আচ্ছা, আচ্ছা। এবার কোহিমার গল্প বল সারুয়ামারু। একখানা বাদামি রঙের পাথরের ওপর জাঁকিয়ে বসল বুড়ো খাপেগা। আর জোহেরি কেসুঙের চত্বরে হুটোপাটি করতে করতে বসে পড়ল কেলুরি গ্রামের বাকি মানুষগুলো।
সারুয়ামারু বলল, জানিস সদ্দার, একটা ভারি ভালো মেয়ে বেরিয়েছে কোহিমাতে। আমি তাকে দেখেছি। সে আমাদের পাহাড়েরই মেয়ে।
কী নাম তার?
গাইডিলিও। সুন্দর দেখতে, বড় বড় চোখ। রূপময়ী এক পাহাড়ী নারীর বর্ণনা দিল সারুয়ামারু।
ভালো যে, বুঝলি কী করে?
তার চারপাশে সারা নাগা পাহাড়টা ভিড় জমিয়েছে। সে যাকে ছোঁয় তার রোগ ভালো হয়ে যায়। লোটা নাগারা, সাঙটামরা, সেমারা, কোনিয়াকরা–সব জাতের মানুষই তার ভক্ত হয়েছে।
বলিস কী! সবিস্ময়ে বলল বুড়ো খাপেগা।
সত্যি কথা। একটুও মিথ্যে নয়। সেঙাই-এর বাপ সিজিটোও গাইডিলিওকে দেখেছে। তাকে জিগ্যেস করে দেখিস।
সে ছুঁয়ে দিলে রোগ সেরে যায়! বলিস কী!
হু-হু। সবাই তাকে রানী বলে। জোয়ান মেয়ে, ষোল বছর বয়েস হবে।
আচমকা সেঙাই উঠে দাঁড়াল। বলল, আমি কোহিমা যাব সারুয়ামারু। তুই আমাকে নিয়ে যাবি? রানী গাইডিলিওকে দেখব।
হু-হু, যাবি। তোর বাসভাড়ার টাকা তো দিয়েই দিয়েছে সিজিটো। সারুয়ামারু বলে চলল, কোহিমা কী সুন্দর শহর। এই বস্তি ছেড়ে তোরা তো কোথাও যাবি না। গাড়ি দেখবি–
গাড়ি? সে আবার কী?
রহস্যময় গলায় সারুয়ামারু বলল, আমার সঙ্গে কোহিমা চল আগে। তোকে সব দেখাব। গাড়ি দেখবি, পাকা বাড়ি দেখবি। আরো কত কী দেখবি।
দুপুরের রোদ তীব্র হচ্ছে, তীক্ষ্ণ হচ্ছে। নসু কেহেঙ মাসের এই দুপুরে সিঁড়িখেতে ছোট ছোট বাঁশের ঘর থেকে ফসলের তামাটে অঙ্কুর পাহারা দেয় পাহাড়ী মানুষগুলো। দুষ্ট আনিজার দৃষ্টি থেকে, বুনো মোষের দাপাদাপি থেকে সিঁড়িখেত রক্ষা করতে হয়। সকলে এক এক করে উঠে পড়ল। যাবার আগে সারুয়ামারুর কাছে তারা রানী গাইডিলিওর গল্প শুনল। শুনতে শুনতে বিস্মিত হল। কখনও বা মুগ্ধ। অপরূপ রূপকথার মতো এক কাহিনি, যার নায়িকা গাইডিলিও স্বয়ং। তার ছোঁয়ায় পুনর্জন্ম হয়। তার নির্দেশে জরামৃত্যু ফেরারি হয়। গাইডিলিওর কাহিনি বাদ দিয়েও আর একটা অপূর্ব বস্তু তাদের চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সেটা একটা রুপোর মুদ্রা। বুড়ো খাপেগার সঙ্গে সায় দিয়ে তারা যতই সারুয়ামারুর বিপক্ষে চেঁচাক, যতই হল্লা করুক, তবু টাকার কথা ভুলতে পারছে না। রানী গাইডিলিও আর টাকাটা অনেকদিন তাদের বিস্ময় আর আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।
খানিক পরে সকলে জোহেরি কেসুঙ থেকে চলে গেল।
সামনের কালো পাথরখানায় উঠে এল সেঙাই আর সারুয়ামারু। সেঙাই বলল, কোহিমা গেলে টাকা পাব তো? ঠিক বলছিস?
