ক্রমাগত বাঁক ঘুরছে বাস। বাঁ দিকে পাথর কাটা পাহাড় উঠে গিয়েছে অনেক উঁচুতে। সেই পাহাড়ের গায়ে নিবিড় অরণ্য। ডান দিকে দশ কি পনেরো হাত চওড়া পথের পর থেকে নিচের অতল খাদে নেমে গিয়েছে জটিল বন।
হঠাৎ ভয় পেয়ে সেঙাই বলল, খাদে পড়ে যাব—
আরে না, না–
অসহিষ্ণু গলায় চিৎকার করে উঠল সেঙাই, আমি নামব, আমি নামব। নামিয়ে দে আমায়। বাসের পাটাতনের ওপর লাফালাফি শুরু করে দিল সে।
গাড়ির ভেতর তুমুল শোরগোল উঠল। সারুয়ামারু দুহাত দিয়ে জোর করে সেঙাইকে নিচে বসিয়ে দিল। হয়তো আরো কিছু ঘটতে পারত, কিন্তু তার আগেই বমি করে ফেলল সেঙাই। বমির দমকে চোখমুখ লাল হয়ে উঠল তার। সারা দেহে আলোড়ন তুলে গোঙানি বেরুচ্ছে, ওয়াক-ওয়াক-ওয়াক—
বাসের দোলানিতে মাথাটা বনবন করে ঘুরছে। পাশ থেকে একটা মণিপুরী মেয়ে মাথায় ফুঁ দিতে লাগল। সারুয়ামারু জড়িয়ে ধরে রইল সেঙাইকে।
বাসটা পাক খেতে খেতে কোহিমার দিকে এগিয়ে চলেছে। সেই সমানে চেঁচাতে লাগল, আনিজা, আনিজা! বস্তিতে ফিরে একটা মুরগি বলি দিতে হবে।
.
২৪.
দুপুর পেরিয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। এখন রোদে কমলা রঙের আমেজ লেগেছে।
বাস থেকে কোহিমার পথে নামল সেঙাই আর সারুয়ামারু। গাড়ির দোলানিতে আর বমি করে করে কাহিল হয়ে পড়েছে সেঙাই। উজ্জ্বল তামাটে মুখখানা শুকিয়ে গিয়েছে। বাসে তোলার জন্য সারুয়ামারুর ওপর ভীষণ রেগে গিয়েছিল সেঙাই। কিন্তু সমতল থেকে অনেক, অনেক উঁচুতে এই আকাশছোঁয়া শৈল নগর দেখতে দেখতে দু’টি পিঙ্গল চোখের মণি আবিষ্ট হয়ে গেল। পাহাড়ী মানুষ সেঙাই। বিস্ময়ে আর আগ্রহে সে একেবারে হতবাক হয়ে গিয়েছে।
বাসটা তাদের নামিয়ে বাঁ দিকের পথ ধরে এখন চলে যাচ্ছে।
সারুয়ামারু বলল, হুই পক পক গাড়ি ছেড়ে দিল। ডিমাপুরে যাবে। সেখানে আর এক রকম গাড়ি আছে। বড় বড় ঘর, অনেক লম্বা। তার নাম রেলগাড়ি।
আঁকাবাঁকা পথ। উঁচুনিচু। চড়াই আর উতরাই-এর ধারে ধারে পাইনের সারি। পথের দু’পাশে সুন্দর সুন্দর বাড়ি। ওপরে ঢেউটিন কি টালির চাল। ইটের দেওয়াল। বাড়ির সীমানা ছোট ছোট গাছ আর লতাকুঞ্জ দিয়ে ঘেরা।
সেঙাই বলল, এখানকার কেসুঙগুলো ভারি সুন্দর।
হু-হু। এ কি আর তোর কেলুরি বস্তির কেসুঙ। এ হল শহর কোহিমা। সারুয়ামারু হাসল। এই শহরের যত মহিমা, যত গৌরব, যত মাধুর্য সব যেন সারুয়ামারুর সেই হাসিতে ফুটে বেরুল। এই শহরের মহিমায় যেন তারও একটা গৌরবময় ভূমিকা রয়েছে।
অনেক পথ, অনেক বাঁক, অনেক বিচিত্র মানুষের জটলা, অনেক দুর্বোধ্য কোলাহল পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল সেঙাই আর সারুয়ামারু।
