কখন যে বিশাল খাসেম গাছটার তলায় এসে দাঁড়িয়ে পড়েছিল লিজোমু, খেয়াল ছিল না। চারিদিকে একবার চনমনে চোখে তাকাল। অনেক চড়াই উতরাই, অনেক টিলা উপত্যকা ডিঙিয়ে এসেছে। ঘন ঘন নিশ্বাসে বুকখানা উঠছে, নামছে।
চারপাশে বেলাশেষের রং নিভে আসতে শুরু করেছে। রোদ সরে গিয়েছে দূরের পাহাড়চূড়ায়।
আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না লিজোমু, তরতর করে বাঁশের সিঁড়ি বেয়ে ওপরের ঘরে চলে এল।
পাটাতনের ওপর উবু হয়ে বসে ছিল সেঙাই। চমকে উঠল, কে? কে রে, মেহেলী এসেছিস নাকি?
ময়াল সাপিনীর মতো লিজোমু হিসহিস করে উঠল, কেন? মেহেলী ছাড়া আর কোনো জোয়ান মাগী নেই সালুয়ালাঙ বস্তিতে?
কে তুই?
আমি লিজোমু। কেন তুই আমার পিরীতের মরদটাকে মেরেছিস সেঙাই?
ঘরের মধ্যে আবছা অন্ধকার। আতামারী পাতার চালের ফাঁক দিয়ে বেলাশেষের খানিকটা ঝাপসা রং এসে পড়েছে। কেমন যেন রহস্যময় হয়ে উঠেছে পরিবেশটা।
গলাটা এবার কেঁপে উঠল সেঙাই-এর, কে তোর পিরিতের মরদ?
খোনকে।
খোকে! সেঙাই চেঁচিয়ে উঠল।
হু-হু, খোকে। তুই খোকেকে মেরেছিস। আমার জোয়ান নাগরটা মরেছে, তার দাম দিতে হবে। আবছা অন্ধকারেও লিজোমুর চোখদুটো যেন জ্বলছে।
কী দাম দেব? শিউরে উঠল সেঙাই, আমাকে মারিস না। কাল রাত্তিরে আমি খাদে পড়ে গিয়েছিলাম। খুব লেগেছে। সারা গা কেটেকুটে ফালাফালা হয়ে গেছে।
না, তোকে মারতে আসিনি সেঙাই। খোনকের জানের দাম তুই নিজে। তুই আমার লগোয়া পন্য (প্রেমিক) হ। তোকে আমি চাই। সেঙাই-এর পাশে অন্তরঙ্গ হয়ে বসল লিজোমু।
তোকে আমি চাই না। মেহেলী কোথায়? তামুনুর (চিকিৎসক) কাছ থেকে আমাকে ওষুধ এনে দেবে বলেছিল, এখনও এল না তো? ছিটকে পাটাতনের আর এক পাশে সরে গেল সেঙাই। তরপর ক্রুদ্ধ গলায় বলল, তোকে আমি চাই না। তুই ভাগ।
আমাকে চাস না! বেশ, তা হলে খোকেকে ফেরত দে। আমার তো আর পিরিত করার মরদ নেই। সাপের মাথার মণির মতো লিজোমুর চোখ দুটো দপদপ জ্বলছে, তুই আমার হ। আমাকে তোর সঙ্গে নিয়ে যা তোদের বস্তিতে।
আমি পারব না।
পারবি না? মেহেলীর সঙ্গে পিরিত করতে পারবি, আর আমার সঙ্গে পারবি না! তোকে পারতেই হবে। বলতে বলতে সেঙাই-এর আরো কাছে সরে এল লিজোমু। গাঢ় গলায় বলল,
তুই আমাকে পিরিত করবি কিনা বল?
না।
তবে খোনকেকে মারলি কেন?
