মেহেলী ভাবছে অন্য কথা। লিজোমুর ঝলসানো বীভৎস দেহটা এখনও যেন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে সে। না না, সর্দারকে সে কিছুতেই বলতে পারবে না, কেমন করে খাসেম গাছের মগডালে লিজোম একটু একটু করে পুড়ে মরেছে। বুকের মধ্যে ধমনীটা ছিঁড়ে রক্ত উছলে। উছলে পড়ছে, তারপর ফেনিয়ে ফেনিয়ে শিরা-উপশিরার ধারাপথে ছড়িয়ে যাচ্ছে। অসহ্য এক যন্ত্রণায় শরীরের পেশীগুলো যেন অসাড় হয়ে আসতে শুরু করেছে মেহেলীর। টেনেন্য মিঙ্গে লু! বউপণ! না হোক তার দাদা খোনকের সঙ্গে লিজোমুর বিয়ে, তবু তার বিয়ে হত সুদূর পাহাড়ী গ্রাম জুকুসিমায়। সোয়ামীর সোহাগে সোহাগে, পাহাড়ী গ্রামের কোনো বনস্পতির ছায়াতলে একটি সুন্দর গৃহস্থালিতে সার্থক হত লিজোমু। চরিতার্থ হত তার যৌবনের কামনা। কিন্তু সে আজ নেই, ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছে। লিজোমু পুড়ে পুড়ে মরেছে। নিজের কামনা আর বন্য বাসনার মধ্যে মেহেলী লিজোমুর মনের ছায়াই তো দেখতে পায়। পাহাড়ী গ্রামে এক সুন্দর গৃহকোণ, এক আদিম আর বলিষ্ঠ পুরুষ। কিছুই পেল না সে। শত হলেও লিজোমু তার সই। তার জন্য প্রাণটা পোড়ে বৈকি মেহেলীর।
বুড়ো সর্দার বলল, কাল সেঙাইকে পোড়ালুম, তারপর সারা রাত মোরাঙে হল্লা হল, মাংস, খাওয়া হল। কেসুঙে আজ ফিরে দেখি, লিজো নেই। তোরা তবে তাকে দেখিসনি?
না। অস্ফুট গলায় বলল মেহেলী। তারপর ছুটে গেল পোকরি কেসুঙের দিকে। সর্দারের মুখোমুখি আর দাঁড়াতে পারছে না সে।
মেহেলীর পিছন পিছন পলিঙাও ছুটতে লাগল।
২০. নাগা পাহাড় থেকে
২০.
নাগা পাহাড় থেকে জা কুলি মাস বিদায় নিল। পেঁজা তুলোর মতো গুড়ো গুড়ো যে তুষার। ঝরত আকাশ থেকে তা একদিন বন্ধ হল। শীত ঋতুর আয়ু প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। এবার কমলা রং রোদের সওয়ার হয়ে আসবে গরমের সকাল, ঝকঝকে রোদের পাখনা মেলে উড়ে যাবে দুপুর, তারপর অপরূপ সোনালি বিকেল পশ্চিমের পাহাড়-চূড়া রাঙিয়ে দেবে।
জা কুলি মাসের পর এখন নসু কেহেঙ মাসের শুরু। দিগন্তে কুয়াশার রেখা ঘন হয়ে জমে না আজকাল। সূক্ষ্ম নীলাভ একটি কুয়াশার স্তর সুখ-সুখ শিহরনের মতো পাহাড়ের চক্ররেখাঁটিকে জড়িয়ে থাকে। কপিশ রঙের পাহাড়ী ঘাসের ফলক থেকে শিশিরের নিটোল কণাগুলি যখন বাষ্প হয়ে উড়ে যায়, ঠিক তখনই আকাশ থেকে কুয়াশার স্তরটা একেবারে অদৃশ্য হয়। ঘন সবুজ বন এই নসু কেহেঙ মাসে ঝলমল করতে থাকে।
জা কুলি মাসের শেষ দিকে সিঁড়িখেতে জোয়ার বোনা হয়েছিল। টিজু নদীর বরফ-গলা জল এনে ছিটিয়ে ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল বীজ ফসলের শিকড়ে শিকড়ে। এখন, এই নসু কেহেঙ মাসের সকালে সারা মাঠ ভরে শ্যামল অঙ্কুর মাথা তুলেছে। আগামী ফসলের মাসগুলিতে পাহাড়ী খেতের ঝাপি সোনালি লাবণ্যে ভরে যাবে। শ্যামাভ শস্যের অঙ্কুরে তার গর্ভধারণের ইঙ্গিত।
পুরোপুরি জা কুলি মাসটা, তারপর নসু কেহেঙ মাসের অনেকগুলো দিন, মোরাঙের মাচানে শুয়ে শুয়ে কাটিয়ে দিতে হয়েছে সেঙাইকে। সালুয়ালা গ্রামের অতল খাদে সেদিন অচেতন হয়ে পড়ে যাওয়ার পর সারা দেহ ফালা ফালা হয়ে ছিঁড়ে গিয়েছিল। সেই রক্তাক্ত ক্ষতগুলি টুগু আর আরেলা পাতার প্রলেপে শুকিয়ে গিয়েছে এতকাল পর।
.
