মেজিচিজুঙ! একটা বাঘ-মানুষের সঙ্গে তার বিয়ে দেবে সাঞ্চামখাবা! বুকের ভেতরটা ভয়ে আতঙ্কে ধড়াস করে উঠল মেহেলীর।
হু-হু, ঠিক বলেছিস। আমার মেয়ে হুই লিজোমুটাকেও বিয়ে দিতে হবে এবার। খোনকে বেঁচে থাকলে তার সঙ্গে দিতুম। কী আর করা! আনিজাতে টানল ওটাকে। বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল বুড়ো সর্দার, অনেকক্ষণ এসেছি। এবার শুয়োর দিয়ে দে। মোরাঙের ছোরারা গিলবার জন্যে বসে রয়েছে।
হু-হু, দিচ্ছি। বাইরে চল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সাঞ্চামখাবা, হুই কেলুরি বস্তির সেঙাই শয়তান খোনকেকে মারল। তাকে পুড়িয়ে মেরেছিস। একটা না, দুটো শুয়োর দেব আমি। ছেলেটা বেঁচে থাকলে তোর মেয়ের সঙ্গেই জুড়ে দিতাম।
দেহটাকে যতখানি সম্ভব ছোট করে দেওয়ালের সঙ্গে মিশে রইল মেহেলী।
দুজনে বাইরে বেরিয়ে এল।
বুড়ো সর্দার বলল, তুই মোরাঙে যাবি না?
হু-হু, যাব। দুটো শুয়োর দেব আর মাংস খেতে যাব না! তোর মতলবটা কী বল দিকি সদ্দার? মোষবলির হাড়িকাঠের পাশে এসে একবার দাঁড়াল সাঞ্চামখাবা। তারপর বলল, পথে মেহেলীকে পেলে পাঠিয়ে দিস। শয়তানীটার চামড়া তুলে নেব আজ। আমার চারটে বর্শা, দুখুদি ধান দিয়ে শত্তুরদের জোয়ানকে বশ করার ওষুধ কিনেছে! আহে ভু টেলো।
হু-হু। দেখা হলেই পাঠিয়ে দেব।
সাঞ্চামখাবা ফুঁসতে লাগল, আমাকে না বলেই মেহেলীটা শব্দুরদের ছোঁড়ার সঙ্গে পিরিত জমাল!
হু-হু।
শুনে মেজাজটা বেয়াড়া হয়ে গিয়েছে সদ্দার। হুই জোহেরি বংশের শয়তানগুলোর সাহস দেখে তাজ্জব লাগে। জেভেথাঙটাকে একবার সাবাড় করলাম, তবু আক্কেল নেই। আবার সেঙাই এসেছিল আমাদের পোকরি বংশের মাগীর সঙ্গে পিরিত ফুটোতে! একটু দম নিয়ে সাঞ্চামখাবা বলল, তা শয়তানটাকে পুড়িয়ে বেশ করেছিস।
হু-হু।
খানিকটা সময় চুপচাপ কাটল।
চল, হুই দিকে শুয়োরগুলো রয়েছে। পোকরি কেসুঙের পেছনের অংশে সাঞ্চামখাবা আর বুড়ো সর্দার অদৃশ্য হয়ে গেল।
আর বাঁশের দেওয়ালটার পাশে দাঁড়িয়ে কর্তব্য স্থির করে ফেলল মেহেলী। আজ রাতে বাপের সামনে গিয়ে তাদের বাইরের ঘরে কিছুতেই দাঁড়াতে পারবে না সে। তাহলে নির্ঘাত বর্শা দিয়ে তাকে ছুঁড়ে ফেলবে সাঞ্চামখাবা। জা কুলি মাসের এই রাত্রিটুকুর জন্য সে পলিঙার বিছানায় আশ্রয় নেবে। সে বিছানা নিরাপদ, নির্বিঘ্ন।
.
১৮.
