ইজ্জতের দাম আদায় করেছি তোর ঠাকুমার কাছ থেকে, আর সিজিটো শয়তানটা ভেগেছে।
বাপটা ভেগেছে? বেশ হয়েছে। ইজ্জত্রে দাম আদায় করেছিস? তা হলে তো সব কিছু চুকেই গেছে। উত্তেজনায় উঠে বসেছিল সেঙাই। এবার ক্লান্তিতে মাচানের ওপর এলিয়ে পড়ল।
একসময় সারুয়ামারু আর জোয়ান ছেলেটি লবণ জল নিয়ে মোরাঙে ফিরল। ওঙলে এল বুনো মোষের মাংস নিয়ে, পিঙলেই এল তামুন্যুকে নিয়ে, আর রোহি মধু-ভরা বাঁশের পানপাত্র নিয়ে ফিরল পিঙকুটাঙ।
.
১৯.
দুপুরের দিকে বুড়ো সর্দার লিজোমুকে খুঁজতে বেরুল। সালুয়ালা গ্রামের টিলাগুলো ডিঙিয়ে কেসুঙে কেসুঙে থামতে লাগল।
তোরা কেউ লিজোমুকে দেখেছিস?
কই, না তো। যে মেয়েটি উত্তর দিল সে আবার অখণ্ড মনোযোগে ফাফ্যা দিয়ে দড়ির লেপ বুনতে শুরু করেছে।
একটা বাঁক ঘুরল বুড়ো সর্দার। একপাশে কপিশ রঙের পাথরের ওপর কতকগুলো জোয়ান ছেলের জটলা বসেছে। পিতলের এলস্ (ক্ষুর জাতীয় অস্ত্র দিয়ে গোল করে তাদের মাথা কামিয়ে দিচ্ছে জন দুই ছোকরা। আর একদিকে বড় ভেরাপাঙ গাছের ছায়াতলে নিবিড় হয়ে বসেছে কয়েকটি যুবতী মেয়ে। তাদের সুঠাম অঙ্গশ্রীর ওপর দুপুরের রোদ নেশার মতো জড়িয়ে রয়েছে। টুগু পাতার আঠা আঙুলে মাখিয়ে বাহুসন্ধির কেশ একটি একটি করে নির্মূল করছে তারা। ঠিক তেমনি প্রক্রিয়ায় একটু দূরের কয়েকজন জোয়ান ছেলে তাদের চিকন দাড়ি গোঁফ উপড়ে ফেলছে। এ সব এই পাহাড়ী নারীপুরুষের অবশ্য করণীয় প্রথা।
বুড়ো সর্দার বিশাল ভেরাপাঙ গাছটার নিচে এসে দাঁড়াল, কি রে, তোরা লিজোমুকে দেখেছিস?
না সদ্দার। কাল দুপুরের পর থেকে তাকে আর দেখি নি।
তাই তো, গেল কোথায় শয়তানের বাচ্চাটা! এই দ্যাখ না, আজ সন্ধের সময় জুকুসিমা বস্তি থেকে জানথাঙ আসবে। কী করি বল তো? হতাশ দৃষ্টিতে চারিদিকে তাকাল বুড়ো সর্দার।
এবার সকলে রীতিমত উৎকর্ণ হয়ে বলল, জানথাঙ কে রে সদ্দার?
পিমঙের পিসি।
পিমঙ! সেই যে ছোঁড়ার সঙ্গে কাল সেঙাইকে পোড়াবার আগে লিজোমুর বিয়ে ঠিক করলি?
হু-হু, পিমঙের পিসি বউপণ নিয়ে আসবে। বিয়ের বায়না দিয়ে যাবে আজ। কিন্তু কোথায় গেল যে টেফঙের বাচ্চাটা! এতক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর দস্তুরমত ক্লান্ত হয়ে পড়েছে বুড়ো সর্দার। এবার সে যতটা বিরক্ত হল, তার চেয়ে শঙ্কিত হল অনেক বেশি।
লিজোমুর বিয়ে। ভোজ হবে, ভোজ হবে।
সাদা শুয়োর খাওয়াতে হবে কিন্তু সদ্দার। না বললে শুনব না।
জোয়ান-জোয়ানীরা সকলে মিলে শোরগোল করতে লাগল। সেই হইচই সমস্ত সালুয়ালাঙ গ্রামটাকে যেন মাতিয়ে তুলল।
চুপ কর শয়তানের বাচ্চারা। লিজোমুকে খুঁজে বার কর আগে, তবে তো বিয়ে! গর্জে উঠল বুড়ো সর্দার।
কে যেন বলল, লিজোমু তো মেহেলীর সই। তার কাছে খোঁজ নিলে নিশ্চয়ই লিজোমুকে পাওয়া যাবে।
ঠিক বলেছিস। বুড়ো সর্দার পোকরি কেসুঙের দিকে পা বাড়িয়ে দিল।
আচমকা একটি যুবতী মেয়ে বলল, খোনকের সঙ্গে না লিজোমুর বিয়ে হবার কথা ছিল, কি রে সদ্দার?
