হু-হু। জোয়ান ছেলেরা চারপাশ থেকে সায় দিল। তাদের হাতের থাবায় বর্শার ফলাগুলো ঝকমক করে উঠল। আসন্ন লড়াই-এর উত্তেজনায় তাদের মন, অস্ফুট চেতনা আর ভাবনা ভরে গিয়েছে।
চল এবার, রাত্তির হয়ে আসছে। ঢালু উপত্যকার দিকে নামতে নামতে বুড়ো খাপেগা বলল, যাক, বিনা লড়াইতে তো তোকে নিচ্ছি না। দস্তুরমতো লড়াই হবে তোর জন্যে, না কি বলিস মেহেলী?
সকলের সঙ্গে চলতে চলতে মেহেলী বলল, হু-হু–
.
২৩.
পাহাড়ী অজগরের মতো আঁকাবাঁকা রাস্তা। পাথর কাটা মসৃণ সেই পথ। চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, বনময় উপত্যকার মধ্য দিয়ে, বিশাল শিলাস্তূপের বাঁকে বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। পথের বিস্তার দু’দিকেই। মাও থেকে এক দিকে কত শৈলচূড়া পাড়ি দিয়ে সে পথ ছুটে গিয়েছে মণিপুরের দিকে, উত্তর-পশ্চিম কোণে সেই পথই আবার কোহিমা শহরকে ছুঁয়ে ডিমাপুরের দিকে নেমে গিয়েছে, থেমেছে মণিপুর রোড রেল স্টেশনে।
মাও-এর পথে এসে দাঁড়াল সেঙাই আর সারুয়ামারু।
ডান পাশে পাহাড়ের অতল খাদে দোইয়াঙ নদী গর্জে গর্জে ছুটছে। পাথরে পাথরে আছাড়ি পিছাড়ি খেতে খেতে ফুলকি ছড়াচ্ছে নীল জলের ধারা। খাদের ওপর উঁচু ভিতের ওপর দোকানপসার। টিনের চাল, পাথরের মেঝে। বাঁশের মাচানে নানা সম্ভার কমলালেবু, লবণ, সাকা বিড়ি, কঁচি সিগারেট। আর বিরাট বিরাট সব গুদাম-হরিণের ছাল, সম্বরের শিঙ, কস্তুরী, বাঘের ছাল, চিতার দাঁত, হাতির দাঁত দিয়ে বোঝাই। বাঁ দিকে ধাপে ধাপে পাথর কেটে অনেকটা উঁচুতে গোটা তিনেক মণিপুরী হোটেল। টিনের ঘর। সামনে টিনের পাতে মণিপুরী, ইংরেজি, অসমীয়া আর বাংলা হরফে হোটেলগুলোর নাম লেখা রয়েছে।
বাঁ দিকের লবণ আর কমলার দোকানগুলোতে অদ্ভুত ধরনের কতকগুলো মানুষ বসে রয়েছে। অপার বিস্ময়ে এই দোকানপসার, এই অপরিচিত মানুষ, ইম্ফলের দিকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া রহস্যময় পথটার দিকে অপলক তাকিয়ে রইল সেঙাই। অদ্ভুত সব মানুষ। (এর আগে সেঙাই কোনোদিন পাথর কাটা পথ দেখেনি। পাহাড়ী মানুষ ছাড়া এই সব সমতলের মানুষ, যেমন বাঙালি, অসমীয়া হিন্দুস্থানীদের দেখেনি। দেখেনি মণিপুরীদের, শিখদের।) তাদের ভাষা দুর্বোধ্য। আগে কোনোদিন এসব ভাষা শোনেনি সেঙাই। কেলুরি গ্রামে সে সুযোগই বা কোথায়?
ফিসফিস গলায় সেঙাই বলল, এরা সব কোন দেশের মানুষ রে সারুয়ামারু? আমাদের মতো তো নয়।
বিজ্ঞের মতো গম্ভীর শব্দ করে হাসল সারুয়ামারু, হু-হু, এরা হল আসান্যু (সমতলের বাসিন্দা)। খবদ্দার, এদের সঙ্গে কোনোদিন মিশবি না সেঙাই।
কেন?
কেন আবার, ফাদার বারণ করে দিয়েছে। এরা খুব খারাপ লোক।
তাই নাকি?