হু-হু, নিশ্চয়ই পাবি। তোকে তো আগেই বলেছি। ঘন ঘন মাথা ঝাঁকাতে লাগল সারুয়ামারু। ফিসফিস করে বলল, দেখলি সদ্দারটা কেমন শয়তান! ফাদারকে কিছুতেই আসতে দেবে না। আচ্ছা, আমিও দেখে নেব। যখন বন্দুক নিয়ে ফাদাররা আসবে তখন কী করে সদ্দার শয়তানটা তাদের ঠেকায়, আমিও দেখব। শেষ কথাগুলো এত আস্তে বলল যে সেঙাই শুনতে পেল না।
সারুয়ামারুর কথাগুলোর দিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই সেঙাই-এর। তার সমস্ত ভাবনাকে ভরে রেখেছে দুটো অভিনব বস্তু। একটি রুপোর টাকা, অপরটি রানী গাইডিলিওর গল্প। অন্যমনস্কের মতো সেঙাই বলল, রানী গাইডিলিওকে দেখাবি তো?
দেখাব। এতক্ষণ বিড় বিড় করছিল সারুয়ামারু, এবার সোজাসুজি তাকাল, তুই কোথায় যাবি সেঙাই? আমি কিন্তু এবার আমাদের কেসুঙে ফিরব। শরীরটা বড় খারাপ লাগছে।
দাঁতমুখ খিঁচিয়ে উঠল সেঙাই, যা যা। আমি সব বুঝি। বউয়ের কাছে না গেলে আরাম হচ্ছে না। শরীর খারাপ, অথচ বউয়ের সঙ্গে ফুর্তি তো থামাচ্ছিস না। কোহিমা থেকে ফিরেই ঘরে ঢুকেছিস। অন্য দিকে তোর মন আছে? তুই একটা আস্ত শয়তান। ভাবলাম, গাইডিলিওর কথা ভালো করে শুনব। তা না
রাত্তিরে মোরাঙে বসে গল্প বলব। তখন শুনিস। আর দাঁড়াল না সারুয়ামারু। লম্বা লম্বা পা ফেলে জোরি কেসুঙের দিকে চলে গেল।
আর কালো পাথরখানার ওপর দাঁড়িয়ে এক নজরে সারুয়ামারুর গমনপথের দিকে তাকিয়ে রইল সেঙাই। গাইডিলিও সম্বন্ধে তার কৌতূহল মেটেনি। তার আগ্রহটা উদগ্র হয়ে রইল।
.
২১.
টেনেন্যু মিঙ্গেলু। বউপণ। সেই বউপণ এসেছে নানকোয়া গ্রাম থেকে। পাঠিয়েছে মেজিচিজুঙের বাপ রাঙসুঙ। দুটো জোয়ান ছেলে এসেছিল রেঙমাপানি নদীর ওপারে মাঝারি আকারের গ্রাম নানকোয়া থেকে। সঙ্গে চারখানা খারে বর্শা। অতিকায়। সেগুলোর গড়নের মধ্যে অতীতের ছাপ রয়েছে, প্রাচীনত্বের সুস্পষ্ট চিহ্ন ফুটে আছে। আর যৌতুক হিসেবে এসেছে কড়ির গয়না, কানের নীয়েঙ দুল, হাতির দাঁতের হার। মোষের শিঙের মুকুট, যার দু’পাশে হরিণের শিঙের বাহার। পেতলের গলাবন্ধ। আটর ফুলের সাজসজ্জা আর সাধারণ গড়নের পঞ্চাশখানা বর্শা।
সকালবেলা জোয়ান ছেলে দুটো এসে পৌঁছেছিল। মেহেলীর বাপ সাঞ্চামখাবা আদর করে, তোয়াজ করে, তাদের নিয়ে বসিয়েছে বাইরের ঘরে। টাটকা চোলাই পীতা মধু দিয়েছে বাঁশের পানপাত্র ভরে, চাকভাঙা সোনালি মধু দিয়েছে। হুন্টসিঙ পাখির মাংস দিয়ে কাবাব বানিয়ে সাজিয়ে দিয়েছে কাঠের বাসনে। জোয়ান ছেলে দুটো বেশ তরিবত করে কাবাব চিবুচ্ছে। তারিয়ে তারিয়ে পীতা মধুর পাত্রে চুমুক দিচ্ছে একজন। আর একজন সোনালি মধু চুক চুক করে জিভ দিয়ে টেনে নিচ্ছে।
