পলিঙার মুখচোখে বিস্ময় ফুটে বেরিয়েছে। বিচিত্র আগ্রহে তার চোখ দুটো চকচক করছে। পলিঙা ভরসা দিয়ে বলল, কোথায় সেঙাই? নাকপোলিবা ডাইনির কাছে যাবি কেন? তারপর গলার স্বর অনেকখানি নামিয়ে বলল, সেঙাইকে আটক করে রেখেছিস নাকি?
হু-হু। কাউকে বলিস না। তা হলে সবাই সেঙাইকে খুঁজতে শুরু করবে। সদ্দার জানতে পারলে আমার পিরিতের মরদটাকে একেবারে সাবাড় করে ফেলবে।
পলিঙা ভরসা দিয়ে বলল, না না, তুই আমার সই, তোর ভালোবাসার মানুষকে আমি ধরিয়ে দেব না। জানি সেঙাইরা এই বস্তির শত্তুর। ওকে পেলে সদ্দার নির্ঘাত বর্শা দিয়ে ফুঁড়বে।
কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে পলিঙার দিকে তাকাল মেহেলী, তাকিয়েই রইল। তার চোখের মণি দুটো আশ্চর্য কোমল হয়ে উঠেছে।
একসময় কাটিরি কেসুঙ থেকে আওশে ভোজের মাংস নিয়ে এল মেহেলী আর পলিঙা। এটা এই পাহাড়ী জনপদগুলির রীতি। আওশে ভোজের দিনে প্রতিবেশীদের মোষের মাংস বিতরণ করলে নব দম্পতির জীবন সুখ শান্তিতে ভরে উঠে।
মাংস নিয়ে ফিরতে ফিরতে মেহেলী বলল, তুই তোদের কেসুঙে মাংস রেখে আয়। তারপর আমাদের কেসুঙের পেছনে এসে দাঁড়াবি।
কেন?
কেন আবার, নাকপোলিবা ডাইনিকে দাম দিতে হবে না? তার ওষুধের দাম? সেই যে সেঙাইকে আটকে রেখে চারটে বর্শা আর দুখুদি (আড়াই সের পরিমাণ) ধান নিয়ে যেতে বলেছিল, মনে নেই তোর? খুব মৃদু শোনাচ্ছে মেহেলীর কণ্ঠ, আচ্ছা পলিঙা, নাকপোলিবা ডাইনির ওষুধে কাজ হবে তো?
নিশ্চয়ই হবে। রীতিমতো জোর দিয়ে বলল পলিঙা।
আমার বড় ভয় করে বুড়িটাকে। বলে একটু থামল মেহেলী। তারপর ফের শুরু করল, সেঙাইকে আমার চাই। যেমন করে তোক, ওকে আমার পেতেই হবে। হু-হু। সেঙাইকে যখন আটক করেছি, সারা জনমের মতো ঠিক ধরে রাখব।
কাটিরি কেসুঙে আওশে ভোজের মোষ বলি দেখতে সবাই চলে গিয়েছিল। বাইরের ঘরে এখন কেউ নেই। দ্রুত ভেতর দিকের ঘরগুলো একবার দেখে নিল মেহেলী। নাঃ, তাদের পোকরি কেসুঙ একেবারে ফাঁকা। তার বাবা-মা, এমনকি ছোট ছোট ভাইবোনেরা পর্যন্ত বুনো মোষ বলির মজা দেখতে চলে গিয়েছে। কেউ ফিরে আসেনি। পোকরি কেসুঙ এখন নির্জন।
এমন একটা অপূর্ব সুযোগ তার বরাতে লেখা ছিল তা কি জানত মেহেলী? সন্তর্পণে বাঁশের মাচানের তলা থেকে চারটে বর্শা আর ঝুড়ি থেকে ধান নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা উথলপাথল হচ্ছে। আশঙ্কায় নিশ্বাস দ্রুত তালে উঠছে, নামছে। বাপের মুখোমুখি হলে আর রেহাই থাকবে না। এই বর্শাগুলো দিয়েই তার চামড়া উপড়ে রোদে শুকোতে দেবে, যেমন করে একটা হরিণ কি চিতাবাঘের ছাল শুকোতে দেয়।
