ডাইনি নাকপোলিবা। তার হিসাবহীন বয়সের এই জীর্ণ দেহের হাড়ে হাড়ে, চামড়ার কুঞ্চনে কুঞ্চনে, কত মন্ত্র-তন্ত্র। এই গুহার মধ্যে নির্বাসিত থেকে কত আনিজার সঙ্গে যে সে সই পাতিয়েছে, কত প্রেতাত্মার সঙ্গে যে তার অন্তরঙ্গতা!
পাহাড়ী প্রেম আর বন্য মানুষের কামনা যেমন ভীষণ, তেমনই দুর্বার। একবার দেহমনে। যৌবনের জ্বালা ধরলে সাত পাহাড়ের অরণ্যের মধ্য দিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো পাহাড়ী যুবক যুবতীরা চলে আসে নাকপোলিবার গুহায়। বর্শা আর ধানের বিনিময়ে মন্ত্রপড়া গাছের শিকড় নিয়ে যায়। নাকপোলিবার মন্ত্রপড়া শিকড়ের মহিমায় নাকি কামনার মানুষটি একটি পোষা বানরের মতো ধরা দেয়।
জা কুলি মাসের বিকেল। বাইরের উপত্যকায় ঘন রোদ ছড়িয়ে রয়েছে। সোনালি আমেজে মাখামাখি হয়ে রয়েছে বন, পাহাড়, মালভূমি।
আচমকা সুড়ঙ্গের ওপর একটি ছায়া পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে গুহাগর্ভের অগ্নিপিণ্ড দু’টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। কর্কশ গলা ভেসে এল নাকপোলিবার, কে রে শয়তানের বাচ্চা, কে ওখানে?
আমি সালুনারু?
ভেতরে আয়।
হামাগুড়ি দিয়ে গুহার মধ্যে চলে এল সালুনারু। চারপাশে অন্ধকার। যেন আদিম কোনো দুর্নিরীক্ষ্য কাল থেকে রাশি রাশি প্রেত ওত পেতে রয়েছে নাকপোলিবার গুহায়। এই প্রেতগুলির সঙ্গে নাকপোলিবার সর্বক্ষণ বসবাস। বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডটা ছমছম করে উঠল সালুনারুর।
চারপাশে পাথরের ভাঁজে ভাঁজে পেন্যু কাঠের রক্তাভ আগুন জ্বলছে। আগুন নয়, যেন সেই প্রেতাত্মাদের নিষ্পলক দৃষ্টি।
নাকপোলিবা বলল, কী চাই তোর? ভালোবাসার লোককে বশ করার কায়দা শিখতে এসেছিস? তার দাম এনেছিস তো? চারটে বর্শা, দুখুদি ধান। কি লো পাহাড়ী জোয়ানী?
আতঙ্কে হৃৎপিণ্ডের ওপর রক্ত চলকে চলকে পড়ছিল সালুনারুর। এবার অনেকটা ধাতস্থ হল সে, ভালোবাসার নাগরকে বশ করতে আসিনি তোর কাছে। ডাইনি হতে এসেছি। আমাকে মন্ত্র-তন্ত্র শিখিয়ে দে। আমি ডাইনি হব।
বলে কী মেয়েটা! বয়সের হিসাব নেই নাকপোলিবার, লেখাজোখা নেই অভিজ্ঞতার। এই অসংখ্য বছরের জীবনে পাহাড়ী উপত্যকায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম কত মানুষই না দেখেছে ডাইনি নাকপোলিবা। কুরুগুলাঙ গ্রাম দেখেছে। তারপর সেই গ্রাম ভেঙে রক্তক্ষয়ের মধ্যে কেমন করে গড়ে উঠল এই কেলুরি আর সালুয়ালাঙ জনপদ, তাও দেখেছে। কত ঝড়-তুফান দেখেছে। নাকপোলিবা, পাহাড়ী পৃথিবীর কত জন্ম-মৃত্যু দেখেছে! তার সীমাসংখ্যা নেই। কত যুবক যুবতী এসেছে তাদের ভালোবাসার মানুষটিকে বশ করার মন্ত্র নিতে, সুলুক সন্ধান জানতে। কিন্তু সালুনারুর মতো এমন কথা কেউ কোনোদিন বলেনি। এমন কথা আগে আর কোনদিন শোনেনি ডাইনি নাকপোলিবা।
অগ্নিপিণ্ড দুটো আশ্চর্য বিস্ময়ে সালুনারুর মুখের ওপর স্থির হয়ে রয়েছে। সারা বুকে উল্কি। পৃথিবীর আদিম শিল্প নাকপোলিবার অনাবৃত দেহে যথেচ্ছ রেখায় আঁকা রয়েছে। শীর্ণ দু’টি স্তনের নিচে বুকটা ধুকপুক করে নড়ছে নাকপোলিবার। সে বলল, কী বললি–ডাইনি হবি!