হু-হু। যেন গূঢ় কোনো খবর দিচ্ছে, মুখখানা এমন গম্ভীর দেখাল সারুয়ামারুর, চল না একবার কোহিমাতে, দেখবি ফাদার সব শিখিয়ে পড়িয়ে দেবে। এই আসান্যুদের মধ্যে বাঙালি আছে, অছমিয়া আছে, হিন্দোস্থানী আছে। ফাদার বলে দিয়েছে, ওরা সব শয়তান। সাবধান সেঙাই। কোহিমাতে গিয়ে ওদের পাল্লায় পড়বি না।
হু-হু। মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল সেঙাই। তারপর ইম্ফলগামী পথটার দিকে তাকাল, ওটা কী রে? সাপের মতো এঁকে বেঁকে পাহাড়ে গিয়ে উঠেছে। কী ওটা?
ওটা পথ। ইম্ফলের দিকে গেছে।
ইম্ফল! সে কোন দেশ? কতদূর? দুচোখে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল সেঙাই।
অনেক দূর। কিন্তু পক পক গাড়িতে সকালবেলা চড়লে সন্ধের সময় পৌঁছে দেবে।
আমি যাব ইম্ফলে।
যাবি, যাবি। ইম্ফলে যাবি, শিলঙে যাবি, গুয়াহাটি যাবি। আরো কত জায়গায় যাবি। আগে তো কোহিমা চল। সমানে বকর বকর করে চলল সারুয়ামারু। একটু পরে শুধলো, খিদে পেয়েছে সেঙাই?
হু-হু—
চল হুই মণিপুরীদের হোটেলে খেয়ে নিই। ইম্ফল থেকে পক পক গাড়ি আসতে এখনও দেরি আছে। এমন জিনিস খাওয়াব, জন্মে কোনোদিন খাসনি। সেঙাইর হাত ধরে টানতে টানতে ডান দিকের পাথর কাটা সিঁড়ির দিকে টেনে নিয়ে গেল সারুয়ামারু।
তখনও ইম্ফল-গামী পথটার দিকে, সামনের দোকানপসারগুলোর দিকে, সমতলের মানুষগুলোর দিকে তন্ময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে সেঙাই। অপরূপ অদ্ভুত অচেনা এক পৃথিবীর মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে সে। টিজু নদীর কিনারে বনময় উপত্যকায় কেলুরি, সালুয়ালা, নানকোয়া, জুকুমিচা–এই সব ছোট ছোট গ্রামের বাইরে ইম্ফলে যাবার এমন একটা মসৃণ পথ ছিল, এমন সব দুর্বোধ্য ভাষার কলতান ছিল, তা কি জানত সেঙাই? সমতলের মানুষগুলোর দিকে একবার তাকাল সে। কেমন একটা আকর্ষণ বোধ হচ্ছে ওদের সঙ্গে মিশবার, ওদের কথা শুনবার। কিন্তু না, একটু আগেই তাদের সম্বন্ধে মোহভঙ্গ করে দিয়েছে সারুয়ামারু।
পাথর কাটা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল সেঙাই আর সারুয়ামারু। পাশের একটা ঝরনা থেকে রবারের নল দিয়ে জল আনা হয়েছে। নলের বরফশীতল জল ছড়িয়ে ছড়িয়ে, ছিটিয়ে ছিটিয়ে কালো পাথরের এবড়োখেবড়ো চত্বরটার ওপর ছড়িয়ে পড়ছে। সারুয়ামারু সেই জলে হাত ধুয়ে নিল। সেঙাইকে বলল, মুখটুখ ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে নে সেঙাই। এটা শহর, একটু সভ্য হয়ে চলবি। এ তো আর হুই সদ্দারের কেলুরি বস্তি নয়। হু-হু। মাতব্বরি চালে হাসল সারুয়ামারু।
অতিকায় বর্শাটা একপাশে রেখে সারুয়ামারুর কথামতো জলে হাত-পা মুখটুখ ধুয়ে নিজেকে পরিচ্ছন্ন করে নিল সেঙাই। উর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। নিচে জানু পর্যন্ত একটি নীল রঙের পী মুঙ কাপড় ঝুলছে।
