আকাশে বিলীয়মান পূর্ণিমার ক্ষয়িত চাঁদ। খাপেগার কণ্ঠ পর্দায় পর্দায় চড়ছিল। আশ্চর্য উত্তেজক এক প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছিল তার কথাগুলো। সুদূর উপত্যকায় ভেরাপাঙের বনকে ভৌতিক মনে হয়েছিল। সেদিন ঘন কুয়াশার স্তর নেমে এসেছিল দূরতম আকাশ থেকে, থরে থরে ঝরছিল পাহাড়ী অরণ্যে। সব মিলিয়ে সেঙাই-এর আধফোঁটা পাহাড়ী মনটা একটু একটু করে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল।
খাপেগা বলেছিল, হালচাল ভালোই চলছিল। আচমকা যেন পাহাড়ের তলায় ভূমিকম্প। শুরু হল। জোহেরি আর পোকরি–দুই বংশের যে এত পিরিত, সব সেই ভূমিকম্পের দোলায় চুরমার হয়ে গেল। এই যে সেঙাই, ওর ঠাকুরদা ছিল আমার স্যাঙাৎ। তার নাম জেভেথাঙ। সে এই জোহেরি বংশের ছেলে। আর নদীর ওপারে পোকরি বংশের মেয়ে নিতিৎসু। এই দুজনকে নিয়েই ফাটল ধরল দুই বংশে…..।
জোহেরি বংশের ছেলে জেভেথাঙ। মাথার চারপাশ দিয়ে গোল করে নিখুঁত কামানো চুল। কানের লতিতে পিতলের নিয়েঙ গয়না, সেই গয়না থেকে লাল রেশমের গুচ্ছ দোদুল দুলছে। উজ্জ্বল তামাভ দেহে থরে থরে পেশীভার। পরনে ওক ছালের লেঙতা। কড়ির বাজুবন্ধ। ছোট ছোট চোখে নিশ্চিত ঘাতনের ঝিলিক। হাতের থাবায় হাতখানেক লম্বা বর্শার ফলা। আর পোকরি বংশের মেয়ে নিতিৎসু। গলায় ছোট ছোট শঙ্খের মালা। মণিবন্ধে কড়ির কঙ্কণ। ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। সোনালি স্তনচূড়া। পিঙ্গল চুলের গুচ্ছে টুঘুটুঘোটাঙ ফুল। কোহিমা থেকে তার বাপ এরি কাপড় এনে দিয়েছিল। কোমরের চারপাশ ঘিরে জানুর ওপর পর্যন্ত সেই শৌখিন আবরণ ঝলমল করে।
জেভেথাঙ আর নিতিৎসু। জোহেরি আর পোকরি বংশ। টিজু নদীর এপার আর ওপার। গ্রীষ্মের এক নির্জন দুপুর। মেশিহেঙ ঝোঁপের পাশ দিয়ে নিয়তবাহী এক ঝরনা। নিঃশব্দ। শুধু আশ্চর্য করুণ আর ছলছল এক জলধারা। তার পাশেই জোহেরি আর পোকরি বংশের দুই যৌবন প্রথম মুখোমুখি হল। জেভেথাঙ দেখল নিতিৎসুকে। নিতিৎসুর পিঙ্গল চোখের মণিতেও একটি পরিপূর্ণ পাহাড়ী যৌবনের ছায়া পড়েছে। সে ছায়ার নাম জেভেথাঙ।
আবিষ্ট চোখে তাকিয়ে ছিল জেভেথাঙ। তার বন্য চোখ দু’টিতে মুগ্ধতা আর খুশি ঝিলিক দিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল। আর নিতিৎসুর দৃষ্টি একটু একটু করে কঠিন হয়ে উঠছিল।
একসময় গাঢ় গলায় জেভেথাঙ বলেছিল, কী নাম তোর?
নিতিৎসু। নাম বললাম, যা এবার ভাগ।
আজ থেকে তুই আমার আসাহোয়া (বন্ধু) বনে যা।
কী! ময়াল সাপের মতো নির্মম চোখে তাকিয়েছিল নিতিৎসু, জানিস আমি পোকরি বংশের মেয়ে?
