পলিঙা বলল, সেঙাই নেই তো এখানে?
না, আমি ভালো করে খুঁজে দেখেছি।
সে তবে গেল কোথায়? এক মুহূর্ত চুপচাপ কেটে যাবার পর কী যেন ভেবে নিল পলিঙা, তারপর বলল, সেঙাই নিশ্চয় ভেগেছে। এক কাজ করি আয়, লিজোমুকে আমরা খাদে ফেলে দিই। নইলে সদ্দার কাল সকালে খোঁজ নিলে লিজোমুকে পেয়ে যাবে। তারপর সেঙাই আর তোর ওপর খেপে উঠবে। সদ্দারকে তো জানিস।
ঠিক বলেছিস।
একটু পরেই লিজোমুর পোড়া দেহটা কাঁধের ওপর তুলে নিচে নেমে এল মেহেলী আর পলিঙ। তারপর কয়েকটা টিলা ডিঙিয়ে খাড়াই খাদটার পাশে এসে দাঁড়াল।
মেহেলী বলল, সেদিন সদ্দার দাদাকে খাদে ফেলে মারল। আজ লিজোমুটা পুড়ে মরল। বেঁচে থাকলে ওদের বিয়ে হত।
কথা বলল না পলিঙা। মাথাটা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে সায় দিল।
একটুক্ষণ দুজনেই চুপ।
পলিঙা বলল, এবার লিজোমুকে ফেলে দিই।
একটি মাত্র মুহূর্ত। লিজোমুর ঝলসনো দেহটা শূন্যে পাক খেতে খেতে অতল খাদে মিলিয়ে গেল। একটি দুর্দান্ত পাহাড়ী কামনা জা কুলি রাত্রির অন্ধকারে চিরকালের জন্য মুছে গেল।
.
১৭.
পোকরি কেসুঙের কাছে চলে এসেছে পলিঙা আর মেহেলী।
মেহেলী বলল, লিজোমুর কথা কাউকে বলিস না পলিঙা।
, তেমন সই আমি না। যা, এবার ঘরে যা। আমিও যাই। বড্ড খিদে পেয়েছে। সামনের একটা বড় টিলার দিকে উঠে গেল পলিঙা।
আর ভীরু ভীরু পা ফেলে পোকরি কেসুঙের সীমানার মধ্যে এসে পড়ল মেহেলী। এখান থেকে পরিষ্কার নজরে আসছে, বাইরের ঘরে পেন্যু কাঠের মশাল জ্বালিয়ে মুখোমুখি বসেছে তার বাপ আর তাদের গ্রামের সর্দার। সামনে রোহি মধুর পূর্ণ পানপাত্র। কাঠের বাসনে খানিকটা ঝলসানো মাংস। সর্দার আর তার বাপের বসবার ভঙ্গিটি বড় ঘনিষ্ঠ, বড় অন্তরঙ্গ।
মোষ বলির হাড়িকাঠটা পেছনে রেখে সতর্কভাবে বাঁশের দেওয়ালের পাশে এসে দাঁড়াল মেহেলী। দেহের সমস্ত শক্তিকে কান আর দু’টি চোখের মণিতে জড়ো করে রুদ্ধশ্বাসে শুনতে লাগল।
সর্দার বলল, তোকে একটা শুয়োর দিতে হবে সাঞ্চামখাবা।
মেহেলীর বাপের নাম সাঞ্চামখাবা। তারিয়ে তারিয়ে সে রোহি মধুর পাত্রটাকে শেষ করে আনছিল। এবার মুখ তুলল, কেন? শুয়োর দিতে হবে কেন?
আজ শত্রুর পুড়িয়ে মেরেছি। হুই কেলুরি বস্তির সেঙাইকে শেষ করেছি। মোরাঙে একটা ভোজ হবে না? বুড়ো সর্দার আরো নিবিড় হয়ে বসল। তারপর খাসেম গাছের মগডালে সেঙাইকে পুড়িয়ে মারার আদ্যোপান্ত কাহিনী বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলল।
হু-হু, নিশ্চয়ই হবে। কিন্তু সেঙাইটা কে?
