প্রশ্নগুলো শুনে বুড়ো সর্দারের ঘন ভুরুজোড়া কয়েক মুহূর্ত কঁকড়াবিছার মতো কুঁকড়ে রইল। আচমকা কালকের কথা মনে পড়ল। সকলের অগোচরে পাদ্রীসাহেবের লোকটা তার থাবায় অনেকগুলো রুপোর মুদ্রা গুঁজে দিয়ে গিয়েছিল, আর লাল রঙের একটা কাপড় দিয়েছিল। টাকার মহিমা জানে বৈকি বুড়ো সর্দার। এর আগেও অনেকবার কোহিমা আর মাও শহরে গিয়েছে সে।
পাদ্রীসাহেবের লোক। নামটা ভুলে গিয়েছে বুড়ো সর্দার। তবে মানুষটা তাদেরই মত পাহাড়ী। তাদেরই মতো তার চোখের মণি পিঙ্গল। কিন্তু পরনে সাহেবদের মতো সাদা কাপড়। হুসিঙ পাখির পালকের মতো ধবধবে। কাপড়টার নামও কী যেন বলেছিল লোকটা। সারপ্লিস শব্দটি বেমালুম ভুলে গিয়েছে বুড়ো সর্দার।
সাহেব পাদ্রীর সঙ্গী ছিল। তাদের দেশেরই পাহাড়ী পাদ্রী। বুনো সাহেব। সেই মানুষটা ফিসফিস করে বলেছিল, তোকে একবার কোহিমা যেতে হবে, ফাদার যেতে বলেছে। আরো টাকা পাবি, কাপড় পাবি, নিমক পাবি। লবণ জলের ঝরনার জল আর টক আপুফু ফল গিলে মরতে হবে না। আরো কী কী পাবি, এখন বলছি না।
টাকা! কাপড়! নিমক! শুনতে শুনতে বুড়ো সর্দার বিচলিত হয়ে পড়েছিল। বলা যায়, একেবারে ডগমগ হয়ে উঠেছিল। শব্দ তিনটে বার বার উলটে পালটে অস্ফুট গলায় উচ্চারণ করেছিল সে। জড়িত স্বরে শুধু বলতে পেরেছিল, যাব, নিশ্চয়ই যাব।
ইতিমধ্যে মানুষগুলো আবার অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে, কি রে সদ্দার, বলছিস না কেন? দিয়ে গেছে টাকা? কাপড় দিয়েছে?
একটু চমকে উঠল বুড়ো সর্দার। পাহাড়ী মানুষ। মিথ্যাচার করতে বিবেক ঠিক সায় দিয়েও দিচ্ছে না। তবু মুহূর্তের মধ্যে কর্তব্য স্থির করে ফেলল সে। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল, না রে শয়তানের বাচ্চারা। টাকা দিয়ে কী করবি? টাকা দিয়ে কী হয় জানিস? কোহিমা মোককচঙে কোনোদিন গেছিস টেফঙের ছায়েরা?
বুড়ো সর্দার আর মেহেলীর মামা ছাড়া সালুয়ালা গ্রামের অন্য কেউ শহরে যায় নি। টাকা দিয়ে কী নিদারুণ ভোজবাজি, কী অসম্ভব ভেলকি দেখানো যায়, তা তারা কেউ জানে না। শুধু হইচই করে উঠল পাহাড়ী মানুষগুলো, হু-হু, টাকা দিয়ে আবার কী হবে? দেওয়ালের খুঁটি ফুটো করে তার ভেতর রাখব। না হলে সিঁড়িখেতে পুঁতে দেব। সায়েব বলেছিল, টাকা হল আউই ভু (জমির উর্বরতার জন্য ভাগ্য-পাথর)। জমিতে পুঁতে দিলে সার ভালো হবে। জোয়ার ফলবে অনেক। অনেক ধান হবে।
হু-হু। শুকনো তামাকপাতার মতো হেজে যাওয়া মাথাখানা দোলাল বুড়ো সর্দার, সায়েবের লোক এসেছিল। সায়েব আমাকে কোহিমা যেতে বলেছে। টাকাকড়ি কিছু দেয়নি।
