এমন সময় সেঙাই এল।
ঠাকুমা, এই ঠাকুমা–
কে? সেঙাই এসেছিস–আয়। মোরাঙে মেয়েদের ঢুকতে দেয় না, তাই তোকে দেখতে যাই না। কেমন আছিস? ভালো তো? ঘুরে বসল বুড়ি বেঙসানু।
সেঙাই-এর সাড়া পেয়ে ফাসাও আর নজলি বাইরের ঘর থেকে ছুটে এসেছে। ঝাঁপিয়ে পড়েছে বড় ভাইয়ের ঘাড়ে।
সেঙাই বলল, মা কোথায়?
সে মাগী কি আর এখানে আছে? সে গেছে কোহিমা। তোর বাপের কাছে।
বাপ বস্তিতে আসে নি আর?
আর এল কোথায় শয়তানের বাচ্চাটা! হুই সারুয়ামারুর বউ জামাতসুর ইজ্জত নিলে। তারপর সেই রাতেই তো কোহিমা পালাল। আমি বুড়ি শেষকালে জামাতসুর ইজ্জতের দাম দিলাম শুয়োর আর বর্শা দিয়ে। দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলে উঠল বেঙসানু, সেই সায়েব না কী, তাদের সঙ্গেই রয়েছে টেফঙের বাচ্চাটা। টেনে নটুঙ!
মা কার সঙ্গে কোহিমা গেল?
সারুয়ামারু কোহিমা গেল দিন সাতেক আগে, তার সঙ্গে রাতের অন্ধকারে ভেগে গিয়েছে শয়তানী। মাগীর তো আবার পুরুষের গায়ের গন্ধ না পেলে মেজাজ বিগড়ে যায়। বেঙসানু নির্বিকার ভঙ্গিতে খেউড় গাইতে শুরু করল, আহে ভু টেলো।
সেঙাইর সতেজ দেহটা অদ্ভুত উত্তেজনায় ফুলে ফুলে উঠতে লাগল। থরে থরে সাজানো পেশীগুলিতে দোলানি শুরু হল, সারুয়ামারু কোথায়? কোহিমা থেকে ফিরেছে?
হু-হু, কাল সন্ধের সময় ফিরেছে বস্তিতে। এবার বিস্বাদ গলায় বেঙসানু বলল, কী খাবি সেঙাই? এবছর তো সিঁড়িখেতে জোয়ারের বীজ বোনা হল না। তুইও মোরাঙের মাচানে শুয়ে শুয়ে ভুগলি, আর হুই টেফঙের বাচ্চা সিজিটোটা কোহিমায় পালিয়ে গেল। সায়েবদের গায়ে যে কী সোয়াদ মাখা আছে, সে-ই জানে। চিন্তিত মুখে বেঙসানু বলতে লাগল, ফসল হল না এবার, খাবি কী সেঙাই?
কী আবার খাব? ললাটে পাখি মারব, হুন্টসিঙ পাখি মারব, মোষ আর হরিণ শিকার করব। শুয়োর গেঁথে আনব। শুধু মাংস খেয়ে কটা মাস কাটিয়ে দেব। যদ্দিন এই বন আর পাহাড় রয়েছে, জানোয়ার আর পাখি রয়েছে, এই দুখানা হাত রয়েছে, বর্শা আর সুচেন্যু রয়েছে, তদ্দিন না খেয়ে মারব নাকি? কী রে ঠাকুমা? সোজাসুজি বেঙসানুর দিকে তাকাল সেঙাই।
সে কথা ঠিক সেঙাই। আমরা পাহাড়ী মানুষ, জন্তু জানোয়ার পেলেই আমাদের পেট চলে যাবে। কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা।
কী কথা আবার ভাবছিস? সেঙাই-এর কপালের টান টান চামড়ায় কয়েকটা রেখা ফুটে বেরুল। আড়াআড়ি রেখা। রেখার আঁকিবুকি।
বলছিলাম, এক বছর সিঁড়িখেতে বীজফসল পড়ল না। যদি ফসলের আনিজার রাগ এসে পড়ে, তবে তো আমাদের জমিতে আর ফসলই হবে না কোনোদিন। কত কাল আর মাংস খেয়ে কাটাবি?
