শুধু মেহেলীর দু’টি নিরুপায় চোখের দৃষ্টি দেখছিল, কেমন করে সেঙাই নামে এক রমণীয় পুরুষ আতামারী পাতার ঘরে পুড়ে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে একসময় তার হাতের মুঠি থেকে নাকপোলিবার মন্ত্রপড়া ওষুধ ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়ল।
মেহেলী তাকাল পলিঙার দিকে। জ্বালাভরা গলায় বলল, দেখলি পলিঙা, কেমন করে সদ্দার পুড়িয়ে মারল সেঙাইকে!
সাপেথ ঝোঁপটার পাশে পাথরের মতো জমাট হয়ে গিয়েছিল পলিঙা। মেহেলীর কথাগুলো তার অবশ দেহটাকে ঝকানি দিয়ে গিয়েছে, হু-হু, এ হুই সালুনারু শয়তানীর কাজ।
চোখদুটো সাপের মণির মতো দপদপ করছে। এদিক সেদিক তাকিয়ে ভয়ানক গলায় গর্জে উঠল মেহেলী, হু-হু। দেখিস, হুই সালুনারুর কলিজা ফেঁড়ে আমি রক্ত খাব। কেলুরি বস্তি থেকে এখানে এসে শয়তানি শুরু করেছে।
একটা আস্ত ডাইনি হুই মাগী। দেখছিস না, কেমন করে এ বস্তির সদ্দারকে হাত করে নিয়েছে।
আমার কেমন যেন লাগছে পলিঙা। হুই সেঙাইটা মরে গেল, ওরা পুড়িয়ে মারল। হুই সদ্দার, হুই সালুনারু, হুই জোয়ান ছোকরারা, কাউকে আমি রেহাই দেব না। আমার পিরিতের মরদকে ওরা পুড়িয়ে মারল পঙিলা; এর বদলা আমি নেব। প্রতিহিংসায় মেহেলীর চোখমুখ উগ্র হয়ে উঠল। প্রতিটি রক্তকণা যেন তার দাউ দাউ করে জ্বলছে। দু’টি পিঙ্গল চোখের মণি চৌচির করে, তামাভ দেহের প্রতিটি ইন্দ্রিয়কে ফালা ফালা করে সেই রক্তের কণিকাগুলো যেন ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
অনাবৃত দেহ। দুজনের সারা শরীরে সামান্য আচ্ছাদনও নেই। জা কুলি মাসের হিম নির্মম হয়ে উঠেছে। তবু মেহেলী কি পলিঙার এতটুকু সাড় নেই। সেঙাই-এর বীভৎস মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দু’টি পাহাড়ী যুবতী দৈহিক যন্ত্রণার সবরকম বোধের বাইরে চলে গিয়েছে।
মেহেলী ভাবল, এর বদলা তার নিতেই হবে। প্রতিহিংসা ছাড়া তার মনে আর কোনো প্রতিক্রিয়াই নেই এই মুহূর্তে।
হঠাৎ মেহেলী চিৎকার করে উঠল, এখন কী করি বল তো পলিঙা? সেঙাইকে না পেলে শরীরে জ্বলুনি কমবে না আজ। কত আশা করেছিলুম, যাতে সেঙাই না ভাগতে পারে, তার জন্যে ডাইনি নাকপোলিবার কাছ থেকে চারটে বর্শা আর দুখুদি ধান দিয়ে ওষুধ নিয়ে এলাম। সব হুই সালুনারু মাগী নষ্ট করে দিল।
মেহেলীর আরো কাছাকাছি ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়াল পলিঙা। তারপর প্রথামতো তার বুকের ওপর হাতখানা রেখে বলল, কী আর করবি। মোরাঙের একজন জোয়ানকে ধরে লগোয়া পন্যু (প্রেমিক) বানিয়ে নে। সেঙাই যখন নেই তখন আর কী করা যাবে?