সেঙাই বলল, তোর হুই গাড়ি-আনিজার নামে বস্তিতে ফিরে একটা মুরগি বলি দেব।
চুপ, চুপ।
চুপ কেন রে শয়তানের বাচ্চা? সেঙাইর দুটো ছোট ছোট চোখ জ্বলতে লাগল।
এটা তোর কেলুরি বস্তি নয়। এটা হল কোহিমা শহর। তোর হুই মুরগি বলি দেবার কথা শুনতে পাবে ফাদার। ফিসফিস গলায় বলল সারুয়ামারু, হুই দ্যাখ, হুই যে পুলিশ। ওদের হাতে বন্দুক রয়েছে। এক গুলিতে সাবাড় করে দেবে। অমন কথা আর বলিস না।
সামনের দিকে তাকাল সেঙাই। চোখে পড়ল পরিষ্কার সুদৃশ্য একটি বাড়ি। ওপরে ঢেউটিনের চাল। চারপাশে নানা রঙের অচেনা বাহারি ফুল ফুটে রয়েছে। সামনে নিরপেক্ষভাবে ছাঁটা ঘাসের জমি। সেই ঘাস সবুজ, কোমল আর সতেজ।
দরজার সামনে বিরাট জটলা। পায়ের পাতা পর্যন্ত ঢোলা সাদা কাপড় পরেছে কেউ কেউ। (এর আগে সারপ্লিস দেখেনি সেঙাই)। আচমকা সেঙাইর চোখ দুটো কতকগুলো মানুষের মুখের দিকে আটকে গেল। গায়ের রং ধবধবে সাদা। নীল চোখ। তাদের ঘিরে ধরেছে অনেক পাহাড়ী মানুষ। আর একপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে আরো কয়েকটা লোক। তাদের সকলের একই রকম পোশাক, হাতে একই রকমের বন্দুক। (একটু আগেই বন্দুকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে সারুয়ামারু)।
সারুয়ামারু বলল, ওরা হলো আসা (সমতলের লোক)। দেখছিস না বন্দুক হাতে রয়েছে। ফাদার বলে, ওরা ভারি শয়তান। আমাদের পাহাড়ী মানুষদের ওরা বড় মারে।
হু-হু–মারলেই হল! বর্শা দিয়ে কুঁড়ে ফেলব না।
চুপ, চুপ–
হঠাৎ ঘাসের জমির ওপাশ থেকে একটা খুশি খুশি কণ্ঠস্বর ভেসে এল, আরে সারুয়ামারু যে। এসো, এসো–
মানুষটা সামনে এসে দাঁড়ল। ধবধবে সাদা রং। তাজ্জব বনে গেল সেঙাই। তাদের ভাষা কী চমৎকারই না রপ্ত করেছে বিস্ময়কর লোকটা।
সারুয়ামারু বলল, গুড নাইট ফাদার—
হা হা করে হেসে উঠল পাদ্রীসাহবে, নাইট কোথায়? এখনও তো বিকেল হতে অনেক দেরি।
থতমত খেয়ে চুপ করে রইল সারুয়ামারু। যে ইংরেজি শব্দ দু’টি সগৌরবে সে সঞ্চয় করে রেখেছিল এবং যার জন্য তার রীতিমতো গর্ব ছিল, তার প্রয়োগে এত বড় ভুল হয়ে যাবে, এ কী জানত সে?
হু-হু, মাথা নাড়ল সারুয়ামারু।
পাদ্রীসাহেব সেঙাইকে দেখিয়ে জিগ্যেস করল, এ কে সারুয়ামারু?
এ হল সঙাই। তোর কাছে যে সিজিটো কাজ করে, তার ছেলে। সেঙাইকে এখানে নিয়ে এলাম ফাদার। সোজাসুজি পাদ্রী সাহেবের দিকে তাকাল সারুয়ামারু।
বাঃ, ভালো ভালো। এসো সেঙাই, এসো।
তিনজনে ঘাসের সবুজ জমিটায় চলে এল। একপাশে কাঠের ক্রস খাড়া হয়ে রয়েছে। ঝকঝকে সাদা রং। মানবপুত্র একদিন ক্রুশবিদ্ধ তার হয়ে পুণ্যশোণিতে এই পাপময় পৃথিবীকে স্নান করিয়েছিলেন। এই ক্রস তারই পবিত্র স্মরণচিহ্ন।
