আচ্ছা, তাই দেব। ডাইনিই বানিয়ে দেব তোকে। কিন্তু এখানে থাকতে হবে। পারবি তো?
বুকটা কেঁপে উঠল সালুনারুর। ভীরু গলায় সে বলল, পারব।
আচমকা সুড়ঙ্গের ওপর আবার তিনটি ছায়া পড়ল।
গুহার মধ্য থেকে তীক্ষ্ণ গলায় চিৎকার করে উঠল নাকপোলিবা, কে? কে ওখানে? ভেতরে আয় শয়তানের বাচ্চারা।
আমরা পিসি। মেহেলী, লিজোমু আর পলিঙা হামাগুড়ি দিয়ে গুহার মধ্যে ঢুকল।
নাকপোলিবা বলল, কী চাই তোদের?
মেহেলী বলল, তোর ওষুধের দাম নিয়ে এসেছি পিসি। ওষুধ দে।
কই, দেখি দেখি–
মেহেলীর হাতের মুঠি থেকে চারটে বর্শা আর দুখুদি ধান ছিনিয়ে নিল ডাইনি নাকপোলিবা। সেগুলো পাথরের খাঁজে লুকিয়ে রাখতে রাখতে বলল, কিসের ওষুধ?
সেদিন আমি আর পলিঙা এসেছিলুম। তোকে বলে গেলুম, সেঙাইকে আমার মনে ধরেছে। ওকে আমার চাই। আমাদের শত্রু ওরা, তাই বশ করতে হবে।
হু-হু, মনে ধরেছে
এপাশ থেকে সালুনার তীব্র গলায় বলে উঠল, সেঙাই? কোন সেঙাই? কেলুরি বস্তির সেঙাই নাকি?
হু-হু–শান্ত গলায় বলল মেহেলী।
সেঙাই না তোর দাদাকে বর্শা দিয়ে কুঁড়েছে? বিস্ময়ে কেঁপে উঠল সালুনারুর গলা।
বর্শা দিয়ে কুঁড়েছে দাদাকে, তাতে আমার কী? সে আমার পিরিতের মানুষ। তাকে আমার চাই। কণ্ঠটা কেমন আবিষ্ট হয়ে এল মেহেলীর।
চুপ কর সব। কত দেখলাম এই বয়েসে। পিরিত হয়েছে, তা সে যত শত্ৰুই হোক, বর্শা দিয়ে ফুড়ে যাক নিজেকে, তবু বিছানায় শুলে তার কথা মনে পড়ে। তাকে না হলে ঘুম আসে না। মন সোয়াস্তি মানে না। কী বলিস লো মেহেলী? বুকের মধ্যে যেন ঘা মেরে যায় জোয়ানেরা। হিঃ হিঃ করে গা-ছমছম হাসি হেসে উঠল ডাইনি নাকপোলিবা।
কিছুক্ষণ বিরতি। সুড়ঙ্গের ওধারে বনময় উপত্যকায় বিকেলের রোদ নিভে আসতে শুরু করেছে। ছায়া ছায়া হয়ে আসছে পাহাড়ী পৃথিবী। গুহার অন্ধকার আরো ঘন হচ্ছে।
একসময় মেহেলী বলল, আমার ওষুধ দে পিসি।
সেঙাইকে আটক করেছিস তো? যে ওষুধ দেব, তার গায়ে না ছোঁয়ালে সে বশ হবে না কিন্তু। একবার ছোঁয়াতে পারলে পোষা বাঁদর বনে যাবে।
হু-হু। সেঙাই শয়তানটাকে আটক করেছি আমার শোবার ঘরে।
শোনামাত্র একটি মুহূর্তও দাঁড়াল না লিজোমু। সুড়ঙ্গপথের মধ্য দিয়ে একটা ছিলামুক্ত তীরের মতো তার নগ্ন দেহটা সাঁ করে বাইরের উপত্যকায় ছিটকে পড়ল।
সেঙাই! খ্যাপা একটা বাঘিনীর মতো লাফিয়ে উঠল সালুনারু। কেলুরি গ্রামের একজনকে অন্তত সে তার থাবার সীমানায় পেয়েছে। কেলুরি গ্রাম! বুড়ো খাপেগা তাকে বর্শা দিয়ে শাসিয়ে দিয়েছে, ও গ্রামে ঢুকলে আর প্রাণ নিয়ে ফিরতে হবে না। দেহের প্রতিটি ইন্দ্রিয় প্রখর হয়ে উঠল সালুনারুর। সে বলল, আমিও যাব একটু সালুয়ালাঙ বস্তিতে। সে-ও আর দাঁড়াল না। সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে তার অনাবৃত দেহ একটা নিক্ষিপ্ত বল্লমের মতো বাইরের অরণ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।
একপাশে নিথর হয়ে বসে সব কিছু দেখল আর শুনল পলিঙা এবং মেহেলী।
ইতিমধ্যে রাশি রাশি বাঁশের চোঙা বার করেছে বুড়ি নাকপোলিবা। পোড়া চুল, পিঁপড়ের মাটি, গুনু পাতা আর আতামারী লতার শিকড় মুঠোতে নিয়ে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে লাগল সে। মাঝে মাঝে একটানা ফুঁ দিয়ে চলল। তারপর মরা মানুষের করোটি আর মোষের হাড় সেগুলোতে ঠেকিয়ে মেহেলীর দিকে জীর্ণ হাতখানা বাড়িয়ে দিল নাকপোলিবা, এগুলো সেঙাইয়ের গায়ে ঠেকাবি। খবদ্দার, ও যেন দেখতে না পায়। দেখবি একটা পোষা বাঁদর হয়ে দিনরাত তোর গায়ের গন্ধ শুকবে সেঙাই।
আবার অট্টহাসি বেজে উঠল নাকপোলিবার নিদাত মুখে। সে হাসি গুহার অন্ধকারে ভয়ানক হয়ে বাজতে লাগল।
১৫. ছুটে চলেছে লিজোমু
১৫.
