বিকেলের রং আরো ঘন হয়েছে। পশ্চিমের পাহাড়চূড়ায় স্থির হয়ে রয়েছে সূর্যটা। বিকেলের সূর্য, রক্তলাল।
কাঠের একটা বেঞ্চের ওপর জাঁকিয়ে বসেছে সারুয়ামারু। সেঙাইর দিকে তাকিয়ে সে বলল, বোসো সেঙাই।
একপাশে বর্শাটা রাখতে রাখতে সেঙাই বলল, বসব?
হু-হু। এটা তো বসবার জন্যেই। তুই কিছুই জানিস না। এটা কেলুরি বস্তি নয়। হু-হু–এটা কোহিমা শহর। শহরের আদবকায়দা সম্বন্ধে আর একবার জ্ঞান দান করল সারুয়ামারু।
ইতিমধ্যে একখানা চেয়ার এনে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসেছে পাত্রীসাহেব। তার সঙ্গে এসেছে একটা পাহাড়ী চাকর। চাকরটার হাতে নানা ধরনের কাপড় আর অনেক রকমের খাবার। পাদ্রীসাহেব চাকরটার হাত থেকে খাবার আর কাপড়গুলো তুলে নিয়ে সেঙাইর দিকে বাড়িয়ে দিল, এই নাও সেঙাই। এগুলো তোমাকে দিলাম। কাপড় পরবে আর খাবারগুলো খাবে। কেমন?
বেঞ্চের ওপর বসে পড়েছিল সেঙাই। তার একেবারে স্পর্শের সীমানায় অদ্ভুত এক মানুষ। ধবধবে গায়ের রং। চোখের মণি নীল। পাহাড়ী সেঙাই-এর কাছে এই মুহূর্তে এই পাদ্রীসাহেবটি বড় অবিশ্বাস্য মনে হল। মনে হল, বেলাশেষের এই হলুদ রোদে কোহিমা শহরের এই সবুজ ঘাসজমি থেকে পাদ্রীসাহেব এক ভোজবাজিতে যে-কোনো সময় মিলিয়ে যেতে পারে। স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে তাকে।
পাত্রীসাহেব সস্নেহে বলল, নাও সেঙাই। লজ্জা কী?
এবার সারুয়ামারুর দিকে তাকাল সেঙাই। পাদ্রীসাহেবের দেওয়া উপহার নেবে কি নেবে, বুঝে উঠতে পারছে না। সারুয়ামারু প্রেরণা দিতে শুরু করল। উৎসাহ দেবার সুরে বলল, নে, নে সেঙাই। ফাদার ভালোবেসে দিচ্ছে। এমন কাপড় জন্মেও দেখিসনি। এমন খাবার। কোনোদিন খাসনি।
কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে একটা হাত বাড়িয়ে কাপড় আর খাবার নিল সেঙাই। তারপর ফিসফিস করে পাত্রী সাহেবকে বলল, সম্বরের ছাল আনিনি, বাঘের দাঁত আনিনি, বর্শা আনিনি। কিছুই তো আনতে দিল না সারুয়ামারু। কী দিয়ে বদল করব?
কিছু দিতে হবে না। সাদা মুখখানার ওপর অপরূপ হাসি ছড়িয়ে পড়ল পাদ্রীসাহেবের। পরম বাৎসল্যে চোখ দুটো তার ভরে গিয়েছে, আমি এগুলো তোমাকে খুশি হয়ে দিলাম। আমাকে ফাদার বলে ডাকবে, বুঝলে?
হু-হু। ডাকবে বৈকি। সেঙাই-এর হয়ে সায় দিল সারুয়ামারু। দস্তুরমতে তৎপর হয়ে উঠেছে সে। বেঞ্চ থেকে উঠে পাদ্রীসাহেবের গা ঘেঁষেঅন্তরঙ্গ হয়ে দাঁড়াল। বলল, একশো বার ডাকবে ফাদার বলে।
সেঙাই বলল, আমার বাপ আর মা কই?
সিজিটো আর তার বউ তো?
হু-হু।
তারা গ্রিফিথ সাহেবের সঙ্গে গুয়াহাটি গিয়েছে। দু-চার দিন বাদে ফিরবে। তুমি এই চার্চে থাকো কয়েকদিন। ওরা ফিরলে দেখা কোরো। এবার পাদ্রীসাহেব তাকাল সারুয়ামারুর দিকে, তারপর তোমাদের বস্তির খবর কী সারুয়ামারু? আমরা যে একবার যাব তোমাদের গ্রামে। সদারকে বলেছ?