না, না। সেঙাই-এর মতো একটা জোয়ানও কি আছে আমাদের বস্তিতে? সব এক একটা ধাড়ী বাঁদর। টেমে নটুঙ। দপদপ করে জ্বলে উঠল মেহেলীর চোখ দুটো।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। জা কুলি মাসের কৃষ্ণপক্ষ সমস্ত আকাশের দিকে দিকে নিবিড় অন্ধকার ছড়িয়ে দিয়েছে। এদিকে সেদিকে দু-চারটে তারা মিটমিট করছে।
একসময় মেহেলী বলল, একবার গাছে উঠে আমার ঘরটা দেখব পলি? কাল অত উঁচু থেকে খাদের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। সেঙাই কিন্তু তখনও মরেনি। আজও তো নাও মরতে পারে।
চল, চল—
দ্রুত পা চালিয়ে খাসেম গাছটার নিচে চলে এল মেহেলী আর পলিঙা।
মেহেলী বলল, তুই এখানে দাঁড়া। আমি দেখে আসি।
বাঁশের সিঁড়িটা খুবই মজবুত। কাঁচা আতামারী লতার কঠিন বাঁধন আগুনে তেমন পোড়েনি। তরতর করে একটা বনবিড়ালের মতো ওপরে উঠে এল মেহেলী।
আতামারী পাতার চাল পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। বাঁশের পাটাতনের ওপর স্থূপাকার হয়ে রয়েছে ঘরপোড়া ছাই। আর সেই ছাইয়ের নিচে রক্তাভ আগুন এখনও একবারে নিভে যায়নি। দু হাত দিয়ে রাশি রাশি ছাই আর অঙ্গার সরিয়ে দেহটা খুঁজে বার করল মেহেলী। জ্বলন্ত অঙ্গারের আলোতে বীভৎস দেখাচ্ছে। চামড়া আর মাংস পুড়ে সমস্ত শরীরটা ঘেয়ো ঘেয়ো হয়ে গিয়েছে।
হাতড়াতে হাতড়াতে পোড়া দেহটির বুকে আচমকা ঝলসানো স্তনের আভাস পেল মেহেলী। সঙ্গে সঙ্গে একটা চমক খেলে গেল মেরুদাঁড়ার মধ্যে দিয়ে। সমস্ত ইন্দ্রিয় একসঙ্গে যেন ঝঙ্কার দিয়ে উঠল। এ তো সেঙাই নয়!
খাসেম গাছের মগডালে পাটাতনের ওপর থেকে চিৎকার করে উঠল মেহেলী, এই পলিঙা, ওপরে উঠে আয়। সেঙাই এখানে নেই, একটা মাগী পুড়ে মরেছে। সে যে কে, অন্ধকারে ঠিক বুঝতে পারছি না।
সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে ওপরে উঠে এল পলিঙা। মেহেলীর পাশে নিবিড় হয়ে বসল। চোখমুখ থেকে তার বিস্ময় ঠিকরে বেরুচ্ছে, কী ব্যাপার মেহেলী! সেঙাই মরেনি! বলিস কী?
বলছি ঠিকই। হু-হু, এই দ্যাখ।
অঙ্গারের রক্তাভ আলোতে মেহেলী আর পলিঙা অনেকক্ষণ ঝলসানো নারীদেহটির দিকে তাকিয়ে রইল। একসময় পলিঙা বলল, এ নির্ঘাত লিজোমু! এই দ্যাখ মেহেলী, বাঁ হাতের দুটো আঙুল নেই। আমাদের বস্তিতে লিজোমুরই তো বাঁ হাতের আঙুল দুটো কাটা। তাই না?
হু-হু। ঠিক, ঠিক।
কিন্তু লিজোমু এখানে এসেছিল কেন?
কী জানি!
জা কুলি মাসের রাত্রিতে দু’টি পাহাড়ী যুবতী মুখোমুখি বসে রইল। কথা বলছে না কেউ। একেবারে চুপচাপ।
চারপাশে পোড়া ঘরের স্তূপাকার ছাই। মেহেলী কি পলিঙার অস্ফুট পাহাড়ী মন সমস্ত বিচার দিয়ে, সমস্ত বুদ্ধি দিয়ে কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারছে না। কেন, কেন খাসেম গাছের মগডালে এসে একটু একটু করে ঝলসে মরল লিজোমু। মেহেলী কি পলিঙা জানে না, কেমন করে সেঙাই নামে একটা নিষিদ্ধ কামনার দিকে খারিমা পতঙ্গের মতো ঝাঁপিয়ে এসে পড়েছিল লিজোমু। কিন্তু সে কামনা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেল। সে কামনা একটু একটু করে পুড়িয়ে মারল লিজোমুকে।
