বুড়ো সর্দার রক্তচোখে তাকাল, আমাদের সঙ্গে মিলে হুই কেলুরি বস্তির সঙ্গে লড়াই না করলে কিন্তু মেহেলীর বিয়ে দেব না তোদের বস্তিতে। সিধে কথা।
উঠে দাঁড়াল বুড়ো সর্দার। তার থাবায় খরধার বর্শার ফলায় দুপুরের রোদ ঝকমক করছে। তাকে ভয়ানক দেখাচ্ছে।
.
২২.
বিকেলের দিকে নানকোয়া গ্রামের ছেলে দুটো চলে গিয়েছে। বুড়ো সর্দার আর সালুয়ালা গ্রামের প্রাচীন মানুষগুলোও পোকরি কেসুঙ থেকে বিদায় নিয়েছে। বাইরের ঘরের সামনে যে ভিড় ছিল, তাও ফাঁকা হয়ে গিয়েছে।
সন্ধ্যা হতে দেরি নেই। পশ্চিম পাহাড়ের চূড়ায় ধূসর ছায়া নেমে আসছে।
বাইরের ঘরে এসে ঢুকল মেহেলী আর পলিঙা। সারাদিন তারা উপত্যকায় ঘুরে ঘুরে শুকনো পাতা আর কাঠ কুড়িয়েছে। খবরটা ওরা আগেই পেয়েছে। গ্রামের অন্য একটি মেয়ে এমন মজাদার সংবাদ বেশ রসিয়ে রসিয়েই ওদের দিয়ে এসেছিল।
বুঝলি মেহেলী, নানকোয়া বস্তি থেকে তোর বিয়ের পণ এসেছে।
বিয়ের পণ কেন? চমকে উঠেছিল মেহেলী।
কেন আবার, তোর যে বিয়ে। বিরাট ভোজ হবে। তোের আর কি, এবার ঘরে মরদ পাবি, আমাদের মতো পাহাড়ে পাহাড়ে ছোঁক ছোঁক করতে হবে না। দীর্ঘশ্বাস পড়েছিল যুবতী মেয়েটির। তারপরেই উৎসাহের সুরে বলেছিল, দ্যাখ গিয়ে, তোদের কেসুঙে বস্তির সব লোক জড়ো হয়েছে।
কথাগুলো যেন কানের ওপর গরম চর্বি ঢেলে দিয়েছিল। আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায়নি মেহেলী। সমস্ত শরীরটা, এই পাহাড়ী বন, অস্ফুট ভাবনা–সব যেন অসহ্য হয়ে উঠেছিল। হঠাৎ সামনের টিলায় উঠে গ্রামের দিকে দৌডুতে শুরু করেছিল। তারপেছন পেছন ছায়ার মতো ছুটেছিল পলিঙা। আর সেই দৌড় পোকরি কেঙের বাইরের ঘরে এসে থেমেছিল।
মাচানের ওপর বসে বেশ তারিয়ে তারিয়ে তখন রোহি মধু খাচ্ছিল সাঞ্চামখাবা। মেহেলীকে দেখে হেসে হেসে বলল, এই মেহেলী, তোর বিয়ের পণ এসেছে। হুই নানকোয়া বস্তির মেজিচিজুঙের সঙ্গে তোর বিয়ে।
মেজিচিজুঙ তো বাঘ-মামুষ। আমি হুই শয়তানকে বিয়ে করব না।
কী বললি? হুমকে উঠল সাঞ্চামখাবা। উত্তেজনায় হাতের পিঠে পুরু ঠোঁট দুটো ঘন ঘন মুছতে লাগল।
কী আবার বলব? আমি মেজিচিজুকে বিয়ে করব না। জেদী গলায় মেহেলী বলল।
ওরে ধাড়ী টেফঙ, ইজা হুবুতা! মুখখানা কদাকার করে বিশ্রী গালাগালটা উচ্চারণ করল সাঞ্চামখাবা–নির্বিবাদে এবং নির্দ্বিধায়, আমি বিয়ের পণ নিয়েছি, আর শয়তানী বিয়ে করবে না? তোর বাপ করবে। তুই তো সেদিনকার ছানা রে রামখোর বাচ্চা।
দাঁতমুখ খিঁচিয়ে মেহেলী বলল, আমি হুই কেলুরি বস্তির সেঙাইকে বিয়ে করব। ও আমার পিরিতের জোয়ান।
কান দুটো বিশ্বাসঘাতকতা করছে না তো! বলে কী মেহেলী! বর্শা দিয়ে জিভখানা উপড়ে ফেলবে নাকি মেয়েটার? সাঞ্চামখাবার চোখ দুটো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। মুখ ভেঙচে সে বলল, পিরিতের জোয়ান! সেঙাইকে বিয়ে করবি! ইজা রামখো। আজ হরিণের মতো ছাল ছাড়িয়ে ফেলব তোর—
মাচানের ওপাশ থেকে একটা বর্শা টেনে নিল সাঞ্চামখাবা। খরধার ফলা। সেই ফলায় মৃত্যু ঝিলিক দিয়ে উঠল, কিন্তু বর্শা দিয়ে তাক করার আগেই ঘর থেকে বাইরে লাফিয়ে পড়ল মেহেলী, তার পেছনে পলিঙাও।
চারিদিকের বাড়িঘর এবং গাছপালার মাথায় তখনও ফিকে সোনালি রং লেগে আছে। সামনের জঙ্গলে অদৃশ্য হল দু’টি যুবতী।
টিজু নদীর কিনারায় এসে পলিঙা বলল, এবার কী করবি মেহেলী?
