সমস্ত সালুয়ালাঙ গ্রামখানা পোকরি কেসূঙটার চারপাশে ভেঙে পড়েছে। সাঞ্চামখাবার বাইরের ঘরে একখানা তিনকোনা পাথরে থেবড়ে বসেছে গ্রামের বুড়ো সর্দার। সালুয়ালাঙ গ্রামের সমস্ত বংশের প্রাচীন মানুষগুলো পাশাপাশি ঘন হয়ে বসেছে। তাদের সামনেও পীতা মধুর ভরা পাত্র, পাখির মাংসের কাবাব।
এখন নসু কেহেঙ মাসের দুপুর। নিঃসীম আকাশটা পুড়ে পুড়ে যাচ্ছে যেন। দুপুর জ্বলছে, কিন্তু এই পাহাড়ী পৃথিবীর রোদে জ্বালা নেই। স্নিগ্ধ মমতায় এই রোদ মনোরম, বড় আমেজ।
বুড়ো সর্দার বলল, তোরা তো সব নানকোয়া বস্তি থেকে এলি, তাই না?
জোয়ান ছেলে দুটো মাথা নাড়ল, হু-হু।
তা টেনেন্য মিঙ্গেলু (বউপণ) ঠিকমতো এনেছিস?
না, সবটা আনিনি। আজ মেয়ের জন্যে খানিকটা বায়না দিয়ে যাব। কাল সন্ধের সময় মেজিচিজুঙের পিসি আসবে। সে-ই টেকোয়েঙ কেজি (ঘটকী)। সে এসে বিয়ের ব্যবস্থা পাকাপাকি করেগেলে বাকি পণ দিয়ে যাব। পাখির মাংসের কাবাবে লুব্ধ কামড় দিয়ে একটা জোয়ান ছেলে বলল।
সহসা বিমর্ষ গলায় বুড়ো সর্দার বলল, আমার মেয়ে লিজোমুটার বিয়ে হয়ে যেত অ্যাদ্দিনে। জুকুসিমা বস্তি থেকে তার জন্যেও তো বউপণ এসেছিল।
হু-হু– কাবাবে লাল লাল দাঁতের কামড় বসাতে বসাতে, কি রোহি মধু গিলতে গিলতে প্রাচীন মানুষগুলো মাথা দোলাতে লাগল, হু-হু, তা হত।
বুড়ো সর্দারের বিষাদ তাদেরও যেন এই মুহূর্তে স্পর্শ করেছে।
নানকোয়া গ্রামের একটা জোয়ান বলল, কী হল তোর মেয়ের, কি রে সদার? ছেলেটার চোখমুখ আগ্রহে ঝকমক করছে।
কী যে হল, কিছুই জানি না। কেলুরি বস্তির সেঙাইকে যেদিন পোড়াই সেদিন থেকেই মেয়েটা নিখোঁজ। বাঘের পেটে গেল, না রেনজু আনিজা খাদে ফেল মারল, নাকি বুনো মোষ শিঙ দিয়ে ফুড়ে সাবাড় করল, জানতেই পারলাম না। হুই কেলুরি বস্তির শত্তুররাই বর্শা দিয়ে ফুঁড়ল কিনা তা-ই বা কে জানে। একটা অসহায় দীর্ঘশ্বাস পড়ল বুড়ো সর্দারের।
খানিকক্ষণ চুপচাপ। সাঞ্চামখাবার এই ছোট বাইরের ঘরটা একেবারে স্তব্ধ হয়ে রইল।
একটু পরে আবার বুড়ো সর্দার বলল, যেতে দে, যেতে দে ওসব। পাহাড়ী মানুষ আমরা। এমন করেই আমাদের জান সাবাড় হয়।
হু-হু। নানাকোয়া গ্রামের জোয়ান দুটো চেঁচামেচি করে সায় দিল।
বুড়ো সর্দার তাকাল সাঞ্চামখাবার দিকে, কি রে, মেহেলীর মামা কই? তাকে খারে বর্শা দেবে ওরা। নইলে যে ছেলেপুলে হবে না মেহেলীর।
সে তো নিমক আনতে মোককচঙ গিয়েছে। নিরুপায় গলায় বলল সাঞ্চামখাবা, তা হলে কী হবে সদ্দার?
কী আবার হবে। সে আসবে কবে?
