানে না ও কত বড় শয়তানী। ওই ডাইনি গাইডিলিওর কাছে গেলে একেবারে খতম করে দেবে।
আচমকা বাঁশের গেটে ক্যাচ করে শব্দ হল। চোখ তুলে তাকাল ম্যাকেঞ্জি। তারপর খুশির গলায় অভ্যর্থনা জানালো, আরে এসো, এসো তোমরা।
গেটের ওপাশে অনেক মানুষের জটলা। পাহাড়ী মানুষ। তুমুল হুলস্থুল বাধিয়ে দিয়েছে। মাথায় মোষের শিঙের মুকুট, তাতে আউপাখির পালক গোঁজা। তামাটে দেহে অজস্র উল্কি মানুষের কঙ্কাল, বাঘের চোখ, হাতির দাঁত আঁকা রয়েছে। হাতের থাবায় লম্বা লম্বা বর্শা। সেই বর্শার ফলায় বেলাশেষের রোদ ঝিলিক দিচ্ছে।
ডেলা পাকিয়ে জটলা করতে করতে মানুষগুলো সামনের ঘাসের জমিটায় এসে বসেছে। সেঙাই একবার তাদের দিকে তাকাল। তার দৃষ্টিটা সকলের মুখের ওপর দিয়ে ঘুরে যেতে শুরু করল। নানা জাতের পাহাড়ী নাগা। লোটা, আও, সাঙটাম, কোনিয়াক, সেমা, রেঙমা। বিচিত্র ভাষায় তারা একসঙ্গে চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে। বিচিত্র ভাষা, অদ্ভুত অদ্ভুত উচ্চারণ আর মুখভঙ্গি। হঠাৎ একটি মুখের ওপর এসে দৃষ্টিটা শিউরে উঠল সেঙাইর। হৃৎপিণ্ডের ধকধকানি থেমে আসতে লাগল। ওই মানুষটা নির্ঘাত সালুয়ালাঙ বস্তির সর্দার।
