হো-ও-ও-ও-আ-আ–
শোরগোল উদ্দাম হয়ে উঠেছে। রীতিমতো ধুন্ধুমার। সালুয়ালা গ্রামের জোয়ানেরা কি জানত, জা কুলি মাসের এই রাত্রিটা তাদের জন্য এমন একটা হত্যার সুযোগ নিয়ে আসবে?
হো-ও-ও-ও-আ-আ–
খাসেম গাছটার চারপাশ ঘিরে ধরল জোয়ান ছেলেরা। পাহাড়ী মাটির ভাঁজে মশালগুলো পুঁতে দিল। অন্ধকার যেন চারপাশে জমাট বেঁধে গিয়েছে। আর সেই কঠিন অন্ধকার চিরে চিরে মশালের শিখা জ্বলছে। মশালের আলোগুলির চারিদিক ঘিরে গুঁড়ো গুঁড়ো সাদা বরফ ঝরছে। জা কুলি মাসের অসহ্য হিমাক্ত রাত্রি। কিন্তু আদিম এক হত্যার নেশায় সালুয়ালা গ্রামের জোয়ানেরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এই হিমঝরা রাত্রি তাদের বিন্দুমাত্র বিচলিত করতে পারছে না।
হো-ও-ও-ও-আ-আ—
উত্তেজিত গলায় কে যেন বলল, কি রে সদ্দার, কী করব এবার?
আরো একটা গলা শোনা গেল, আমি কিন্তু সেঙাই-এর মুণ্ডুটা কাটব।
না, আমি, আমি। সর্দারের কাছে সকলেই এক দাবি জানাল; তারস্বরে চিৎকার করতে লাগল।
চুপ কর টেফঙের বাচ্চারা। আহে ভু টেলো। মাথা ঝাঁকিয়ে বুড়ো সর্দার ধমকে ওঠে। বুকের ওপর সাপের হাড়ের মালাটা ঝনঝন করে বেজে উঠল। মাথায় মোষের শিঙের মুকুট দুলতে লাগল। রক্তচোখে জোয়ানগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে বুড়ো সর্দার বলল, কেউ উঠে হুই ঘর থেকে শয়তানের বাচ্চাটাকে ছুঁড়ে নিয়ে আয়।
উত্তেজনায় একজন সিঁড়ির দিকে ছুটে গেল। তার ডান হাতের মাথায় একটা অতিকায় খারে বর্শা। বাঁ হাত দিয়ে সিঁড়ির বাঁশ চেপে ধরল জোয়ানটা। আচমকা পেছন থেকে আর একজন দুহাতে কোমর জড়িয়ে ধরে টেনে নামিয়ে দিল তাকে, কি রে টেফঙ, মরতে যাচ্ছিস নাকি? ওপর থেকে সেঙাই যদি বর্শা হাঁকড়ায়, তখন? •
তাই তো, এই কথাটা আগে ভেবে দেখেনি কেউ। ওপর থেকে সেঙাই যদি বর্শা চালায়, তবে টুপ করে একটা পাকা খাসেম ফলের মতো নিচে পড়ে যাবে। নির্ঘাত মৃত্যু।
বুড়ো সর্দার জ্বলন্ত চোখে খাসেম গাছের মগডালে আতামারী পাতায় ছাওয়া ছোট্ট ঘরখানার দিকে তাকিয়ে রইল।
আচমকা সালুনারু বলল, উঠলে নির্ঘাত বর্শা দিয়ে খুঁড়বে সেঙাই। বর্শা চালাতে ও ভারি ওস্তাদ। তার চেয়ে পুড়িয়ে মার।
হো-ও-ও-ও-আ-আ–
হো-ও-ও-ও-আ-আ–
ছোট্ট সালুয়ালা গ্রামটা পাহাড়ী মানুষগুলোর অনবরত চিৎকারে শিউরে উঠতে লাগল। খাসা বুদ্ধি জুগিয়েছে সালুনারু। সকলে মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে সায় দিল, হুস্থ, সেই ভালো।
বুড়ো সর্দার বলল, কিন্তু আগুন ধরাব কেমন করে?
