আক্ষেপ করে একটু থামল ম্যাকেঞ্জি। এই আক্ষেপ আর থামার মধ্যে যেন আত্মদর্শন হল তার। তারপরেই বলতে শুরু করল, তোমার আর কী। ডিউক ফ্যামিলির ছেলে। একটা হুইমের ঝোঁকে এ লাইনে এসে পড়েছ। ভালো না লাগলে ছেড়ে পালাবে। কিন্তু আমরা এসেছি একটা ইন্সপিরেশনের তাড়নায়, একটা ভিসনের প্রেরণায়। ক্রিশ্চানিটির আলো দিয়ে পৃথিবী থেকে প্যাগানদের আর আইডোলেট্রিকে ভাগাতে হবে। আর একটা ডেলুজ আসার আগেই আমাদের কর্তব্য হল পৃথিবীকে শুদ্ধ করে নেওয়া। ইট জি নিদার আ হুইম নর আ গেম অব একসেনট্রিসিটি। এর নাম সাধনা। মানুষকে কুসংস্কার থেকে মুক্তি দিতে হবে। টু রিডিম—
হঠাৎ গম্ভীর হল পিয়ার্সন। থমথমে গলায় বলল, কিন্তু আমার মনে হয় এ প্রিচিঙের কোনো দাম নেই, কোনো প্রয়োজন নেই। নিজেদের ধর্মের মধ্যেই এদের বাড়তে দেওয়া উচিত। তা হলেই যথেষ্ট উপকার করা হবে। আমার তো এই কদিন পাহাড়ে ঘুরে আর এই পাহাড়ীদের দেখে দেখে তাই মনে হল।
কানের ওপর যেন খানিকটা তরল সীসা ঢেলে দিয়েছে কেউ। প্রায় আর্তনাদ করে উঠল ম্যাকেঞ্জি, বলছ কী পিয়ার্সন! আমরা লোকের উপকারই করি। এতটা ফিলানথ্রপি কিন্তু বরদাস্ত করা যায় না। তা ছাড়া, এই মানুষগুলো শয়তানের শিকার হয়ে থাকবে! জানো তো, ব্রিটিশ রাইফেল যেখানে গেছে সেখানেই বাইবেল গিয়ে হাজির হয়েছে। রাইফেল-বাইবেলে মিলন না হলে পৃথিবীজোড়া রাজ্য করা সম্ভব হত আমাদের?
আপনি কী বলছেন ফাদার! আমরা মিশনারি, আমাদের সঙ্গে রাজ্য জয়ের সম্পর্কটা কী! বিস্ময়ে গলাটা যেন চৌচির হয়ে ফেটে পড়ল পিয়ার্সনের।
ঠিক যে দৃষ্টি দিয়ে দেখছ, তার উলটো দিকে থেকে ভাবতে হবে। আমরা আগে ব্রিটিশার, তারপরে মিশনারি। এটা ভুলো না।
থতমত খেল পিয়ার্সন। বলে কী ম্যাকেঞ্জি! সেসব এখন স্বপ্নের মতো মনে হয়। কেস্ট্রিজ য়ুনিভার্সিটির বিশাল চত্বর কাঁপিয়ে যখন তার সাড়ে ছ ফিট দীর্ঘ ঋজু দেহটা হাঁটত তখন মিশনারি জীবন সম্বন্ধে ধারণা অন্যরকম ছিল পিয়ার্সনের। শুদ্ধাচারে মানবপ্রেমে সে জীবন অপরূপ, ক্ষমাসুন্দর। মিশনারির মন, ভাবনা, ধারণা হবে ব্যাপক, উদার এবং পক্ষপাতহীন। মিশনারির পরিচয় হল মিশনারি। আর কিছু নয়। কিন্তু কোহিমার পাহাড়ে এসে মোহভঙ্গ হচ্ছে। পিয়ার্সনের। কাঁচের বাসনের মতো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে তার এতদিনের লালিত মিশনারি জীবনের সংজ্ঞাটা।
কঠিন গলায় পিয়ার্সন বলল, কিন্তু অপরের ধর্মে হাত দেওয়াটা কী ঠিক? সে আর এক ধরনের ইম্পিরিয়ালিজম।
নাঃ! কতক্ষণ আর সংযত হয়ে থাকা সম্ভব! হোক সে মিশনারি। ছয় রিপুর একটি মনের মধ্যে তুমুল হয়ে উঠল। ম্যাকেঞ্জির ভুরু দুটো কুঁচকে গেল। এই মুহূর্তে তার দুচোখে ভয়ানক এক ছায়া দেখল পিয়ার্সন।
