ঘরের ভেতরে এসে টিনের চেয়ার দেখল সেঙাই, দেখল কাঠের টেবিল। যত দেখছে ততই দু’টি চোখ আর মন বিস্ময়ে ভরে উঠছে। নানা কৌতূহলে ইন্দ্রিয়গুলো আন্দোলিত হচ্ছে। পেতলের থালা আর গেলাস এল। তার ওপর মণিপুরী বামুন ভাত, এরঙ্গু (শুঁটকি মাছের তরকারি) আর সর্ষে পাতার ঝোল জাতীয় খানিকটা দিয়ে গেল। তারপর এল মাগুর মাছ ভাজা।
পরম তৃপ্তিতে সারুয়ামারু সপাসপ ভাতের গ্রাস তুলছে মুখে। আর চুপচাপ ঝকঝকে পেতলের থালা আর গেলাসের দিকে তাকিয়ে রয়েছে সেঙাই।
বিশাল একটা গ্রাস ঠোঁটের কাছে এনে সারুয়ামারু তাকাল সেঙাইর দিকে, কি রে, ভাত খাচ্ছিস না কেন? হুই এরঙ্গু খেয়ে দ্যাখ। বুনো মোষের আধপোড়া মাংসের চেয়ে অনেক ভালো, অনেক সোয়াদ পাবি।
কিন্তু পেতলের এইসব–বাসনগুলোর দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিল সেঙাই। বলল, এই পেতল দিয়ে তো আমরা নীশে আর নীয়েঙ দুল বানাই, হার বানাই। এতে খেলে আনিজার গোসা হবে না তো?
আরে না, না। একটা ছাগী তুই। সবেতেই খালি আনিজা। পেতল! থু থু! তোদের হুই কেলুরি বস্তিতেই পেতলের দাম আছে। কোহিমায় গিয়ে দেখবি, ওর কোনো দাম নেই। নে নে, খেয়ে নে। এখুনি আবার পক পক গাড়ি এসে পড়বে।
সারারাত উপত্যকা আর মালভূমি, টিলা আর বন এবং অসংখ্য পাহাড়চূড়া উজিয়ে এসেছে দুজনে। দেহের জোড়ে জোড়ে গাঁটে গাঁটে ক্লান্তি যেন আঠার মতো জড়িয়ে রয়েছে। পেটের মধ্যে খিদের ময়াল পাক দিয়ে উঠছে। আচমকা সেঙাই পেতলের থালাখানায় ঝুঁকে পড়ল। নিমেষে শূন্য হয়ে গেল ভাত-তরকারি-মাছ। মণিপুরী বামুন আরো ভাত ঢালল সেঙাই-এর পাতে। তাও শেষে হল।
একসময় খাওয়ার পালা চুকে গেল। তৃপ্তির একটা বিশাল ঢেকুর তুলল সেঙাই, ভালো ভাত রাঁধে তো এরা। আমাদের ভাত একেবারে গলে গলে একশা হয়ে যায়। বস্তিতে ফিরে এমনি করে ভাত পাকাব এবার। কিন্তু এখানে মাংস নেই, মাংস না হলে কি ভাত খাওয়া যায়?
সারুয়ামারু তার জঙগুপি কাপড়ের ভাজ থেকে একটি টাকা বার করতে করতে বলল, মণিপুরীদের হোটেলে মাংস পাওয়া যায় না।
একটু পরে টাকাটা মণিপুরী মালিকের হাতে দিয়ে কিছু খুচরো ফেরত নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল দুজনে। সেঙাই বলল, টাকা দিলি যে?
