পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি ভাবল, এত বড় লক্ষ্য নিয়ে যে এখানে এসেছে, তার অন্তত সহজে উত্তেজিত হওয়া চলে না।
একটু আগে বিড় বিড় করে একটা কদর্য গালাগালি উচ্চারণ করেছিল, সেজন্য এখন অনুতাপ হচ্ছে কি? স্নায়ুগুলো পীড়িত হচ্ছে? একটি মাত্র কর্তব্যের প্রেরণায় সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইন্ডিয়ার এই পাহাড়ে এসে উঠেছে। এক গোলার্ধ থেকে একেবারে অন্য এক গোলার্ধে। বেথেলহেমের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে এই দেশের আকাশে স্থির করে রেখে যেতেই এই পাহাড়ে অরণ্যে সে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মানবপুত্রের কল্যাণময় নামকে এদেশের মানুষগুলোর শিরায় শিরায় রক্তকণার মতো ছড়িয়ে না দেওয়া পর্যন্ত তার স্বস্তি নেই।
ভাবনাটা হঠাৎ এলোমেলো হয়ে গেল পাদ্রীসাহেবের। সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সারুয়ামারু। পাদ্রীসাহেব বলল, সিজিটোর ঘরে রেখে এসেছ তো সেঙাইকে?
হু-হু।
বোসো। তারপর বল তোমাদের বস্তির খবর কী? অনেকদিন তোমাকে বলেছি। এবার সেখানে আমার যাওয়ার একটা ব্যবস্থা কর। শুধু শুধু রক্তারক্তি হবে, এ আমি চাই না। আমি মিশনারি। অনেক টাকা দেব তোমাদের। যা চাও, সব মিলবে। খালি তোমাদের খ্রিস্টান হতে হবে। একটু থামল পাদ্রীসাহেব। খানিক বাদে ফের বলতে শুরু করল, যাক, এর মধ্যে শুয়োর বলি দাওনি তো? ক্রস এঁকেছ? যীশু-মেরীর নাম জপেছ?
সারুয়ামারু বলল, হু-হু, সব করেছি। তবে লে কেফু মাসে সূর্যের নামে একটা মুরগি বলি দিয়েছিলাম।
নাঃ! সংযমকে আর বাঁধ দিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ধৈর্য প্রশান্তি সহিষ্ণুতা, এগুলোর একটা সীমা আছে। এই পাপাচারী পাহাড়ীগুলোর বিবেক বলে কি আউন্সখানেক পদার্থও নেই! তোতাপাখির মতো সে এই সারুয়ামারুকে পড়িয়েছে। আনিজার নামে কোনো প্রাণীহত্যা করা চলবে না। দু’টি বছর ধরে এই বুনো শয়তানের মনটাকে কত কসরতে, কত যত্নে এই প্যাগান পৃথিবী থেকে বেথেলহেমের দিকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছে পাদ্রীসাহেব। কিন্তু পাদ্রী হলেও সে মানুষ তো। ছটা রিপুর স্লেভ। চাপা গলায় তর্জন করে উঠল, ডেভিলস, সন্স অব বিচ
পাদ্রীসাহেবের গালাগালির মহিমা আছে। এত আস্তে, মুখের রেখাগুলিকে এতটুকু বিকৃত না করে গালাগালিটা সে উচ্চারণ করে, যাতে মনে হয় বুঝিবা পবিত্র প্যারাবল্ আওড়াচ্ছে।
ঠিক এমন সময় এল আর একজন মিশনারি। তার দিকে তাকিয়ে পাত্রীসাহেব উত্তেজিত হয়ে উঠল, এই যে পিয়ার্সন, দেখ–জাস্ট সী–এত করে বুঝিয়েছি, তবু ঠিক আনিজার নামে একটা মোরগ বলি দিয়ে বসে আছে। এত টাকা খরচ, এত পরিশ্রম জলে যাচ্ছে। এই বুনন পাহাড়ে এক্সাইলড হয়ে থাকার তবে অর্থ কী, একটা লোকও যদি ঠিকমতো ব্যাপটাইজড না হল!