হু-হু—
কেন? তুই কোন বস্তির মেয়ে?
আমি হুই কেলুরি বস্তির মেয়ে। আমাকে ওখানকার সদ্দার ভাগিয়ে দিয়েছে। ডাইনি হয়ে ওদের সবাইকে খতম করব। ক্রুদ্ধ সাপিনীর মতো ফণা তুলল সালুনারু, তুই আমাকে ডাইনি করে দে।
তুই বিয়ে করেছিস? সোয়ামী আছে?
বিয়ে করেছিলাম। সোয়ামীকে রেজু আনিজা মেরে ফেলেছে।
চকিত হয়ে উঠল ডাইনি নাকপোলিবা, রেঞ্জু আনিজা মেরেছে? নাম কি তোর সোয়ামীর?
রেঙকিলান।
রেঙকিলান! রেজু আনিজা! নিদাঁত মাড়ি বার করে প্রেতের মতো হেসে উঠল ডাইনি নাকপোলিবা। তার বীভৎস হাসিটা গুহার দেওয়ালে দেওয়ালে ধাক্কা খেতে খেতে ভীতিকর প্রতিধ্বনি তুলতে লাগল। হাসির দমকে আগুনের গোলক দুটো একবার নিভতে লাগল, আবার জ্বলতে লাগল।
রেঙকিলান! রেজু আনিজা! আমিই তো রেজু আনিজা। তোর সোয়ামীকে আমিই মেরেছি। কী মজার খেলা বল তো। রেঙকিলানের নাম ধরে সেদিন দক্ষিণ পাহাড় থেকে ডাক দিলাম। ব্যস, তারপরেই খাদে পড়ে শয়তানটা একেবারে খতম। আমি এতদিন খালি ভেবেছি, ছোঁড়াটা আবার মরল কিনা। তুই আমাকে বাঁচালি। খেলাটা নতুন ধরেছি কিনা। বেশ ভালোই মনে হচ্ছে। হিঃ হিঃহিঃ–আগের মতোই ফের হেসে উঠল সে।
তুই মেরেছিস আমার সোয়ামীকে? কঁপা গলায় বলল সালুনারু। কেউ শুনল না সে কথা। নাকপোলিবা না, হয়তো সালুনারু নিজেও না। প্রেতাত্মা! বুড়ি নাকপোলিবা শুধু ডাইনিই না, একটা ভয়ানক আনিজা। সে-ই তবে রেঙকিলানকে ডেকে ডেকে বিভ্রান্ত করে খাদের অতলে ফেলে মেরেছে! সালুনারুর মনে হল, একটা প্রচণ্ড উৎক্ষেপে খ্যাপা বাঘিনীর মতো তার দেহটা ঝাঁপিয়ে পড়বে ডাইনি নাকপোলিবার ঘাড়ের ওপর। তারপর ধারাল নখে নখে, দাঁতে দাঁতে টুকরো টুকরো করে ফেলবে তাকে। কিন্তু কিছুই হল না। চারপাশের পাথরের ভাজে ভাঁজে প্রেতদৃষ্টির মতো আগুন, নাকপোলিবার হাসি আর অন্ধকার। এধারে ওধারে কারা যেন হিম নিশ্বাস ফেলছে। চেতনাটা অবশ হয়ে আসতে থাকে সালুনারুর।
নাকপোলিবা বলল, ডাইনি হবি? মন্ত্র শেখার দাম এনেছিস?
আড়ষ্ট গলায় সালুনারু বলল, আমার সোয়ামীর জান নিয়েছিস। হুই জানের দামে আমাকে। ডাইনি করে দে। কেলুরি বস্তিকে আমি সাবাড় করে ছাড়ব।
