খাড়া চড়াই থেকে নিচে নামতে নামতে চেঁচামেচি শুনতে পেল মেহেলী। মানুষের গলা। চট করে সামনের বড় পাথরখানার আড়ালে সে সরে দাঁড়াল।
বাঘনখের আঁচড়ের মতো ফালি ফালি পথের রেখা। সেই পথ ধরে দুলতে দুলতে আসছে একদল মানুষ। তাদের শোরগোলে স্তব্ধ বনভূমি চকিত হয়ে উঠেছে। নিশ্চয়ই এরা কেলুরি গ্রামের লোকজন। বুকের মধ্যে নিশ্বাস আটকে গেল। নিথর হয়ে রইল মেহেলী।
একটা গলা শুনতে পাওয়া গেল, সেঙাইটাকে কোহিমার পথে দিয়ে এলুম সদ্দার। সারুয়ামারুটাও সঙ্গে গেল। কোহিমা থেকে ও ফিরবে তো?
একটা বুড়ো পাহাড়ী, নিশ্চয়ই সে দলপতি, মাথা ঝাঁকাল, হু-হু, ফিরবে। নির্ঘাত ফিরবে। হুই যে গাইডিলিওর কথা বলেছিল সারুয়ামারু, কেমনতরো মেয়ে সে, তাই দেখতেই পাঠালাম। নইলে টাকা দিয়েছে বলে কি সিজিটোর কাছে পাঠাতুম নাকি? শয়তানের বাচ্চা হুই সায়েবরা সারুয়ামারুকে বলে দিয়েছে, আনিজার নামে শুয়োর বলি দিতে দেবে না। আচ্ছা, একবার আমাদের বস্তির দিকে আসে যেন তারা।
কে একজন বলল, সায়েবরা বড় বশ করতে পারে। হুই ডাইনি নাকপোলিবার মতো। সায়েবদের কাছে সিজিটো গেল, সারুয়ামারু গেল-বস্তিতে ফিরে ওরা খালি তাদের কথাই বলে। কী মন্তর যে জানে সায়েবরা! সেঙাইটা কোহিমা থেকে আবার সেরকম না হয়ে ফেরে?
সর্দার মাথা নাড়ল, না না, সেঙাই তেমন ছেলে না।
সেঙাই তবে কোহিমা চলে গিয়েছে! বুকটা ধক করে উঠল মেহেলীর। তা হলে সে এখন কী করবে? কী সে করতে পারে? কোনোক্রমেই নিজেদের বস্তিতে আর ফিরতে পারবে না। সাঞ্চামখাবা তার চামড়া উপড়ে নেবার জন্য বর্শাটাকে নিশ্চয়ই শান দিচ্ছে এখন। আচমকা নিজের অজান্তে তার মুখ থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল কথাগুলো, সেঙাই, সেঙাই কবে
আসবে?
পাহাড়ীগুলো পাথরখানার সামনাসামনি এসে পড়েছিল। মানুষের গলা শুনে থমকে দাঁড়াল, কে? কে?
তাদের থাবায় বর্শার ফলাগুলো ঝকমক করে উঠল।
একজন বলল, হুই, হুই যে। পাথরের ওধারে–
পাথরের আড়াল থেকে ভীরু গলায় গুঙিয়ে উঠল মেহলী, আমাকে মারিস না, আমাকে মারিস না। আমি মেহেলী, তোদের বস্তির সেঙাই-এর লাগোয়া লেন্য (প্রেমিকা)।
নিমেষে মেহেলীকে চার কিনার থেকে ঘিরে ধরল কেলুরি গ্রামের জোয়ান ছেলেরা। ওঙলে, পিঙলেই, পিঙকুটাঙ, এমনি অনেকে। বুড়ো সর্দার খাপেগাও রয়েছে তাদের মধ্যে।
সেঙাই আজ চলে গেল কোহিমায়। সঙ্গে গেল সারুয়ামারু। ওঙলেরা মাও-এর পথে এইমাত্র তাদের তুলে দিয়ে গ্রামে ফিরছে।
বুড়ো খাপেগা অবাক বিস্ময়ে বলল, তুই-ই মেহেলী!
