টিলাটার ওপর থেকে উঠে পড়ল সেঙাই। ফের টলতে টলতে উপত্যকার দিকে নামতে লাগল। এখনও অনেকটা পথ পেরিয়ে যেতে হবে। তারপর পাওয়া যাবে তাদের ছোট্ট গ্রাম কেলুরির সীমানা।
.
হো-ও-ও-ও-আ-আ—
হো-ও-ও-ও-আ-আ–
জা কুলি মাসের রাত্রিটাকে চকিত করে উল্লসিত শোরগোল উঠতে লাগল। কেলুরি গ্রামের মোরাঙের সামনে অনেকগুলো মশাল জ্বলছে। পেন্য কাঠের মশাল। আর সেই মশালগুলোর চারপাশে গোল হয়ে বসেছে জোয়ান ছেলেরা। ঠিক মাঝখানে একটা অগ্নিকুণ্ড জ্বালানো হয়েছে। মোটা মোটা খাসেম কাঠে আগুনের গনগনে রক্তাভা।
একপাশে পড়ে রয়েছে গোটা দুই বুনো মোষ। প্রাণী দু’টির সারা গায়ে তীর আর বর্শায় ফলা ফুটে রয়েছে। লাল হেপোন্যে ফুলের মতো থোকা থোকা তাজা রক্ত ঘন হয়ে রয়েছে। পাহাড়ী মানুষগুলো তীর আর বর্শা দিয়ে বুনো মোষের কুচকুচে কালো দেহে নিষ্ঠুর ছবি এঁকেছে যেন। আজ দুপুরে শিকারে গিয়েছিল জোয়ান ছেলেরা। বর্শা আর তীরের ফলায় বুনো মোষ গেঁথে ফিরেছে একটু আগে।
রাত্রি ঘন হচ্ছে। আগুনের কুণ্ডটার চারপাশে নিবিড় হয়ে বসেছে উলঙ্গ জোয়ানগুলো।
একজন বলল, হু-হু, বুনো মোষ দুটো বড় ভুগিয়েছে। তা হোক, আজ ভোজ বেশ জমবে, কি বলিস তোরা?
উত্তরে সকলে উল্লসিত গলায় চিৎকার করে উঠল, হো-ও-ও-ও-আ-আ-হু-হু, কী মজা!
কে যেন বলল, এবার বর্শা আর তীরগুলো খুলে ফেল মোষ দুটোর গা থেকে। বসে না থেকে হাত লাগা সবাই।
হু-হু– পলকের মধ্যে কয়েকটা জোয়ান ছেলে মোষ দুটোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
ইতিমধ্যে মোরাঙের বাইরের ঘর থেকে বুড়ো খাপেগা বেরিয়ে এসেছে। মোষ দুটোর দিকে তাকিয়ে তার লোলুপ চোখ ঝলকে উঠল, বেশ তাগড়া জানোয়ার রে। মাংসটা খেয়ে জুত হবে মনে হচ্ছে। এই ওঙলে, এই পিঙলেই, এই পিরনাঙ, যা নিমক নিয়ে আয়। হু-হু, মাংসটা তরিবত করে খাওয়া যাবে।
সকলের মাঝখানে তুলোর দড়ির লেপ জড়িয়ে জাঁকিয়ে বসল বুড়ো খাপেগা। আর ওঙলেরা ছুটল লবণের সন্ধানে।
কে যেন বলল, সেঙাইটা নেই। সে থাকলে মজা হত।
হু-হু, তা হত। বুড়ো খাপেগা কানের লতিতে পিতলের নীয়েঙ দুল দোলাল। বলল, সে নির্ঘাত মরেছে। দু’দিন ধরে এত খুঁজলাম, ছোঁড়াটার পাত্তাই নেই। এ নিশ্চয়ই হুই রেজু
আনিজার কাজ। কোথায় কোন খাদে পড়ে মরে রয়েছে যে শয়তানের বাচ্চাটা!