বা রে, টাকা দেব না! দাম দিতে হবে না? খেলাম যে, তার দাম। এবার বুঝলি তো টাকা দিলে সব মেলে শহরে। টাকার মহিমা সম্বন্ধে নতুন করে এক প্রস্থ বকর বকর শুরু করল সারুয়ামারু।
হু-হু–মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল সেঙাই। সে বুঝেছে, টাকার পরমার্থ জলের মতো তার
কিছুক্ষণ চুপচাপ।
সেঙাই আবার বলতে শুরু করল, কোথায় তোর পক পক গাড়ি, এই সারুয়ামারু? কাল সমস্ত রাত হেঁটেছি, বড় ঘুম পাচ্ছে।
হুই হুই–সামনের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিল সারুয়ামারু।
অনেক দূরে পাহাড় কাটা পিচের পথ। আঁকাবাঁকা চড়াই উতরাই। সেই পথের ওপর একটা কালো বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে বাসটাকে। বলা যায়, একটা খারিমা পতঙ্গের মতো সাঁ সাঁ করে ছুটে আসছে।
সারুয়ামারু বলল, হুই–হুই হল পঁক পঁক গাড়ি–
অনন্ত বিস্ময়ে চলমান বিন্দুটির দিকে তাকিয়ে রইল সেঙাই। একসময় পাহাড়ী পথের বাঁকে বাসটা অদৃশ্য হল। তারপর আবার পাহাড় আর বনের ফাঁকে ফুটে উঠল। অনেকটা সময় ধরে বার বার দেখা দিয়ে বার বার পথের নানা বাঁকে মিলিয়ে যেতে লাগল বাসটা। তারপর একটু একটু করে স্পষ্ট হতে হতে মাও-এ এসে থামল।
সারুয়ামারু বলল, আয়, গাড়িতে উঠি—
উঠব? আনিজার গোসা লাগবে না তো? ভীরু চোখে সারুয়ামারুর দিকে তাকাল সেঙাই।
আরে দূর! তুই একেবারে বুনো। হুই বুড়ো সদ্দারের কাছে থেকে থেকে একেবারে অসভ্য হয়ে গেছিস। একটা বিরক্ত ভ্রুকুটি ফুটে বেরুল সারুয়ামারুর চোখে, হুই শয়তান সদ্দারটা ওর জন্যে বস্তির মানুষগুলো বুনোই হয়ে রইল।
আহে ভু টেলো। বাসে উঠতে উঠতে খিঁচিয়ে উঠল সেঙাই, খবদ্দার, সদ্দারকে নিয়ে খারাপ কথা বলবি না সারুয়ামারু। একেবারে বর্শা দিয়ে কুঁড়ে ফেলব তা হলে।
একটু দমে গেল সারুয়ামারু। চকিতে সেঙাই-এর দিকে তাকাল। আনকোরা পাহাড়ী মানুষ। শহরের রং দিয়ে, শহরের বাহার দিয়ে, চেকনাই দিয়ে, লোভ আর লালসার উত্তেজনা দিয়ে সেঙাইকে মেজে ঘষে নতুন রূপ দিতে, নতুন ছাঁচে ঢালাই করে নিতে সময় লাগবে। মনে মনে সারুয়ামারু পাদ্রী সাহেবদের কথা ভাবল। ওরা ভোজবাজি জানে। ওদের কথায় বার্তায় ব্যবহারে জাদু আছে। সারুয়ামারু জানে, কেমন করে তার মতো ভয়াল পাহাড়ী মানুষকেও পাদ্রী সাহেবরা তীব্র আকর্ষণে কাছে টেনে নিয়েছে। সেঙাইর মতো একদিন সেও এই শহরের রাস্তায় ছিল একেবারেই নতুন।
একটু হাসল সারুয়ামারু, আচ্ছা আচ্ছা, একবার ফাদারের পাল্লায় নিয়ে ফেলি তোকে। তখন তোর এত ফোঁসফোসানি কোথায় থাকে দেখব।
নসু কেহেঙ মাসের দুপুর। ঝকঝকে রোদে আরাম লাগছে।
একসময় বাস চলতে শুরু করল। চাপা চাপা ছোট চোখ, বুকের ওপর থেকে হাঁটুর তলা পর্যন্ত কাপড় বাঁধা কয়েকটা মেয়ে চারপাশে বসে রয়েছে। পাশে বসেছে একদল পুরুষ। তাদের চোখও তেমনি চাপা আর ছোট।
সারুয়ামারু বলল, এরা সব মণিপুরী। হুই ইম্ফল থেকে আসছে।
হু-হু– মাথা নাড়ল সেঙাই। খানিক আগে সারুয়ামারু তাদের চিনিয়ে দিয়েছিল।
তাদের মতো জনকয়েক নাগাও এদিকে সেদিক ছড়িয়ে বসে রয়েছে।
