আশ্চর্য আকর্ষণ। হাতখানা বাড়িয়ে টাকাটা নিয়ে নিল সেঙাই। ফিসফিস গলায় বলে উঠল, এটা দিয়ে কী হয়?
কী না হয় বল? এটা দিলে সব কিছু পাওয়া যায়। অত্যন্ত বিজ্ঞ বিজ্ঞ দেখাচ্ছে এবার সারুয়ামারুকে, কোহিমা শহরে যখন যাবি তখন দেখবি কী হয় এটা দিয়ে। কালই তুই চলে যা কোহিমা। তোর বাপ তোর জন্যে কাজ ঠিক করে রেখেছে।
কাজ! কিসের কাজ?
বেত কাটার কাজ। নাগিনীমারা যেতে হবে। এবার তো আর সিঁড়িখেতে জোয়ারের বীজ বুনিসনি। ডিমাপুর হয়ে নাগিনীমারা যাবি। আমিও যাব। দোইয়াঙ আর রেঙমাপানির ওধারের বস্তিগুলো থেকেও অনেক পাহাড়ী যাবে।
নাগিনীমারা! ডিমাপুর! বিচিত্র সব নাম, বিচিত্র সব দেশ। এই রুপোলি মুদ্রার মতোই ওই নামগুলো সেঙাই কি বুড়ি বেঙসানুর অজানা। ছয় আকাশ, ছয় পাহাড় ডিঙিয়ে কোথায় কোন সুদূর দিগন্তে ওই নামের দেশগুলো পড়ে রয়েছে সে খবরও তাদের জানা নেই। শুধু এক দুর্নিবার কৌতূহল, এক দুর্বোধ্য আকর্ষণ সেঙাই-এর সমস্ত চেতনাকে আচ্ছন্ন করে তুলল। ডিমাপুর! নাগিনীমারা! কতদূর! কোথায় সেই সব দেশ?
হতবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল সেঙাই। শুধু হাতের পাতায় রুপোলি মুদ্রাটা ঝকঝকে রোদে ঝিকমিক করছে।
সেঙাই আবিষ্ট গলায় বলল, কাজ করে এই টাকা পাওয়া যাবে?
হু-হু, অনেক পাওয়া যাবে। তোর বাপ ফাদারের কাজ করে অনেক টাকা পায়। তুইও পাবি। সারুয়ামারু আলোক দান করে চলল।
ইতিমধ্যে সমস্ত কেলুরি গ্রামখানা জমায়েত হয়েছে জোহেরি কেমুঙে। সারুয়ামারু, বুড়ি বেঙসানু আর সেঙাইর চারপাশে নিবিড় হয়ে দাঁড়িয়েছে সকলে।
ছোট্ট পাহাড়ী জনপদ কেলুরিতে এই প্রথম রুপোর টাকার আর্বিভাব। বিস্ময়ে ভয়ে সব মেয়েপুরুষ সেঙাই-এর মুঠির দিকে তাকিয়ে রয়েছে। একসময় সেঙাইর থাবা থেকে ছোঁ মেরে টাকাটা তুলে নিল একজন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সন্ধানী দৃষ্টিতে দেখতে লাগল। তার মুঠি থেকে আর একজন ছিনিয়ে নিল। তার মুঠি থেকে অন্য একজন নিল। এই প্রক্রিয়ায় টাকাটা মেয়েপুরুষের জটলায় হাতে হাতে ঘুরতে লাগল। টাকার এই প্রথম আগমনকে বিস্ময় আর কৌতূহল দিয়ে অভ্যর্থনা জানালো কেলুরি গ্রামের মানুষেরা।
একসঙ্গে সকলে বলে উঠল, আমরা টাকা পাব?
হু-হু, পাবি। ফাদারকে নিয়ে আসব বস্তিতে। ফাদার এখানে আসতে চেয়েছে। সে এলে তোরা তাকে টাকার কথা বলবি। সকলের মুখের ওপর দিয়ে দৃষ্টিটাকে পাক খাইয়ে নিয়ে গেল সারুয়ামারু। ফিসফিস গলায় বলল, ফাদার এলে তোরা খুশি হবি তো? কেউ বর্শা দিয়ে খুঁড়বি না?