হুই কেলুরি বস্তির ছেলে। তোর পিসি নিতিৎসুকে ছিনিয়ে নিতে এসে যে মরেছিল সেই জেভেথাঙের নাতি। কানের নিয়েঙ গয়না দুলিয়ে দুলিয়ে বলল বুড়ো সর্দার।
লাফিয়ে উঠল সাঞ্চামখাবা, বেশ করেছিস সদ্দার। পুড়িয়ে মেরে ঠিক করেছিস। একটা কেন, দুটো শুয়োর দেব আমি।
হু-হু। জানিস, হুই সেঙাই ছোকরা তার মেয়ের পিরিতের জোয়ান ছিল। ফুর্তি করার জন্যে খাসেম গাছের ঘরে তাকে পুষে রেখেছিল তোর মেয়ে। খবর পেয়ে একেবারে জ্যান্ত পুড়িয়ে এলুম। হোঃ-হোঃ-হো পোকরি কেসুঙটাকে কাঁপয়ে বুড়ো সর্দার সারা গা দুলিয়ে হেসে উঠল।
কে? আমার মেয়ে! মেহেলী হুই শত্রুরপক্ষের ছোকরার সঙ্গে পিরিত জমিয়েছে? তার সঙ্গে ফুর্তি করেছে? একেবারে বর্শা দিয়ে ছুঁড়ব মেয়েটাকে। রোহি মধুর মৌতাতে সাঞ্চামখাবার দুচোখ জ্বলে জ্বলে উঠতে লাগল। বলল, মেহেলীকে দেখেছিস সদ্দার?
সাঞ্চামখাবার কথা শুনে বেড়ার ওপাশের দু’টি কান চমকে উঠল। বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডটা ধকধক করে লাফাতে লাগল মেহেলীর।
বাঁশের পানপাত্রটা একপাশে ছুঁড়ে হুঙ্কার দিল সাঞ্চামখাবা, মেজাজটা ভালো নেই, চারটে বর্শা আর দুখুদি ধান খোয়া গেছে। ভেবেছিলাম ওগুলো দিয়ে অঙ্গামীদের কাছ থেকে আয়োঙ্গে (হার), খারোনজে (এক ধরনের দা) আর অ্যাবেয়া (তলোয়ার জাতীয় অস্ত্র) বদল । করে আনব। আর ইদিকে শয়তানী শত্তুরদের সঙ্গে মজা করেছে!
বুড়ো সর্দার লাল লাল দাঁতগুলো মেলে হাসল। বলল, ধান আর বর্শা মেহেলীই চুরি করেছে। সেঙাইকে বশ করবার জন্যে হুই বর্শা আর ধান বদল করে ডাইনি নাকপোলিবার কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে এসেছে।
ডাইনি নাকপোলিবা! কে বলল তোকে? চড়া গলার আওয়াজ এবার ফিসফিস শোনাল সাঞ্চামখাবার।
সালুনারু বলেছে। সে সব দেখেছে, সে-ই তো সেঙাইকে ধরিয়ে দিয়েছে।
সালুনারু! ও, কেলুরি বস্তি থেকে যে মাগীটাকে খেদিয়ে দিয়েছে?
হু-হু।
বাঁশের দেওয়ালের ওপাশে একটি নারীদেহে এই জা কুলি মাসের হিমাক্ত রাত্রিতে ঘাম ঝরতে শুরু করেছে। হৃৎপিণ্ডটা থেমে থেমে আসছে মেহেলীর। বাপ আর সর্দারের কথাগুলো শুনতে শুনতে চেতনাটা কেমন যেন অসাড় হয়ে যাচ্ছে।
বুড়ো সর্দার বলল, এবার মেহেলীকে বিয়ে দিয়ে দে।
হু-হু, তাই দিতে হবে। নানকোয়া বস্তির মেজিচিজুঙের বাপ বউপণ পাঠাবে বলেছে।
মেজিচিজুঙ! সে তো বাঘ-মানুষ। তার সঙ্গে বিয়ে দিবি?
হু-হু। মেহেলীর জন্যে অনেক পণ দেবে। শরদের একটা জোয়ানকে তো মেরেছিস। আরো কত জোয়ান আছে কেলুরি বস্তিতে। যুবতী বয়েস, তাগড়া ছোকরা দেখলে কি আর শত্তুর বলে বাগ মানবে! ঠিক পিরিত জমিয়ে বসবে। সারা শরীর নাচিয়ে হাসতে হাসতে বলে উঠল সাঞ্চামখাবা, যে বয়েসের যে ধরম। অন্য কারুর সঙ্গে মজবার আগেই মেহেলীর বিয়ে দেব। হুই নানকোয়া বস্তির বাঘ-মানুষই সই।