সারুয়ামারুর মুখেচোখে বিষাদ ঘনিয়ে এল, বলেছিলাম। কিন্তু সদ্দার রাজি হচ্ছে না একেবারেই।
টাকা দেব অনেক।
তাতেও রাজি নয়। সেঙাইকে জিগ্যেস করে দ্যাখ।
পাদ্রীসাহেবের সারা মুখে হাসির আলো ছড়িয়ে ছিল। অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতো হাসিটিও যেন তার সঙ্গে জন্ম নিয়েছে। সারুয়ামারুর কথাগুলো শুনতে শুনতে হাসি মুছে গেল। এতক্ষণ বোঝা যায়নি, এবার মনে হল, পাদ্রীসাহেবের সাদা মুখখানা ঘিরে মাকড়সার জালের মতো অজস্র কালো কালো রেখার আঁকিবুকি। যেন কতকগুলো সরীসৃপ কিলবিল করে বেড়াচ্ছে। শান্ত সুন্দর পবিত্র মুখখানার আড়াল থেকে একটা ভয়ঙ্কর মুখ কালো কালো রেখার টানে ফুটে বেরুচ্ছে। একটু আগের স্নিগ্ধ মুখখানার সঙ্গে এ মুখের বিন্দুমাত্র মিল নেই।
গম্ভীর মুখে পাদ্রীসাহেব বলল, হু। তারপর মনে মনে একটা অ-মিশনারিসুলভ গালাগালি আউড়ে সঙ্গে সঙ্গে কপাল-বুক বাহুসন্ধি ছুঁয়ে ক্রস করল। আশ্চর্য সংযম। সে খিস্তিটা জিভ থেকে পিছলে সেঙাইদের কান পর্যন্ত পৌঁছুল না। অবশ্য পৌঁছুলেও বিশেষ কোনো আশঙ্কার হেতু থাকত না। কারণ শব্দগুলো বিশুদ্ধ ইংরেজি। সেঙাইদের কাছে নিতান্তই দুর্বোধ্য।
পাদ্রীসাহেব এবার কটমট করে তাকাল সারুয়ামারুর দিকে, কেন, কী জন্যে তোমাদের বস্তিতে যেতে দেবে না সর্দার?
আমি বললাম, ফাদার মুরগি-শুয়োর বলি দিতে দেবে না। ক্রস আঁকতে হবে, যীশু-মেরী বলতে হবে–তাতে সদ্দার রাজি নয়। আমাকে তো বর্শা নিয়ে তেড়ে উঠেছিল। আর শাসিয়ে দিয়েছিল, তোর ফাদার বস্তিতে এলে জান নিয়ে ফিরতে হবে না। অপরাধী গলায় কথাগুলো বলে চুপ করে গেল সারুয়ামারু।
হু-হু–ঘন ঘন মাথা দোলালো সেঙাই। ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে উঠেছে সে। বলল, হু-হু, আমাদের বস্তিতে হুই সব চলবে না। সদ্দার বলে দিয়েছে, সিধে কথা।
তির্যক চোখে একবার সেঙাইকে দেখল পাদ্রীসাহেব। তারপর সারা মুখ থেকে মাকড়সার জালটাকে মুছে ফেলল। কী এক মহিমায় হাসির চেকনাই ফুটিয়ে বলল, আচ্ছা আচ্ছা, সেসব কথা পরে হবে। এখন খাবার খাও। এতটা পথ এসেছ, অনেক কষ্ট হয়েছে। এই সারুয়ামারু, তুমি সেঙাইকে সিজিটোর ঘরে রেখে এসো। তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে।
সেঙাইকে নিয়ে সারুয়ামারু ডান দিকের পাথুরে পথটা ধরল।
বেতের চেয়ারখানায় বসে পাদ্রীসাহেব ভাবতে লাগল। এই পাহাড়ী পৃথিবী। ইনফিডেল আর আইডোলেট্রির দেশ। ঘন অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে পথে কেটে কেটে ক্রিশ্চানিটির আলোকিত রাজপথে এদের তুলে নিয়ে যেতে হবে। সে মিশনারি। অল্পে বিচলিত হলে চলবে না। এই পাদ্রী জীবনের নেপথ্যে যে তার একটি ভয়াল জীবন ছিল, সেই জীবনের ধূসর বাঁকে বাঁকে সব অসংযম, সব বিভ্রান্তি, সব উত্তেজনাকে নির্বাসন দিয়ে আসতে হয়েছে। সন্স অব সিনার্সদের এই পঙ্কিল পৃথিবীতে একটি শ্বেতপদ্ম ফুটিয়ে তুলবে সে, ফুটিয়ে তুলবে একটি ধ্রুবলোক। সেই শ্বেতপদ্মের নাম, সেই ধ্রুবলোকের নাম হল যীশু। নিজের রক্তে পৃথিবীর সব গ্লানি, সব অপরাধ তিনি শোধন করে দিয়ে গিয়েছিলেন।