শত্রুপক্ষের ছেলে সেঙাই। তার কামনার পুরুষ। প্রতিটি রক্তকণায় সে পেতে চায় সেঙাইকে। তার আদিম আলিঙ্গনের মধ্যে ধরতে চায় সেঙাইকে। এ কথা পলিঙা আর লিজোমু ছাড়া আর কাউকে বলেনি মেহেলী। এ খবর তার বাপ জানে না, তার মা জানে না, ভাইবোনরা জানে না। একে শত্রুপক্ষের যৌবন, আর তার জন্য চারটে বর্শা আর দুখুদি ধানের বদলে ওষুধ আনার মনোবিলাসকে কিছুতেই বরদাস্ত করবে না মেহেলীর বাপ। তাই সকলের অগোচরে নাকপোলিবার ওষুধের দাম হাতিয়ে আনতে হল মেহেলীকে।
পূর্বপার্বতী কেসুঙের পেছন দিকে কথামতো দাঁড়িয়ে আছে পলিঙা। তার সঙ্গে লিজোমুও এসেছে। সতর্কভাবে চারিদিক দেখতে দেখতে পলিঙাদের কাছাকাছি চলে এল মেহেলী। বলল, চল। তিন জনে উত্তরের পাহাড়ে নাকপোলিবার আস্তানার দিকে দ্রুত পা চালিয়ে দিল।
.
বাদামি পাথরের মধ্যে দিয়ে সুড়ঙ্গটা অন্ধকার গুহায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। সেটার দু’পাশে উদ্দাম বন। গুহার মধ্যে পাথরের ভাঁজে ভাঁজে আগুন জ্বলছে। আর সেই ভয়াল অন্ধকারে পাথরের আগুনের পাশে দু’টি আগ্নেয় গোলক স্থির হয়ে আছে। এই ধক ধক অগ্নিপিণ্ড দু’টি ডাইনি নাকপোলিবার চোখ।
গ্রাম থেকে অনেক, অনেক দূরে এই ভয়ঙ্কর গুহার অন্ধকারে অতন্দ্র বসে থাকে ডাইনি নাকপোলিবা। কোন অনাদি অনন্ত কাল ধরে সে এখানে আছে, তার হিসেব নেই। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কিভাবে তার কেটে যায়, কেউ জানে না। শুধু এই নির্জন গুহার দু’টি আগ্নেয় গোলক দিবারাত্রি দূর পাহাড়ের দিকে, উপত্যকার দিকে, অনেক দূরের টিজু নদীর দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে। এই অগ্নিপিণ্ড দু’টির নির্বাণ নেই, অবিরাম জ্বলে জ্বলে নিভে যাবার মুহূর্ত কোনোকালে আসবে কিনা, আশেপাশের পাহাড়ী মানুষরা তা জানে না।
এদিকে গ্রামের মানুষরা বড় কেউ আসে না। এখানে নাকপোলিবার ডাইনি নামটা একটা বিভীষিকার মতো রাজত্ব করে। ওই দু’টি আগ্নেয় গোলকের ওপর কোনো মানুষের ছায়া পড়লে নাকি আর উপায় থাকে না। সে মানুষের রক্ত একটু একটু করে বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। তারপর একদিন একটি কঙ্কালের আকার নিয়ে কোনো পাহাড়চূড়া থেকে অতল খাদে আছড়ে পড়ে মরে যায় তাজা মানুষটা। তাই ডাইনি নাকপোলিবার দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূরের পাহাড়ে পাহাড়ে গ্রাম বসানো হয়েছে।
মানুষ আসে না, কিন্তু মাঝে মাঝে আসে যুবক-যুবতীরা। বুকে তাদের বন্য বাসনার জ্বালা। কামনার একটি পুরুষ কি একটি নারীর অভাবে পৃথিবী যখন শূন্য হয়ে যায়, যখন প্রেমিক বা প্রেমিকা ধরা দেয় না, তখন ডাইনি নাকপোলিবার কাছে ছুটে আসে তারা।