ছিলামুক্ত তীরের মতো ছুটে চলেছে লিজোমু। পায়ের তলা দিয়ে সরে সরে যাচ্ছে চড়াই উতরাই। সরে যাচ্ছে উপত্যকা আর মালভূমি। এক টিলা থেকে আর এক টিলার ওপর দিয়ে এগিয়ে চলেছে সে। পায়ের নিচে ছিটকে যাচ্ছে পাথর, এবড়োখেবড়ো রুক্ষ মাটি, আর অস্ফুট চেতনার ওপর সাঁ সাঁ করে ছুটে ছুটে যাচ্ছে কতকগুলো মুখ, কতকগুলো ভাবনার রেখা। সেঙাই! খোকে! মেহেলী!
খোনকেকে সর্দার ফেলে দিয়েছিল গভীর খাদের ভেতর। খোনকের সঙ্গে সঙ্গে লিজোমুর জীবন থেকে পাহাড়ী পুরুষের প্রেম কি একেবারেই মুছে গিয়েছে? না, না। টিজু নদীর এপার থেকে সে অনেকবার দেখেছে সালুয়ালা গ্রামের যৌবনকে। সেঙাইকে। এক বিচিত্র নেশায় তার আধফোঁটা মনটা সেঙাইর রূপে আবিষ্ট হয়ে ছিল। তা ছাড়া, মেহেলীর কাছে সেঙাই-এর কথা অনেক শুনেছে। তার পাহাড়ী মন বার বার দোল খেয়েছে। কিন্তু সেদিন তার জীবনে ছিল খোকে। লিজোমুর সেঙাইমুখী দেহমন খোকের পিরিতে সোহাগে একটু একটু করে নিভে গিয়েছে। তার অস্ফুট বন্য মনটা আর দু’টি পিঙ্গল চোখ ভরে খোনকে কাল পর্যন্ত বেঁচে ছিল। কিন্তু আজ আর নেই খোকে। খোনকে যদি নাই রইল পৃথিবীতে, তবে কি তার উদ্দাম যৌবন ব্যর্থ হয়ে যাবে? পাহাড়ী কুমারীরা পিরিত করবে, মনের মানুষের সঙ্গে ঘর বাঁধবে, সমাজকে ভোজ খাওয়াবে। আর সে-ই শুধু পুরুষহীন জীবন নিয়ে জ্বলে পুড়ে খাক হবে? না, না। খোকের দাম সে আদায় করবে সেঙাই-এর কাছ থেকে।
সেও পাহাড়ী মেয়ে। প্রয়োজন হলে পুরুষের যৌবনকে অন্যের কামনা থেকে ছিনিয়ে আনতে পারে। তা ছাড়া, সে পুরুষ যদি সেঙাই হয়। মেহেলী তার চোখের সামনে কেলুরি গ্রামের যৌবনকে ভোগ করবে, তা হয় না। তা হতে পারে না। অন্তত খোনকেহীন এই জীবনে লিজোমু তা সহ্য করবে না। খোনকে যদি নাই রইল, পাহাড়ী যৌবনের দাবি কি তবে চরিতার্থ হবে না? খোনকে নেই, কিন্তু তার কামনার আগুন অন্য পুরুষের দেহেও রয়েছে। খানকে নেই, কিন্তু তার ব্যগ্র আলিঙ্গন অন্য কারো দু’টি বাহুর মধ্যে থাকতে পারে। আর সে দেহ, সে বাহু যদি সেঙাই-এর হয়। সালুয়ালা গ্রামের শত্রুপক্ষ সেই পুরুষকে তার চাই।