সকলে মুখ চাওয়াচাওয়ি শুরু করল। একটু ভেবে দ্বিধাভরা গলায় বলল, আমরা কি জানি, সদ্দারকে জিজ্ঞেস কর তুই।
সদ্দার আর সদ্দার! সারুয়ামারুর লাল লাল দাঁতগুলো কড়মড় করে উঠল, সদ্দার তোদের টাকা দেবে? জানিস, টাকা দিলে সব মেলে। দুনিয়ার সব কিছু পাওয়া যায়। নিমক পাওয়া যায়, ধান পাওয়া যায়, গাড়ি চড়া যায়। যা চাস তাই পাবি।
সব পাওয়া যায়! কে যেন বলে উঠল।
মানুষগুলো হতবাক হয়ে গিয়েছে। বলে কী সারুয়ামারু! ওই সাদা সাদা গোলাকার বস্তুগুলির এত মহিমা তা কি তারা জানত!
আচমকা মানুষগুলো হল্লা শুরু করে দিল, হুই তো সদ্দার, হুই তো সদ্দার এসেছে।
জোরি কেসুঙের সামনে কালো একখানা পাথর খাড়া হয়ে উঠে গিয়েছে। সেটা ডিঙিয়ে জোহেরি কেসুঙে চলে এল বুড়ো খাপেগা।
কি রে, কী ব্যাপার? হুল্লা করছিস কেন? আরে সারুয়ামারু যে! এসেছিস কখন? কোহিমার গল্প বল শুনি। এদিক সেদিক তাকাতে লাগল বুড়ো খাপেগা।
চারপাশের মানুষগুলো সমানে চিৎকার করতে লাগল, সদ্দার, টাকা টাকা
টাকা এনেছে সারুয়ামারু। টাকা এনেছে।
কই দেখি–সেঙাই-এর হাত থেকে টাকাটা তুলে বিস্মিত দৃষ্টিতে দেখতে লাগল বুড়ো খাপেগা। বলল, এ দিয়ে কী হয়?
টাকার মহিমা সম্বন্ধে সারুয়ামারু আর-একবার আলোক দান করল। বলল, জানিস সদ্দার, ফাদার আমাদের বস্তিতে আসবে বলেছে। অনেক টাকা দেবে। তুই বললে তাকে নিয়ে আসব।
সন্দিগ্ধ চোখে তাকাল বুড়ো খাপেগা, টাকার বদলা কী দিতে হবে?
কিছুই না। খালি যীশু যীশু বলতে হবে। দুকাঁধে, কপালে আর বুকে আঙুল ঠেকাতে হবে। আনিজার নামে শুয়োর বলি দিতে পারবি না ।
সারুয়ামারুর গলা মাঝপথে থেমে গেল। কেলুরি গ্রামের খাপেগা সর্দার হঠাৎ গর্জন করে উঠল। ঘোলাটে চোখদুটো আগ্নেয় হয়ে উঠেছে, কী বললি শয়তানের বাচ্চা! শুয়োর বলি বন্ধ করতে হবে? একেবারে বর্শা দিয়ে ফুঁড়ে ফেলব না! তোর ফাদার বস্তিতে এলে আর জান নিয়ে ফিরতে হবে না। হুই সব বুকে কপালে কাঁধে আমরা হাত ঠেকাতে পারব না।
সারুয়ামারু চমকে উঠেছে। অপরিসীম ভয়ে মনটা কুঁকড়ে গিয়েছে তার, আচ্ছা, ফাদারকে আসতে বলব না। তুই যখন চাস না তখন কী আর করা।
খবদ্দার, তোর ফাদার যেন এ বস্তিতে না আসে। আমাদের টাকা চাই না।
আচ্ছা।কাঁপা গলায় বলল সারুয়ামারু। কিন্তু তার চোখ দুটো ভয়ানক ক্রুর হয়ে উঠেছে।
টাকা চাই না, টাকা চাই না। পাহাড়ী মানুষগুলো একটানা শোরগোল করতে লাগল, হো-ও-ও-ও-য়া-য়া–
একসময় বুড়ো খাপেগা বলল, নিমক এনেছিস কোহিমা থেকে?
সারুয়ামারু গোলাকার কামানো মাথা ঝাঁকাল, হু, আমার ঘরে আছে। সবাই নিয়ে যাস। এবার নিমকের দর খুব চড়া। মাধোলাল এক খুদি নিমকের বদলা এক খুদি কস্তুরী নিয়েছে কিন্তু।
