ইতিমধ্যে বুনো মোষ দুটোর গা থেকে বর্শা আর তীরের ফলাগুলো উপড়ে নেওয়া হয়েছিল। সকলে মিলে এবার দেহ দুটো অগ্নিকুণ্ডটার মধ্যে ফেলে দিল। বিশাল কুণ্ড। গনগনে আগুন। চারপাশ থেকে মোটা জ্বলন্ত কাঠগুলোকে তুলে মোষ দুটোর ওপর চাপানো হল।
হো-ও-ও-ও-আ-আ–
জোয়ানদের গলা থেকে উল্লসিত হল্লা উঠছে আকাশের দিকে। বিশৃঙ্খল আর হিংস্র শোরগোল, হো-ও-ও-ও-আ-আ–
কে যেন বলল, শুধু শুধু ঝলসাচ্ছিস সদ্দার, কঁচাই মেরে দিলে হত। তর আর সইছে না।
বুড়ো খাপেগা তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। তারপর খেঁকিয়ে বলল, কে, কে? শয়তানের বাচ্চা হুই কুকী আর সাঙটামদের মতো অসভ্য হয়ে রয়েছে এখনও! কাঁচাই সব গিলতে চায়।
একেবারে বর্শা দিয়ে কুঁড়ে ফেলব। একটু আগুনে ঝলসে না নিলে সোয়াদ আসে মাংসে?
হো-ও-ও-ও-আ-আ–
খাসেম কাঠের আগুনে ঝলসে যাচ্ছে মহাকায় প্রাণী দুটো। চর্বি জ্বলে, চামড়া পুড়ে, দপদপে ঝলকানি উঠছে।
হো-ও-ও-ও-আ-আ–
লোহা আর বাঁশের বড় বড় ছুরি নিয়ে এসেছে সকলে। সামনে বুনো মোষের দেহ পুড়েপুড়ে উগ্র লোভনীয় গন্ধ ছড়াচ্ছে। জা কুলি মাসের রাত্রি আমোদিত হয়ে উঠেছে। যাদের রসনা বেসামাল হয়ে উঠছে, যারা অতিমাত্রায় লোলুপ হয়েছে, তারা এর মধ্যেই অগ্নিকুণ্ডের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিচ্ছে। তারপর চকিতে একখণ্ড মাংস কেটে নিয়ে আসছে ছুরি দিয়ে। লবণের বদলে ঝরনার লবণ-জল নিয়ে এখনও ফিরে আসেনি সারুয়ামারু আর জোয়ান ছেলেটা। সেদিকে বিন্দুমাত্র প্রক্ষেপ নেই তাদের। পরম তৃপ্তিতে সেই আধপোড়া মাংস লাল লাল দাঁতের ফাঁকে ফেলে চিবোতে শুরু করেছে জোয়ান ছেলেগুলো। আর তারই ফাঁকে ফাঁকে হল্লা করে উঠছে, হো ও–ও–ও-আ—আ–
আচমকা পাহাড়ের ভাজ থেকে গোঙানি ভেসে এল, ও সদ্দার, সদ্দার–আমি এসেছি।
যাদের ধ্যান-জ্ঞান দু’টি পিঙ্গল চোখের মণি হয়ে ঝলসানো বুনো মোষ দুটোর দিকে আটকে ছিল তারা চমকে উঠল।
পাহাড়ের ভাজ থেকে আবারও গোঙানিটা শোনা যেতে লাগল, সদ্দার, ও সদ্দার। আমি সেঙাই। আমাকে একটু ধরে নিয়ে যা; উঠতে পারছি না। শিগগির আয়।
আনিজা! আনিজা! সেঙাই তো মরেছে। পালা, পালা সব। একটা সন্ত্রস্ত কোলাহল উঠল আগুনের কুণ্ডটার চারপাশে। জনকয়েক দৌড়ে মোরাঙের মধ্যে গিয়ে ঢুকল।
চুপ কর শয়তানের বাচ্চারা। কালো পাথরখানা থেকে লাফিয়ে উঠল বুড়ো খাপেগা, এত মানুষের সামনে আনিজারা আসে না। মশাল নিয়ে আমার সঙ্গে আয়।
একটু পরেই পাহাড়ের ভাজ থেকে সেই-এর প্রায়-অচেতন দেহটা তুলে মোরাঙে নিয়ে এল জোয়ান ছেলেরা। এতটা চড়াই উতরাই পার হয়ে আসতে আসতে হিমে সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গিয়েছিল সেঙাই-এর। সামনের পাথরের ভাজে এসে লুটিয়ে পড়েছিল সে।
কিছু সময়ের জন্য বুনো মোষের লোভনীয় মাংসের কথা ভুলে থাকতে হল। সেঙাই-এর চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়েছে সকলে। তার কাছে উত্তেজক খবর নিশ্চয়ই কিছু আছে। সে লোেভও কম নয়।
বুড়ো খাপেগা বলল, কি রে, কী ব্যাপার? সারা গায়ে এত রক্ত কেন? কী হয়েছে?