আচমকা বাইরের ঘরের সামনে আলোড়ন দেখা দিল। বুনো মোষের মতো জমায়েতটাকে ছত্রখান করে, ধাক্কা মেরে, গুতো দিয়ে, ঝড়ের বেগে একটা জোয়ান ছেলে এগিয়ে এল। রীতিমতো হাঁফাচ্ছে সে, সারা দেহ উত্তেজনায় কাঁপছে। ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে।
বাইরের চত্বরে চিৎকার শুরু করে দিয়েছে মানুষগুলো। ঠাসবুনন ভিড়ের মধ্যে পথ করে নিতে গিয়ে জোয়ান ছেলেটার ধাক্কায় কেউ পাথরে ছিটকে পড়ে মাথা ফাটিয়ে ফেলেছে। কেউ কেউ আছড়ে পড়েছে মাটির ওপর।
উত্তেজিত গলায় জোয়ানটা বলল, সব্বনাশ হয়ে গেছে সদ্দার—
কী ব্যাপার? কী হয়েছে রে ইমটিটামজাক? বুড়ো সর্দার ভুরু কুঁচকে তাকাল।
টিজু নদীর হুই দিকে সেঙাইকে দেখে এলুম। শিকারে বেরিয়েছে। কেলুরি বস্তির আরো অনেক লোক রয়েছে তার সঙ্গে। সমানে হাঁপিয়ে চলেছে ইমটিটামজাক।
বলিস কী! সকলে চমকে উঠল।
বিস্ময়ের সুরে বুড়ো সর্দার বলল, সে কী! সেদিন তো সেঙাইকে পুড়িয়ে মারলুম!
সেঙাইকে পুড়িয়েছিস! হুই সালুনারু শয়তানী ভুল খবর দিয়েছিল। আহে ভু টেলো। কুৎসিত মুখভঙ্গি করে বলল ইমটিটামজাক।
সালুনারুকে আমি বর্শা দিয়ে ফুড়ব। ওর মুণ্ডু মোরাঙে ঝুলিয়ে রাখব। বর্শা বাগিয়ে লাফিয়ে উঠল বুড়ো সর্দার।
আর ঠিক সেই সময় বাইরের ভিড় থেকে একটা নগ্ন নারীমূর্তি সামনের ঘন জঙ্গলে দৌড়ে পালাল।
সঙ্গে সঙ্গে শোরগোল উঠল, সালুনারু পালাল, পালাল।
টেমে নটুঙ। একটা কদর্য গালাগালি আউড়ে আবার পাথরখানার ওপর বসে পড়ল বুড়ো সর্দার, কেলুরি বস্তির হুই সালুনারু মাগীকে আমাদের বস্তিতে দেখলে টুকরো টুকরো করে কাটব।
হঠাৎ সাঞ্চামখাবা বলল, সেসব পরে হবে। এখন পণ নিয়ে নিই সদ্দার, কী বলিস তুই?
হু-হু। সায় দিল বুড়ো সর্দার। তারপর তাকাল নানকোয়া গ্রামের জোয়ান ছেলে দুটোর দিকে। বলল, তোদের সঙ্গে তো কুটুম্বিতে হচ্ছে। মেহেলীকে বিয়ে করবে তোদের মেজিচিজুঙ।
হু-হু। একসঙ্গে মাথা দোলাল জোয়ান দুটো।
তোরা আমাদের বন্ধু হবি, কুটুম হবি।
হু-হু–
বুঝলি, হুই কেলুরি বস্তিকে শায়েস্তা করতে হবে। ওরা আমাদের শত্রুর। বুড়ো সর্দার বাইরের ঘর থেকে আঙুল বাড়িয়ে দিল টিজু নদীর ওপারে কেলুরি গ্রামের দিকে।
হু-হু–
সর্দার গর্জে উঠল, হুই বস্তি থেকে চর রেখেছে সালুনারুকে। মাগীর মুণ্ডু ছিঁড়ে মোরাঙের সামনে গেঁথে রাখব। একটু দম নিয়ে আবার বলল, তোরা যখন আমাদের বন্ধু, আমাদের সঙ্গে একজোট হবি।
কেন?
কেন আবার। ওদের সঙ্গে যদি লড়াই বাধে, তখন লোকের দরকার হবে। সেই জন্যে আমাদের একজোট হতে হবে।
হু-হু। মাথা ঝকাল জোয়ান দুটো। বলল, আমাদের সদ্দারকে সে কথা বলতে হবে। সে বললে আমরা জান দিতে পারি। না বললে কিন্তু কিছুই করব না।