রেনজু আনিজা! রেজু আনিজা! জোয়ান ছেলেদের গলা এবার ফিস ফিস শোনাতে লাগল।
হু-হু, রেঙকিলানকে যে মেরেছে এ নির্ঘাত তারই কাজ। ও নাম আর করিস না। রাত্তিরবেলা বড় ভয় করে। চুপ করে গেল বুড়ো খাপেগা। খানিক পরেই আবার বলতে লাগল, সেঙাই মরেছে, নিশ্চয়ই মরেছে। নইলে এ দু’দিনে ঠিক খুঁজে পেতুম। সালুয়ালা বস্তির শত্তুররা ওকে মারলে চেঁচিয়ে পাহাড়ে ভূমিকম্প বাধিয়ে দিত না।
একটু আগে সালুয়ালাঙ বস্তির লোকেরা খুব চেঁচাচ্ছিল কিন্তু। একটি জোয়ান ছেলে বলল।
যেতে দে, যেতে দে এখন ওসব কথা। আগে তরিবত করে মাংস খাই। তাগড়া মোষের মাংস।
হু-হু। জিভে জল এসে গেল বুড়ো খাপেগার, কাল দেখা যাবে। দরকার হলে সালুয়ালাঙের সবগুলো শয়তানের মাথা ছিঁড়ে আনব না! বড় শীত আজ। অগ্নিকুণ্ডটার দিকে দুখানা শীর্ণ হাত বাড়িয়ে দিল সে। এখন তার উত্তাপ চাই। জা কুলি রাত্রির হিম থেকে বাঁচবার জন্য প্রচুর উত্তাপ।
খানিকটা পরে ওঙলেরা ফিরে এল। কিন্তু কেউ লবণ আনেনি।
বুড়ো খাপেগা বলল, কি রে, নিমক এনেছিস?
না জেঠা, নিমক নেই।
নিমক নেই তো কী দিয়ে মাংস গিলবি? গর্জে উঠল বুড়ো খাপেগা।
সেঙাইর বাপ তো বস্তি ছেড়ে ভেগেছে। তোরা ভাগিয়ে দিয়েছিস। মোককচঙ কি কোহিমা থেকে সে-ই তো নিমক এনে বস্তির সবাইকে দিত। ওঙলে বলল।
হু-হু। সিজিটোটাকে আবার ফিরিয়ে আনতে হবে দেখছি। বুড়ো খাপেগা রক্তচোখে এবার সামনের দিকে তাকাল। তারপর হুঙ্কার দিয়ে উঠল, এই সারুয়ামারু–
বুনো মোষের দেহ থেকে বর্শা আর তীরের ফলাগুলো তুলে ফেলছিল সারুয়ামারু। অন্য কোনো দিকে তার নজর কি কান ছিল না। খাপেগার কথা শুনে ফিরে তাকাল, কী বলছিস রে সদ্দার?
কী আবার বলব! খুব তো শাসিয়েছিলি সিজিটোকে। তোর বউর ইজ্জতের দামও বাগিয়েছিস সিজিটোর মায়ের কাছ থেকে। এখন নিমক দেবে কে? সারা বস্তি নিমক না খেয়ে কি মরবে? লাল লাল দাঁতের সারি বার করে খিঁচিয়ে উঠল বুড়ো খাপেগা।
তা আমি কী করব? সারুয়ামারুর চোখ দুটো যেন ঝিলিক দিয়ে উঠল, আমার বউর ইজ্জত নেবে সিজিটো, তার দাম বাগাব না?
হু-হু, তা তো বাগাবিই। কিন্তু নিমক দিতে হবে তোকে। মোককচঙ কি কোহিমা শহর থেকে সারা বস্তির জন্যে নিমক নিয়ে আসবি কাল। নইলে সিজিটোকে ফিরিয়ে আনবি। এখন আমরা মাংস খাব। তার জন্যে নিমক দিবি। যা, নিমক নিয়ে আয়। বুড়ো খাপেগা হুকুম দিল।
চকিতে উঠে দাঁড়াল সারুয়ামারু, আমার নিমক নেই।
নিমক নেই তো মাংস খাব কী দিয়ে?
কেন? আপুফু ফল দিয়ে খাবি। নিমক না থাকলে টক আপুফু ফলই তো আমরা খাই। তাই নিয়ে আসব?
বড় কষা লাগে ফলগুলো। আজুস্ত্রে (লবণ জলের প্রস্রবণ) থেকে নিমকজল নিয়ে আয় বরং সেই জল দিয়ে মাংস খাব। তবে কাল শহর থেকে নিমক নিয়ে আসতে হবে তোকে। মনে থাকে যেন। পাথরের ওপর আরো জাঁকিয়ে বসল বুড়ো খাপেগা।
সারুয়ামারু একটি জোয়ান ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে নিচের বনভূমির দিকে ছুটল।