ছিল তো। খোনকেকে আনিজাতে মারল। কাল আবার পিমঙের বাপ এসেছিল, সে তার ছেলের সঙ্গে লিজোমুর বিয়ের কথাটা পাড়ল। খোনকে মরেছে, তাই আমিও রাজি হলুম। পিমঙের বাপ আমার স্যাঙাত। আমরা একসঙ্গে কেলুরি বস্তির সঙ্গে লড়াই করেছি। যাক সে কথা। জুকুসিমা বস্তির সঙ্গে আমাদের কতদিনের কুটুম্বিতে। ওরা কত খাতির করে। বলতে বলতে সামনের টিলার দিকে উঠে গেল বুড়ো সর্দার।
বুড়ো সর্দার টিলাটার ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।
একটি যুবতী মেয়ে ঘাড়খানা অপরূপ ভঙ্গিতে বাঁকিয়ে বলল, খোনূকেটা এই সবে মরল, সদ্দারের আর তর সয় না। এর মধ্যেই লিজোমুর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে!
মেয়ে বেচে কত পণ পাবে বল দিকি! সে খেয়ালটা আছে তোর? খাসেম গাছের ছায়াতলে আর একটি গলা শোনা গেল।
সাসুমেচু! আমাদের সদ্দার একটা আস্ত সাসুমেচু (ভয়ানক লোভী মানুষ)।
পাহাড়ী জোয়ান আর জোয়ানীদের মধ্যে মৃদু একটা গুঞ্জন উঠল।
সবাই চুপ, একেবারে চুপ। সদ্দার শুনতে পেলে সক্কলকে সাবাড় করবে। যুবতী মেয়েটি সতর্ক করে দিল। এরপর কেউ আর একটি কথাও বলল না।
.
খোখিকেসারি কেসুঙ থেকে পোকরি কেসুঙের দিকে আসছিল পলিঙা আর মেহেলী। একখণ্ড বিশাল পাথরের পাশে সর্দারের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল তাদের।
বুড়ো সর্দার বলল, লিজোমুকে দেখেছিস মেহেলী? কি রে বলিঙা, তুই দেখেছিস?
বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ড থমকে গেল মেহেলী আর পলিঙার। চট করে একবার পলিঙা তাকাল মেহেলীর দিকে। মেহেলীও তার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে রয়েছে। চোখের পলক পড়ছে না। দুজন অনেকক্ষণ তাকিয়েই রইল।
বুড়ো সর্দার আবারও বলল, কি রে, দেখেছিস তোরা? লিজোমু তো তোদের সই। কাল দুপুরের পর থেকে তাকে পাচ্ছি না।
কাঁপা গলায় মেহেলী বলল, কই, আমরা দেখিনি তো।
বড় অসহায় দেখাল বুড়ো সর্দারকে। ঘোলাটে চোখের ঠিক নিচেই বর্শার ফলার মতো ফুঁড়ে বেরিয়েছে হনুদুটো। সারা মুখের রাশি রাশি কুঞ্চনে জরা স্থায়ী ছাপ ফেলেছে। ভাঙা গলায় বুড়ো সর্দার বলল, কী করি বল তো মেহেলী? খুঁজেই পাচ্ছি না। এদিকে ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। বাপণ এসে যাবে দু-একদিনের মধ্যে।
বউপণ! প্রায় চেঁচিয়ে উঠল মেহেলী।
হু-হু, কাল সন্ধের সময় এসেছিল পিমঙের বাপ, হুই জুকুসিমা বস্তি থেকে। আমাদের সঙ্গে ওদের খুব খাতির। তোর দাদা খোনকেটা তো মরল। তাই ওদের ছেলে পিমঙের সঙ্গে লিজোমুর বিয়ে ঠিক করলাম। বংশটাও ভালো। লোখেরি বংশ। ফিসফিস গলায় বলতে বলতে একসময় একেবারে থেমে গেল বুড়ো সর্দার।