আরে হবে, হবে। ফসলের আনিজার নামে একটা সম্বর বলি দিলেই হবে। তুই বোস্ ঠাকুমা, আমি একটু সারুয়ামারুকে ডাকি। অর্ধ-গোলাকার পাথরখানার ওপর উঠে দাঁড়াল সেঙাই।
ফাসাও আর নজলিও লাফিয়ে উঠে পড়েছে, এখন কোথাও যেতে হবে না। আমাদের মায়ের কাছে দিয়ে আয়।
মায়ের কাছে যাবে! দেখলি না তোদের ফেলে কোহিমা ভাগল মা আর বাপ। থাম সব। রক্তচোখে তাকাল সেঙাই। তারপর পাথরখানার থেকে নিচে নেমে চিৎকার করে উঠল, এই সারুয়ামারু, সারুয়ামারু–
মাথার ঠিক ওপরেই অতিকায় একটা মস্ত পাথরের চাই। সেটার পাশেই জোরি কেসুঙ। সেখান থেকে একটা বিরক্ত কণ্ঠস্বর তাড়া করে এল, কে? কে ডাকে? কে রে শয়তানের বাচ্চা?
আমি সেঙাই, নিচে আয় সারুয়ামারু।
যাই।
খানিক পরে জোহেরি কেসুঙে চলে এল সারুয়ামারু। তারপর অর্ধ-গোলাকার পাথরখানার ওপর জাঁকিয়ে বসল, কি রে সেঙাই, ভালো হয়ে গেছিস দেখছি।
হু-হু।
এই যে তোর বাপ টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে। দক্ষিণের পনেরোটা পাহাড় ডিঙিয়ে মাও-এর রাস্তা। সেখানে পক পক গাড়ি পাবি। তাই চড়ে কোহিমা যাবি। তোর বাপ যেতে বলেছে তোকে। বলতে বলতে হাতের মুঠি থেকে একটি রুপোর মুদ্রা বার করে সেঙাইর দিকে বাড়িয়ে দিল সারুয়ামারু, এই নে।
ঝকঝকে রুপোলি মুদ্রা। রোদ লেগে শুভ্র দ্যুতি ঠিকরে বেরুচ্ছে। অবাক বিস্ময়ে ধাতব বস্তুটির দিকে তাকিয়ে রইল সেঙাই। এ তার অচেনা। এর আগে কোনোদিনই এই গোলাকার মুদ্রাটির সঙ্গে তার পরিচয় হয়নি। বুড়ি বেঙসানুও সেটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে অবাক হয়ে। তার হিসাবহীন বয়সের অভিজ্ঞতায় এমন একটি পদার্থ অজানাই রয়েছে।
সেঙাই তাকাল বেঙসানুর দিকে। এখনও সে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারেনি, বস্তুটি স্পর্শ করবে কি, করবে না।
বেঙসানু ভীরু গলায় বলল, এই সারুয়ামারু, এটা ধরলে আনিজার রাগ এসে পড়বে না তো? এটার নাম কী?
এই ছোট্ট পাহাড়ী জনপদ। চারপাশে গহন বন। সেই বনে হিংস্র শ্বাপদের অবাধ সংসার। সেই অরণ্যে নিয়তবাহী প্রস্রবণ, কল্লোলিত জলপ্রপাত তাদের অভিজ্ঞতার সীমানায় এগুলিই সত্যি, এগুলিই গ্রাহ্য। এই পাহাড়ী পৃথিবীর বাইরে তাদের কাছে সমস্ত কিছুই সংশয়ের সীমা দিয়ে ঘেরা, অবিশ্বাস আর সন্দেহে আকীর্ণ। অস্ফুট বোধবুদ্ধি দিয়ে এই পাহাড়ী মানুষগুলি সব কিছু যাচাই করে তবেই গ্রহণ করে। নইলে অপরিচিত কোনো কিছুর মুখোমুখি হতে তারা কুণ্ঠিত হয়, বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
সমস্ত কেলুরি গ্রামখানাকে চমকে দিয়ে হেসে উঠল সারুয়ামারু, কি বোকা তোরা! এর নাম হল টাকা। এটা ধরলে কিছুতেই আনিজার রাগ হবে না।