টলে টলে চড়াইটার দিকে উঠতে উঠতে একবার পেছন ফিরল সেঙাই। অনেক, অনেক দূরে টিজু নদীর ওপারে সালুয়ালাঙ গ্রামখানা এখন জা কুলি রাত্রির অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে।
কপালের দু’পাশে রগ দুটো সমানে লাফিয়ে চলেছে। খাদের মধ্যে আছড়ে পড়ে সমস্ত শরীরটা ফালা ফালা হয়ে ছিঁড়ে গিয়েছিল। সারা দেহে চাপ চাপ রক্ত শুকিয়ে কলো হয়ে। রয়েছে। অনেক রক্ত দেহ থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। অবসাদ আর অপরিসীম শ্রান্তিতে পেশীগুলো কুঁকড়ে কুঁকড়ে আসছে সেঙাই-এর। বুকের ভেতরটা খালি করে বড় বড় নিশ্বাস পড়তে লাগল ঘন ঘন।
চেতনাটা কেমন আচ্ছন্ন হয়ে আসছে। একবার হিমাক্ত পাথরের ওপর বসে পড়ল সেঙাই। তার অস্পষ্ট ভাবনার ওপর কতকগুলো ঘটনা জট পাকিয়ে গেল। এই দুটো দিন কেমন যেন অসত্য মনে হয়, কেমন যেন অবাস্তব। খোনকে, খাদের মধ্যে বেহুঁশ হয়ে পড়ে যাওয়া, মেহেলী, খাসেম গাছের মগডালে আতামারী পাতার ঘর, লিজোমু। এদের মধ্যে যেন কোনো যোগ নেই, মিল নেই। সব বিচ্ছিন্ন, গ্রন্থিহীন, শিথিলবদ্ধ। আবার সব মিলিয়ে এক, অখণ্ড। পাহাড়ী মানুষ সেঙাই, তার ঘোলাটে চেতনার মধ্যে এখন তাদের কোনো ধারাবাহিক ছবি ধরতে পারছে না।
শুধু মনে পড়ছে লিজোমুকে। উঃ, আতঙ্কে সমস্ত ইন্দ্রিয় যেন শিউরে ওঠে এখনও। শরীরের সমস্ত শক্তি দু’টি কবজির মধ্যে এনে সে মেরিকেতসুটা ছুঁড়ে মেরেছিল লিজোমুর বুকে। বাঁশের পাটাতনের ওপর আর্তনাদ করে আছড়ে পড়েছিল লিজোমু। তারপর বাঁশের পানপাত্র দিয়ে তার অচেতন দেহটাকে আঘাতের পর আঘাতে অসাড় করে দিয়েছিল সে। সালুয়ালা গ্রামের সর্দারকে তার খবর দেবার সব আশঙ্কাই নির্মূল করে দিয়েছিল।
তারপর আরো খানিকক্ষণ অপেক্ষা করেছিল সেঙাই। যেই উত্তর পাহাড়ের চূড়ায় সন্ধ্যার ধূসর ছায়া পড়তে শুরু হল, ঠিক তখনই বাঁশের সিঁড়িটা বেয়ে তরতর করে নিচে নেমে এসেছিল। তারও পর ঘন বনের আড়ালে আড়ালে চড়াই উতরাই উজিয়ে, উপত্যকা ডিঙিয়ে, টিজু নদীর নীল ধারা পেরিয়ে এইমাত্র এপারে চলে আসতে আসতে একবারও সালুয়ালা গ্রামখানার দিকে তাকায় নি।
মাত্র কিছুক্ষণ আগের ঘটনা। তবু যেন মনে হয়, একটা জন্মান্তর ঘটে গিয়েছে। পাথরের টিলায় বসে ফুসফুস ভরে বারকয়েক বাতাস টেনে নিল সেঙাই। তারপর পাশের একটা মেশিহেঙ ঝোঁপ ধরে উঠে দাঁড়াল।
আচমকা সেঙাই-এর নজরে পড়ল, অনেক, অনেক দূরে সালুয়ালা গ্রামের আকাশ চিরে চিরে আগুন উঠছে। সেই আগুন জা কুলি মাসের হিমাক্ত অন্ধকারে রক্তলেখার মতো ফুটে বেরিয়েছে। সেঙাই জানতেও পারল না, ওই আগুন খাসেম গাছের মগডালে আতামারী পাতার ঘরখানাকে পুড়িয়ে দিচ্ছে। সেই ঘর, যেখানে একটু আগেও সে আটক হয়ে ছিল। সে জানতেও পারল না, সেঙাই নামে এক বন্য পুরুষ কামনায় খারিমা পতঙ্গের মতো যে নারীদেহটি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সে এখন ওই আকাশছোঁয়া আগুনে ঝলসে ঝলসে মরছে।