আজ প্রথম মোরাঙ ছেড়ে বাইরে এল সেঙাই। সারা দেহ এতদিনের বিশ্রামে সতেজ হয়েছে, সবল হয়েছে। চামড়া টান টান হয়ে নির্ভাজ হয়েছে। আর সেই নির্ভজ চামড়ার ওপর বেশ চেকনাই ফুটে বেরিয়েছে।
মোরাঙের সামনে এই উঁচু পাথরের টিলা থেকে ফসলের সিঁড়িখেত নজরে আসে। ফসল পাহারা দেবার জন্য জমির চারিদিকে অজস্র ঘর তোলা হয়েছে। অনেক উঁচু থেকে সেগুলিকে ছোট ঘোট বিন্দুর মতো মনে হয়।
অনেক আগেই সকাল পেরিয়ে গিয়েছে। দিকে দিকে দুপুরের আভাস ফুটে বেরিয়েছে। শক্ত করে কোমরের কাপড়ে একটা গিঁট দিয়ে নিল সেঙাই।
একপাশে বসে বসে বর্শায় শান দিচ্ছে জোয়ান ছেলেরা। তাদের ভেতর থেকে ওঙলে বলল, কি রে সেঙাই, বেরিয়েছিস মোরাঙ থেকে?
হু-হু, ভালো হয়ে গেছি তত বেরুব না? কদ্দিন আর মোরাঙে শুয়ে থাকব?
আজ সিঁড়িখেতে যাবি নাকি?
যাব। বিষণ্ণ গলায় সেঙাই বলল, এবার বীজ বুনতে পারলাম না। জোয়ার না হলে গরমের দিনগুলো খাব কী, ভাবতে পারছি না।
হু-হু। সকলে মাথা নেড়ে সায় দিল।
কী যে করি! সেঙাইকে বড় অসহায় দেখাল।
তুই পাহাড়ী মরদের নাম ডুবিয়ে দিবি। প্রখর গলায় দক্ষিণ পাহাড়কে কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে এবার হেসে উঠল ওঙলে, বনে মোষ নেই? হরিণ নেই? শুয়োর নেই? সম্বর নেই? বর্শা দিয়ে ফুঁড়ে এনে পুড়িয়ে খাবি।
ঠিক বলেছিস। আরো খানিকটা এগিয়ে ওঙলের পাশে এসে দাঁড়াল সেঙাই। বলল, তবে ফসল না বুনলে কী চলে? ফসলের আনিজার যে তাতে গোসা হয়।
হু-হু।
তোরা কখন সিঁড়িখেতে যাবি?
দুপুর পেরিয়ে গেলে। ওঙলে বলল।
আমাকে ডেকে নিস। আমি এখন একবার কেসুঙে যাব। ঠাকুমার সঙ্গে দেখা করে আসি। হন হন করে জোহেরি কেসুঙের দিকে চলে গেল সেঙাই।
পূর্ববর্তী জোহেরি কেসুঙের পেছন দিকে অর্ধগোলাকার পাথরখানার ওপর বসে ছিল বুড়ি বেঙসানু। তার চোখ দু’টি আকাশের দিকে স্থির হয়ে রয়েছে। আকাশটা আশ্চর্য নীল, আশ্চর্য নির্মল। মহাশূন্যে গুটসুঙ পাখির ঝাঁক সাঁতার কেটে চলেছে।