টেনে টেনে ব্যঙ্গভরা গলায় সালুনারু বলল, এই বুদ্ধিতে সদ্দার হয়েছিস! বাঁশের ডগায় মশাল বেঁধে আগুন লাগিয়ে দে।
চুপ কর শয়তানের বাচ্চা। আমার বুদ্ধি নেই? খেঁকিয়ে উঠল বুড়ো সর্দার, কিন্তু খেকানিটা ভয়ানক শোনল না। মনে মনে সে সালুনারুর খাসা মগজের তারিফ করল। অরপর জোয়ানদের দিকে তাকিয়ে বলল, যা, বাঁশ নিয়ে আয় খানকয়েক।
হো-ও-ও-ও-আ-আ–
খাসেম গাছের চারপাশে যে পাহাড়ী ঝড়টা এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ছিল, এবার সেটা উপত্যকার দিকে সাঁ সাঁ করে নেমে গেল।
একটু পরেই খানকয়েক বাঁশ কেটে নিয়ে এল জোয়ানেরা। তারপর সেই বাঁশের ডগায় মশাল বেঁধে বুড়ো সর্দারের দিকে তাকাল।
বুড়ো সর্দার বলল, এবার হুই ঘরে আগুন লাগিয়ে দে।
হোও–ও–ও-আ-আ–
আকাশের দিকে দিকে জোয়ানদের গলা থেকে ভয়ানক চিৎকার উঠল। সঙ্গে সঙ্গে মশালগুলো মেহেলীর ঘরখানার দিকে উঠে গেল।
হো-ও-ও-ও-আ-আ–
আতামারী পাতার চালে আগুন লেগেছে। চারপাশ থেকে লকলকে জিভ মেলে ঘরখানাকে ঘিরে ধরেছে অগ্নিশিখা। ফট ফট শব্দে বাঁশ ফাটছে। লতার বাঁধন ছিঁড়ছে। খড়ের দেওয়াল পুড়ে যাচ্ছে। খাসেম গাছের মগডালে নিষ্ঠুর আগুন, আর সেই সঙ্গে এই আদিম হত্যার উল্লাসে সালুয়ালা গ্রামের অজস্র জোয়ান একটানা চিৎকার করে চলেছে, হো-ও-ও-ও-আ-আ-, হো-ও-ও-ও-আ-আ–
আচমকা এই আগুন আর নিচের এই চিৎকারকে চমকে দিয়ে একটা তীক্ষ্ণ আর্তনাদ শোনা গেল। খাসেম গাছের ডালে জ্বলন্ত ঘরখানা থেকে সেই আর্তনাদ জা কুলি মাসের হিমাক্ত রাত্রিটাকে যেন দুমড়ে মুচড়ে একাকার করে ফেলতে লাগল, আ-উ-উ-উ-আ–
হো-ও–ও–ও-আ-আ—
নিচে পাথুরে মাটিতে জোয়ানেরা চেঁচাচ্ছে। খাসেম গাছের মগডালে এই মৃত্যুকে তারা উপভোগ করছে, লাফাচ্ছে, পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে নাচছে। নাচতে নাচতে সকলে দলা। পাকিয়ে যাচ্ছে।
বীভৎস গলায় বুড়ো সর্দার বলল, শয়তানের বাচ্চাটা মরছে। আমাদের বস্তির জিতই রয়ে গেল। সেঙাইর ঠাকুরদাকে অনেক কাল আগে আমরা মেরেছি। এবার সেঙাইকে মারলাম। হোঃ—হোঃ—হোঃ–
শত্তুর মরল। আজ রাত্তরে কিন্তু ভোজ দিতে হবে সদ্দার। জোয়ান ছেলেরা নতুন করে হল্লা শুরু করে দিল।
দেব, নিশ্চয়ই দেব রে শয়তানের বাচ্চারা। আজ আমাদের কী আনন্দের দিন! সকলের কাছ থেকে একটা করে শুয়োর নিয়ে মোরাঙে খাওয়া হবে।
হোও-ও-ও-আ-আ–
খাসেম গাছের মগডালে আগুন ক্রমশ নিভে আসছে। আতামারী পাতার ছোট্ট ঘরখানা পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।
একসময় সকলে খাড়া উপত্যকা বেয়ে চলে যেতে শুরু করল। এই খাসেম গাছের তলা থেকে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে মশালের শিখাগুলো। শুধু ভয়াল শোরগোলের বেশটা এখনও ভেসে আসছে, হো-ও-ও-ও-আ-আ–
একটা বড় সাপেথ ঝোঁপের কিনার থেকে এই আগুন, এই হত্যা আর জোয়ানদের ভয়ঙ্কর উল্লাস দেখছিল পলিঙা আর মেহেলী। খাসেম গাছের মগডালে ওই আগুনের মতোই চোখ দুটো জ্বলছিল তার, কিন্তু কোনো উপায় ছিল না। সামনে এগিয়ে এলে সেঙাইর সঙ্গে তাকেও পুড়ে ছাই হয়ে যেতে হত। সর্দারের ক্রোধ তাকে ক্ষমা করত না।