থেমে থেমে দু’টি দিনের সব কাহিনি বলে গেল সেঙাই। কথার ফাঁকে ফাঁকে বার বার থামতে হল। কখনও তার গলা ফিসফিস শোনল, কখনও অত্যন্ত উত্তেজিত। খোকে, মেহেলী, লিজোমু, গভীর খাদ কিছুই বাদ দিল না সে। শেষে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, কিছুক্ষণ আগে সেই খাসেম গাছের ঘরখানা থেকে তাল বুঝে নেমে এসেছি। বড় খিদে পেয়েছে সদ্দার।
বুড়ো খাপেগা বলল, এই ওঙলে, বুনো মোষের মাংস নিয়ে আয়। এই পিঙলেই, তুই তামুন্যুকে (চিকিৎসক) ডেকে আন। এই পিঙকুটাঙ, তুই রোহি মধু নিয়ে আয়।
মোরাঙের বাইরে ঘন অন্ধকার। ওঙলে, পিঙলেই আর পিঙকুটাঙ তিন দিকে ছুটে গেল।
সেঙাই আবারও বলল, হুই মেহেলী আমাকে বাঁচিয়েছে সদ্দার, ওকে আমি বিয়ে করবই। তুই দেখিস, ওর বাপ আমার সঙ্গে বিয়ে না দিলে লড়াই বাধিয়ে দেব।
হু-হু, বিয়ে করবি। সালুয়ালাঙ বস্তি মেহেলীকে না দিলে ছিনিয়ে নিয়ে আসব। এই তো চাই সেঙাই। তোর ঠাকুরদাকে হুই বস্তি থেকে নিতিৎসুকে এনে দিতে পারিনি। সেদিন আমরা হেরে গিয়েছিলাম, সেদিন জেভেথাঙ মরেছিল। তোর জন্যে হুই মেহেলীকে ছিনিয়ে এনে আমাদের জিততে হবে। যেমন কারেই হোক সালুয়ালাঙ বস্তিকে হারিয়ে দিতে হবে। কেলুরি গ্রামের অতীত কাল এই বুড়ো খাপেগা। তার দুচোখে এক ভয়ানক প্রতিজ্ঞা জ্বলতে লাগল।
অনেক দিন পর সেঙাই-এর মধ্যে তার যৌবনকালকে দেখতে পেয়েছে বুড়ো খাপেগা। সেই রক্তাক্ত অতীতের দিনগুলো আর নিতিৎসু-জেভেগাঙকে নিয়ে দুই গ্রামের লড়াই চেতনার মধ্যে দোল খেয়ে উঠছে। সেঙাই এবং মেহেলীকে নিয়ে একালে আর একটা সংঘাতের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। খাপেগার উল্লাসের দিন বৈকি আজ। একালের ছোকরাদের কাছে সে অতীত কালের ভেলকি দেখিয়ে ছাড়বে।
হঠাৎ কী ভেবে বুড়ো খাপেগা বলল, বুঝলি সেঙাই, তোর বাপ সিজিটো হুই সারুয়ামারুর বউর ইজ্জত নিয়েছে।
ছিলাকাটা ধনুকের মতো মাচানের ওপর উঠে বসল সেঙাই, বর্শা দিয়ে ফুঁড়ে ফেলেছিস বাপটাকে?
না।
তবে কী সদ্দার হয়েছিস! ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ল সেঙাই-এর। বুকে বিশাল একখান থাবা চেপে দম নিল সে, পরের বিয়ে করা মাগীর দিকে নজর! আমি হলে সাবাড় করে ফেলতুম। তা সে যেই হোক না। হু-হু।