মেজাজটা একেবারে খিঁচড়ে গিয়েছে পাদ্রীসাহেবের। বার বার তার সোনাবাঁধানো গজদাঁতটা আত্মপ্রকাশ করতে লাগল। পাদ্রীসাহেব দুজন কী এক দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলছে, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে সারুয়ামারু। ওদের ভাবগতিক বিশেষ সুবিধের মনে হচ্ছে না। সারুয়ামারু কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করতে লাগল।
পিয়ার্সন মিটিমিটি হাসছিল। মাত্র কিছুদিন আগে কোহিমা শহরে এসেছে। বছর পঁচিশ বয়স। সোনালি চুল বাতাসে উড়ছে। চোখের ঘন নীল মণিতে মহাসাগরের আভাস। থরে থরে পেশী বুক তার বাহুসন্ধির দিকে উঠে গিয়েছে। সারা দেহের ওপর সাদা সারপ্লিসটা যেন বড় বেমানান, বড় বেখাপ্পা দেখায়। সাড়ে ছ ফিট লম্বা একটা ঋজু দেহ। মেরুদণ্ডটা সরলরেখায় মাথার দিকে উঠে গিয়েছে। কোহিমার পাহাড়ে অরণ্যে, মিশনারির নিরুত্তেজ জীবনের ভূমিকা তার কাছে যেন কৌতুকের অভিনয়মাত্র। মনে হয়, ওই সাদা সারপ্লিসটার মতোই এই জীবনটাকে ঝেড়ে ফেলে আকাশ ফাটিয়ে হো হো করে হেসে উঠতে পারে পিয়ার্সন। ইংলন্ডের কোনো এক ডিউক পরিবারের ছেলে সে। কী এক দুর্বোধ্য খেয়ালে, কী এক দুর্নিবার কৌতুকে মশগুল হয়ে চার্চে চলে গিয়েছিল। কেন্দ্রিজ য়ুনিভার্সিটি থেকে সরাসরি চার্চের অলটার। সেখান থেকে মহাসমুদ্রের একটা উদ্দাম ঢেউয়ের মতো আছড়ে এসে পড়েছে কোহিমার পাহাড়ে।
এখনও সমানে মিটিমিটি হেসে চলেছে পিয়ার্সন।
এবার বিরক্ত গলায় পাদ্রীসাহেব বলল, হোয়াট ডু য়ু মীন–হাসছ কেন? সিরিয়াস ব্যাপারে হাসি ভালো না পিয়ার্সন।
আই অ্যাডমিট মিস্টার ম্যাকেঞ্জি। হাসিটা আঠার মতো এখনও আটকে রয়েছে পিয়ার্সনের পুরু রক্তাভ ঠোঁটে।
ভ্রূ দুটো কাঁকড়াবিছার মতো কুঁকড়ে গেল পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির। বলল, তোমাকে অনেকবার বলেছি, আমাকে ফাদার বলে অ্যাড্রেস করবে। এটা চার্চের নিয়ম। বাট সরি টু ওয়ার্ন–তুমি সে নিয়ম মানছ না।
পারডন। আর এমনটি হবে না। হাসিটা এখনও স্থির হয়ে রয়েছে পিয়ার্সনের ঠোঁটে।
ম্যাকেঞ্জি স্থির দৃষ্টিতে পিয়ার্সনের দিকে তাকাল। ভাবখানা, ভবিষ্যতে দেখা যাবে। বলে উঠল, তুমি বিশেষ কাজকর্ম করছ না। প্রিচিঙ-এর জন্যে এত টাকা খরচ হচ্ছে এই পাহাড়ে। তোমার সেদিকে খেয়াল নেই। তুমি খালি পাহাড়-পর্বত আর ফলস্ দেখে বেড়াচ্ছ।
মুগ্ধ গলায় পিয়ার্সন বলল, বাট ইউ মাস্ট অ্যাডমিট, ভারি সুন্দর এই নাগা পাহাড়।
একটা ভ্রুকুটি ফুটে বেরুল ম্যাকেঞ্জির মুখে, ভুলে যেয়ো না পিয়ার্সন, ইউ আর নট আ পোয়েট, বাট আ মিশনারি। কাব্য করার জন্যে এখানে তুমি নিশ্চয়ই আসোনি। এই তো এতদিন এসেছি আমরা, একটা খাঁটি ক্রিশ্চান করতে পেরেছি! ডেটারমিনেশন থাকা উচিত আমাদের।