আমিও জোহেরি বংশের ছেলে। আমার নাম জেভেথাঙ।
এবার নরম হয়েছিল নিতিৎসু। কোমল গলায় বলেছিল, না, তা হবে না। আমার সোয়ামী ঠিক হয়ে গিয়েছে। হুই নানকোয়া বস্তি, পাহাড়ের হুই উধারে, সেই বস্তির মেজুর বংশের ছেলে রিলোর সঙ্গে আমার বিয়ে হবে। আর কোনো মরদের সঙ্গে আমি বন্ধুত্ব পাতাব না। তা হলে আনিজার গোসা হবে। যা, এবার ভাগ।
ইস, ভাগ বললেই ভাগব! দৃঢ় পদক্ষেপে পাহাড়ের উতরাই বেয়ে নেমে আসতে শুরু করেছিল জেভেথাঙ, আয়, আয়। বিয়ে হলেই হল রিলোর সঙ্গে! আমি থাকতে রিলো কেন? এই কুরগুলাঙে এলে রিলোর মাথা নিয়ে নেব। বর্শা দিয়ে সেই মাথা ছুঁড়ে মোরাঙে ঝোলাব। হু-হু–
সাঁ করে বিদ্যুৎ ঝলকের মতো ঘুরে দাঁড়িয়েছিল নিতিৎসু। ঝরনার পাশেই পড়ে ছিল একটা লোহার মেরিকেতসু (নাগা রমণীর অস্ত্র)। চকিতে তুলে নিয়ে সেটা ছুঁড়ে মেরেছিল জেভেথাঙের দিকে। মেরিকেতসুর আঘাতে কপালটা চৌফালা হয়ে গিয়েছিল জেভেথাঙের। ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল খানিকটা তাজা রক্ত।
আ-উ-উ-উ–আর্তনাদ করে মেশিহেঙ ঝোঁপের ওপর লুটিয়ে পড়েছিল জেভেথাঙ। কপিশ ভুরু দুটো ভিজিয়ে রক্তের ধারা বুকের দিকে নেমে গিয়েছিল তার।
কয়েকটি মুহূর্ত। চেতনাটা কেমন শিথিল হয়ে গিয়েছিল। স্নায়ুর ওপর দিয়ে গুটসুঙ পাখির ডানার মতো একটা কালো পর্দা নেমে এসেছিল। অন্ধকার সরে গেলে লাফিয়ে ওঠে পড়েছিল জেভেথাঙ। এক হাত লম্বা বর্শাটা মুঠোর ওপর তুলে নিয়ে চনমনে চোখে চারিদিকে তাকিয়েছিল। শব্দহীন ঝরনার কিনারায় নিতিৎসু নামে কোনো যুবতীর চিহ্ন নেই। একটা পাহাড়ী বনবিড়াল হয়ে সে যেন অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। খ্যাপা বাঘের মতো গর্জন করে উঠেছে জেভেগাঙ, আচ্ছা, আবার দেখা হবে।
জোহেরি আর পোকরি বংশের যৌবন প্রথম দিনের শুভদৃষ্টি শেষ করেছিল এইভাবে। সেই শুভদৃষ্টি নির্মম স্বাক্ষর এঁকে রেখে গিয়েছিল জেভেথাঙের কপালে। তার স্মৃতিকে অক্ষয় করে রেখেছিল সেই ক্ষতচিহ্ন।
আশ্চর্য রহস্যময় গলায় খাপেগা বলেছিল, রাতে মোরাঙে শুতে এল জেভেথাঙ। তামুনুর (চিকিৎসক) কাছ থেকে কপালে আরেলা পাতার প্রলেপ দিয়ে এসেছে। সকলে চমকে তাকালাম। ব্যাপারখানা কী?
জেভেথাঙ আস্তে আস্তে বলেছিল, একটু বাইরে আয় তত খাপেগা। আচ্ছা থাক, তোরা সবাই শোন।
জেভেথাঙের চারপাশে ঘন হয়ে বসেছিল সকলে।
এই মোরাঙ। গ্রামের সব অবিবাহিত জোয়ান ছেলেদের শোওয়ার ঘর। কুরগুলাঙ গ্রামে দুটো মোরাঙ ছিল। একটা টিজু নদীর ওপারে, আর একটা এপারে।
উত্তেজিত ভঙ্গিতে নিঃশব্দ ঝরনার পাশের সেই ঘটনাটা বলে গিয়েছিল জেভেথাঙ। কটি নিথর মুহূর্ত। তারপরেই মোরাঙ কাঁপিয়ে শোরগোল উঠেছিল। পাহাড়ের উপত্যকায় সে হইচই ক্ষয়িত চাঁদের রাতের হৃৎপিণ্ডকে ফালা ফালা করে দিয়েছিল। আকাশে হয়তো চমকে উঠেছিল মীনপুচ্ছ উল্কারা, শিউরে উঠেছিল সুদূর ছায়াপথের রেখা।