হু-হু, সেঙাই-এর লাগোয়া লেন। আমাকে মারিস না তোরা। করুণ চোখে তাকিয়ে রইল মেহেলী।
হো-ও-ও-ও-য়া-য়া–তুমুল হুলস্থূল বাধিয়ে দিল মানুষগুলো।
বুড়ো খাপেগা হুমকে উঠল, থাম শয়তানের বাচ্চারা। তারপরেই মেহেলীর দিকে কোমল চোখে তাকাল, না, তোকে মারব না।
ওঙলে বলল, জেঠা, ওকে নিয়ে চল আমাদের বস্তিতে। সেঙাই কোহিমা থেকে ফিরলে বিয়ে দিয়ে দেব।
কে যেন বলল, বেশ বাগে পেয়ে গেছি।
খোঁচা-খাওয়া বাঘের মতো গর্জে উঠল বুড়ো খাপেগা, কি, বাগে পেয়ে ওকে ধরে নিয়ে বিয়ে দিতে চাস? লুেরি বস্তির ইজ্জত ডুবতে দেব না। হু-হু, তেমন সদ্দার আমি নই। লড়াই করে হুই সালুয়ালাঙ বস্তি থেকে ওকে ছিনিয়ে আনব। তারপর বিয়ে হবে। আমাদের কলিজায় রক্ত নেই? লড়াই করতে আমরা ডরাই নাকি?
ঘোলাটে চোখ দুটো রক্তাভ হয়ে উঠেছে বুড়ো খাপেগার। বুড়ো খাপেগা, কেলুরি গ্রামের অতীতকাল সে। আদিম বীরত্বের প্রতীক। বন্য আর পাহাড়ী মানুষদের দলনেতা। বুড়ো খাপেগা তাকাল মেহেলীর দিকে। বলল, তুই তোদের বস্তিতে ফিরে যা। তোদের সদ্দারকে বলিস, তোকে আমরা ছিনিয়ে এনে সেঙাই-এর সঙ্গে বিয়ে দেব। সে যেন ঠেকায়। সেঙাই-এর ঠাকুরদাকে তোরা মেরেছিস। তোদের পোকরি বংশের নিতিৎসুকে আনতে গিয়ে সেদিন আমরা হেরে গিয়েছিলাম। এবার তোকে আনতে যাব। যা মেহেলী, চলে যা। লড়াই করে না আনলে পাহাড়ী মেয়েমানুষের দাম থাকে না। বাগে পেয়ে বিয়ে করবে, সে আবার কেমন পুরুষ!
ঠিক ঠিক। হু-হু– জোয়ান ছেলেরা চেঁচাতে লাগল, মেহেলীকে আমরা ছিনিয়ে আনব সদ্দার। তুই চলে যা মেহেলী।
মেহেলী আকুল হয়ে উঠল। করুণ হল চোখমুখ। বলল, আমি আমাদের বস্তিতে আর ফিরব না সদ্দার। তুই আমার ধরমবাপ, আমাকে সালুয়ালাঙে যেতে বলিস না।
কেন? কী হয়েছে তোদের বস্তিতে? বিস্মিত গলায় জিগ্যেস করল বুড়ো খাপেগা।
আমি বস্তিতে ফিরলে আমার বাপ ছাল উপড়ে নেবে।
কেন?
আমার সঙ্গে হুই নানকোয়া বস্তির মেজিচিজুঙের বিয়ে ঠিক করেছে আমার বাপ। আমি সেঙাইকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করব না। তাই পালিয়ে এসেছি। কাতর গলায় বলল মেহেলী।
মেজিচিজুঙ! সে তত বাঘ-মানুষ! কী সব্বনাশ! আতঙ্কে ফিসফিস শোনাল বুড়ো খাপেগার গলা, তার সঙ্গে তোকে জুড়ে দিতে চায়!
হু-হু, অনেক বউপণ পাবে কিনা।
একটা আস্ত সাসুমেচু (ভয়ঙ্কর লোভী মানুষ) তো তোর বাপ।
হু-হু, সেই ভয়েই পালিয়ে এসেছি। তোদের বস্তিতে থাকতে দে সদ্দার। নইলে বাপ আমাকে সাবাড় করে ফেলবে। আমি বাপকে বলে এসেছি, সেঙাইকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করব না।
তাই হবে। তুই চল আমাদের বস্তিতে। তোকে ছিনিয়ে নিতে নিশ্চয়ই তোদের বস্তির সদ্দার আর জোয়ানরা আসবে। তখন লড়াই হবে।