তার কিছু ঠিক নেই।
তবে তোর নিজের খারে বর্শা দুটো নিয়ে নে।
পাহাড়ী মানুষগুলোর মধ্যে বিয়ের আগে একটি প্রথা আছে। সে প্রথাটি হল, পাত্রপক্ষ থেকে বউপণ হিসেবে দু’টি করে খারে বর্শা মেয়ের বাপ আর বড় মামাকে দিতে হয়। বড় মামা এই খারে বর্শা না পেলে, এদের বিশ্বাস, বিবাহিতা মেয়ের সন্তানের সম্ভাবনা থাকে না। অবশেষে অবৎসা নারী ডাইনি হয়।
হাত বাড়িয়ে দুটো খারে বর্শা নিয়ে নিল সাঞ্চামখাবা। অনেক দিনের পুরনো। বউপণের জন্যই এই বর্শাগুলোর প্রচলন। এগুলোকে শান দেওয়া হয় না, অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা হয় না। পরম আদরে বাঁশের খাপের মধ্যে ভরে রাখা হয়। বিয়ে ছাড়া অন্য সময় এগুলো ছোঁয়া পর্যন্ত হয় না। তাই বর্শার ফলায় লালচে জং ধরে গিয়েছে।
খারে বর্শার ফলা দুটো নিয়ে সাঞ্চামখাবা বলল, তা হলে সদ্দার, মেহেলীর মামার কী হবে?
মোককচঙে কাউকে দিয়ে খবর পাঠা। আর শোন, তোদের একটা কথা বলতে ভুলে গেছিলাম। বুড়ো সর্দার বাইরের দিকে তাকাল।
কেসুঙের সামনে সমস্ত সালুয়ালা গ্রামখানা জটলা পাকাচ্ছে। সর্দারের ডাকে একটা ঠাসবুনট ভিড় দরজার কাছে ঘন হয়ে এল, কি সদ্দার, কী বলছিস?
সেদিন সায়েবরা এসেছিল, মনে আছে?
হু-হু। সায়েবরা কত ভালো! টাকা দিয়েছে। কাপড় দিয়েছে। ভালো ভালো খাবার দিয়েছে। সালুয়ালা গ্রামের মেয়েপুরুষ একসঙ্গে শোরগোল করে উঠল।
যীশু, যীশু। মেরী, মেরী–পাহাড়ী গ্রামটা মেতে উঠতে লাগল।
দিনকয়েক আগে সালুয়ালা গ্রামে দুজন পাদ্রী এসেছিল। তারা পাহাড়ী মানুষগুলোর মধ্যে অনেক টাকা, নানা রঙের নানা আকারের বাহারি কাপড়-জামা বিলিয়ে গিয়েছে। আর সেই সঙ্গে ছড়িয়ে গিয়েছে এক অপূর্ব জ্ঞানের আলো। বেথেলহেমের এক অনির্বাণ নক্ষত্রকে এই ছোট্ট পাহাড়ী জনপদ সালুয়ালাঙের আকাশে চিরস্থায়ী করে রাখার সব রকম বন্দোবস্ত করে। গিয়েছে। কোনো দিকে বিন্দুমাত্র ত্রুটি হয়নি। যীশু! এই নামটিকে আদিম পাহাড়ী মানুষগুলির হাড়ে হাড়ে উৎকীর্ণ করতে চেয়েছে পাদ্রী সাহেবরা। সকলের কানে কানে একটি অমোঘ মন্ত্র দিয়েছে। সে মন্ত্রের নাম যীশু। সকলের আঙুলের ডগায় ক্রস আঁকার কায়দা শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছে।
পাহাড়ী মানুষগুলোর কেউ কেউ দুই বাহুসন্ধি, বুক আর কপাল আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে ক্রস আঁকতে লাগল।
বুড়ো সর্দার বলল, কাল সায়েবের লোক এসেছিল আমাদের বস্তিতে।
কই, আমরা তো জানি না। সকলে তারস্বরে চেঁচামেচি শুরু করে দিল।
তোরা তখন সিঁড়িখেতে গিয়েছিলি।
সায়েবরা আরো টাকা দিয়েছে? সুন্দর সুন্দর কাপড় দিয়ে গেছে আমাদের জন্যে, কি রে সর্দার? বলতে বলতে জনকয়েক ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল।