কী আর করব, সেঙাইকে খুঁজে বার করতে হবে। কত বার এখানে এসে ঘুরে গেছি। ওর দেখা পাইনি। কী হয়েছে, বুঝতেই পারছি না।
অনেকদিন সেঙাই এদিকে আসে না। বস্তিতে ফিরে আর কোনো জোয়ানীর সঙ্গে পিরিত জমিয়ে বসল না তো? পাহাড়ী জোয়ানের মন বোঝা দায় মেহেলী। যখন যে মাগীর গন্ধ পায়, তখন তার কথাই বলে। তোকে ভুলে গেল না তো সেঙাই? পলিঙর দুচোখে কৌতুক ঝিকমিক করছে।
বুকটা ছাঁত করে উঠল মেহেলীর। তাই তো, পাহাড়ী পুরুষের স্মৃতি। তার স্থায়িত্ব কতখানি? সে তো ঘাসের ফলায় শিশিরের আয়ু। কেলুরি গ্রামেও অনেক কুমারী মেয়ে সুঠাম দেহের রূপ মেলে পুরুষের চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায়, বিভ্রম ছড়ায়। সেই পার্বতী যুবতীদের কেউ কি ডাইনি নাকপোলিবার মন্ত্রপড়া শিকড় দিয়ে বশ করল সেঙাইকে?
কাঁপা গলায় মেহেলী বলল, ওপারে গিয়ে একবার দেখে আসি। সেঙাইর কাছে না পালালে বাপ আমাকে ঠিক খুন করে ফেলবে। একেবারে খতম। সর্দারও বস্তিতে টিকতে দেবে না। তুই একটু দাঁড়া এখানে। আমি কিছুতেই মেজিচিজুঙকে বিয়ে করব না।
পলিঙা বলল, সাবধানে যাবি। ওরা কিন্তু আমাদের বস্তির শত্তুর।
টিজু নদী পেরিয়ে সেই নিঃশব্দ ঝরনাটার পাশে এসে দাঁড়াল মেহেলী। কেউ কোথাও নেই। মনে পড়ল, এখানেই তার সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল সেঙাই-এর। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল মেহেলী। ঘন বনের ফাঁক দিয়ে যখন জাফরিকাটা বোদ মিলিয়ে গেল, ঠিক তখনই কেলুরি বস্তির দিকে সে পা চালিয়ে দিল।
কর্তব্য স্থির হয়ে গিয়েছে। যেমন করে হোক, সেঙাই-এর সঙ্গে আজ দেখা করতেই হবে। সাঞ্চামখাবার বর্শার খরধার ফলা থেকে, মেজিচিজুঙের বিয়ের বাঁধন থেকে উধ্বশ্বাসে সে পালিয়ে এসেছে সেঙাই-এর আশ্রয়ের আশায়। সেঙাইকে নিয়ে দূর পাহাড়ের উপত্যকায় ঘর বাঁধবে। তার দু’টি বাহুর বেষ্টনীতে মেহেলী এই মুহূর্তে নিরাপদ শান্তি আর স্বস্তি কল্পনা করল। তার জীবনে সেঙাইকে বড় প্রয়োজন, একান্তভাবে সেঙাইকে তার চাই।