আমার ঠাকুরদাকে তোরা অনেক কাল আগে মেরেছিস। তার শোধ তুললাম। তবু আপশোশ রইল। খোনকের মাথাটা আমাদের মোরাঙে নিয়ে যেতে পারলাম না। শেষ দিকে কেমন যেন বিমর্ষ শোনালো সেঙাইর গলাটা।
বেশ, শোধবোধ হল। এবার আমাকে তোর লগোয় লেন (প্রেমিকা) করে নে।
না।
না! আমার সঙ্গে পিরিত করবি না! তা হলে মনে রাখিস সেঙাই শয়তান, আমার চোখের সামনে মেহেলীর সঙ্গে তোর পিরীত জমতে দেব না। তোকে আর তোদর বস্তিতেও ফিরতে হবে না। আমি এখুনি সদ্দারকে ডেকে আনছি। পাটাতনের ফোকর দিয়ে বাঁশের সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে দেল লিজোমু।
এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে রইল সেঙাই। আচমকা তার শিরায় শিরায় চমক খেলে গেল যেন। নিষ্ক্রিয়তা দেহমন থেকে ঝরে গেল। সে জানে, লিজোমু যেই তাদের সর্দারকে খবর দেবে, সঙ্গে সঙ্গে এই গাছের চারপাশে তীরধনুক আর বর্শার ফলায় মৃত্যু ছুটে আসবে। নাঃ, কোনোমেতেই লিজোমুকে নামতে দেওয়া হবে না খাসেম গাছের মগডালের এই ছোট ঘরখানা থেকে। সাঁ করে পাটাতন থেকে মেহেলীর একখানা মেরিকেতসু তুলে নিল সেঙাই। তারপর তাক করে ছুঁড়ে মারল।
অব্যর্থ লক্ষ্য। ধারাল অস্ত্রটা লিজোমুর কোমল বুকের ওপরে গেঁথে গেল। ফিনকি দিয়ে টকটকে তাজা রক্ত বাঁশের পাটাতন ভিজিয়ে দিতে লাগল। আর্তনাদ করে ঘরের মধ্যেই লুটিয়ে পড়ল লিজোমু, আ-উ-উ-উ–
ইতিমধ্যে একটা বাঁশের পানপাত্র তুলে নিয়েছে সেঙাই। সেটা দিয়ে লিজোমুর দেহের ওপর একটার পর একটা আঘাত দিয়ে চলল। অবিরাম, বার বার।
খানিক পর লিজোমুর দেহটা একেবারেই নিস্পন্দ হয়ে গেল। এবার থামল সেঙাই। লিজোমুকে এই ঘর থেকে ছেড়ে দিলে তার নিজের মৃত্যু ছিল অনিবার্য।
পাটাতনের ফোকর দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল সেঙাই। পাহাড়ী উপত্যকা থেকে দিনের আলো মুছে গিয়েছে। অন্ধকার নেমে আসছে উত্তর পাহাড়ের চূড়ায়। আসন্ন রাত্রির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটা বিচিত্র চিন্তা খেলে গেল সেঙাই-এর মাথায়।
.
১৬.
জা কুলি মাসের রাত্রি অনেক গম্ভীর হয়েছে। প্রথম প্রহর পার হয়ে গিয়েছে খানিকটা আগে।
হো-ও-ও-ও-আ-আ—
হো-ও-ও-ও-আ-আ–
আচমকা সালুয়ালা গ্রামটা কেঁপে কেঁপে উঠল। অজস্র জোয়ানের গর্জনে শিউরে উঠল হিমাক্ত অন্ধকার।
পেন্যু কাঠের অনেকগুলো মশাল অন্ধকারকে ফালাফালা করে ছুটে আসছে খাসেম গাছটার দিকে। মশালের আলোতে বর্শার ফলাগুলো ঝকমক করে উঠছে। উদ্দাম গতিতে ছুটে আসছে একটা পাহাড়ী ঝড়। জোয়ান মানুষের ঝড়। মাথায় তাদের মোষের শিঙের মুকুট। পরনে মানুষের মুণ্ডু-আঁকা পী মুঙ কাপড়। দুচোখে হত্যার প্রতিজ্ঞা।
একেবারে সামনে রয়েছে সালুনারু আর বুড়ো সর্দার।
সর্দার গর্জে উঠল, কোথায় সেঙাই? কেলুরি বস্তির শয়তান আমাদের খোনকেকে মেরেছে। মুণ্ডু ছিঁড়ে মোরাঙে ঝুলিয়ে রাখবে আজ। ইজা হান্টাসা সালো।
সালুনারু বলল, তবে বুঝব সদ্দার তোর মুরোদ। শুধু কি খোকেকে কুঁড়েছে হুই সেঙাই, মেহেলীর সঙ্গে পিরিতও জমিয়েছে। তার ঘরে রাত কাটাতে এসেছে এ বস্তিতে। গাছের মাথায় মেহেলীর ঘরে আছে টেফঙের বাচ্চাটা।