মিশনারি! তাদের বাদবিতণ্ডা কিছুই বুঝতে পারছে না সারুয়ামারু। তবু তার মনে হল, বুনো বাঘকে নিরীহ হরিণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় যেমন দেখায় ঠিক তেমনই দেখাচ্ছে। বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জিকে। দেখতে দেখতে ভয়ে সে আড়ষ্ট হয়ে গেল।
একটু পরে ম্যাকেঞ্জি আর পিয়ার্সনের অজান্তে একপা দু’পা করে সিজিটোর ঘরের দিকে চলে গেল সারুয়ামারু।
তীক্ষ শাসানির গলায় ম্যাকেঞ্জি বলল, সেটা তোমার দেখবার কথা নয় পিয়ার্সন। না পোষালে তোমাকে হোমে পাঠিয়ে দিতে হবে। ইউ আর নো ডাউট, আ ভেরি ডেঞ্জারাস এলিমেন্ট। তোমাকে সাবধান করতে বাধ্য হচ্ছি, এসব ব্যাপার নিয়ে, এ জাতীয় কথা বলে পাহাড়ী মানুষগুলোকে বিষাক্ত কোরো না। এর রি-অ্যাকশন খুব খারাপ। ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের পক্ষেও ক্ষতিকর। তুমি ছেলেমানুষ, এখনও সমঝে চল। আগুন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি কোরো না।
থ্যাঙ্কস। চেষ্টা করব আপনর কথামতো চলতে।
ম্যাকেঞ্জির মনে হল, বিদ্রূপ করে চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো উচ্চারণ করল পিয়ার্সন। মনে হল, একরাশ তাচ্ছিল্য বুলেটের মতো এসে বিঁধল চোখেমুখে।
সামনের গেটে কাঁচ করে শব্দ হল। সেই সঙ্গে একজোড়া ভারী বুটের সদর্প আওয়াজ। এতক্ষণ মুখখানা একটা প্যাচার মতো কুটিল, ভয়ানক আর গম্ভীর হয়ে ছিল। হঠাৎ দম-দেওয়া পুতুলের মতো লাফিয়ে উঠল ম্যাকেঞ্জি। হাসল। বলল, গুড ডে মিস্টার বসওয়েল। আসুন, আসুন।
সাদর অভ্যর্থনায় গদগদ হয়ে উঠল ম্যাকেঞ্জি।
গুড ডে ফাদার। উদ্ধত বুট জোড়া পাথরের ওপর খট খট শব্দ করতে করতে সামনে এসে পড়ল।
মিস্টার বসওয়েলের মুখখানা বিরাট আর ভয়ঙ্কর। উদ্ধত চোয়াল সামনের দিকে ঠেলে বেরিয়ে আছে। দু’টি কপিশ চোখ। ভুরুর রোমশ মাংস চোখ অনেকটা ঢেকে রেখেছে। কপালের অজস্র ক্ষতচিহ্ন মুখটাকে ভীষণ করে তুলেছে। সামনের বেঞ্চখানায় বসতে বসতে বসওয়েল বলল, সাম্প্রতিক খবর ফাদার। সারা ভারতবর্ষে আন্দোলন শুরু হয়েছে। দ্যাট গ্যান্ডি হাফ-নেকেড ম্যান, লোকটা জাদু জানে। একেবারে ভেলকি লাগিয়ে দিয়েছে। ইন্ডিয়ার মাটি থেকে ব্রিটিশ রুল ওভারথ্রো করে ছাড়বে, এমন মতলব। নেটিভগুলো খেপে উঠেছে।
কী সর্বনাশ! চমকে সটান খাড়া হল পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি, এখানকার খবর কী? আপনি তো পুলিশ সুপার। কোনো গণ্ডগোল হবে না তো?
একটু হাসল মিস্টার বসওয়েল। সেই হাসি তার বিশাল মুখখানায় ভয়াল ক্রুরতা ফুটিয়ে তুলল, সেই জন্যেই তো আসা। আমি জানি কেমন করে এই আন্দোলনকে রাইফেলের মুখে উড়িয়ে দিতে হয়। সারা ইন্ডিয়ার অ্যাজিটেশন ঠাণ্ডা করতে চারটে ঘণ্টাও পুরো লাগে না। ওনলি ইন্ডিসক্রিমিনেট ফায়ারিং। যাক, যে কথা বলতে এসেছি ফাদার, আপনার খানিকটা হেল্প চাই–
