.
কেলুরি বস্তিটা কাল সারা রাত এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমোত পারেনি। দু’টি মানুষ ছাড়া সকলে সিজিটোর কেলেঙ্কারি নিয়ে রাতভোর গল্প করেছে। একটা আঁশটে কেচ্ছার গন্ধ পেলেই হল। সেটার ওপর রং চড়িয়ে পাহাড়ী মানুষগুলো ফেনিয়ে তুলতে থাকে।
সবাই সিজিটোকে নিয়ে মেতে ছিল। শুধু বুড়ো খাপেগা তার ব্যাপারে মাথা ঘামায়নি। তার অতন্দ্র চোখে সেঙাই-এর মুখখানা বার বার ভেসে উঠেছে। গেল কোথায় ছেলেটা? এই কেলুরি গ্রামের আর তার স্যাঙাত জেভেথাঙের বংশের সম্মান যে রাখতে পারে, সে হল সেঙাই। ছেলেটার মধ্যে খাপেগা তার নিজের যৌবনকালের প্রতিচ্ছায়া দেখতে পায়। যেমন করে হোক, সেঙাইকে ফিরে পেতেই হবে।
ওদিকে জোরি কেসুঙে বাঁশের মাচানে শুয়ে ধক ধক করে চোখদুটো জ্বলছিল জামাতসুর। আশ্চর্যভাবে তারা ধরা পড়ে গেল কাল। সিজিটো! সিজিটো! সারুয়ামারু যখন কেঙে থাকত না, যখন কোহিমা কি মোককচঙে চলে যেত, সকলের অগোচরে এমনি কতদিন রাতে সে এসেছে তার বিছানায়। দু’টি বাহুর বেষ্টনে তার তামাভ শরীর জড়িয়ে ধরে দূর শহরের গল্প বলেছে। তাকে নিয়ে পালিয়ে যাবার ফন্দি এঁটেছে। একটি মনোরম স্বপ্নের কথা বলে জামাতসুর দুচোখে কোহিমা কি মোককচঙের নেশা এঁকেছে। এ দৃশ্য কেলুরি বস্তির কেউ কোনোদিন দেখেনি। সিজিটো-জামাতসুর নিভৃত জীবনের ইতিহাস সকলের কাছে গোপন ছিল। গ্রামের কেউ তাদের প্রণয়ের কথা জানত না।
সেই সিজিটোই কাল ফিরে এসেছিল কোহিমা থেকে। সারুয়ামারু ঘরে ছিল না। সুযোগ বুঝে সন্ধের পর জোরি কেসুঙে ঢুকেছিল, কই লো জামাতসু–
জামাতসু ডেকেছিল, এই তো। আয় আয়। শয়তানটা ঘরে নেই। মোরাঙের দিকে গেছে। কাল জোরি কেসুঙে নাচ আর বাজনার আসর বসেছিল। তারপরেই খোঁজ পড়েছিল সেঙাই-এর। বুড়ো খাপেগা আর জোয়ান ছেলেদের সঙ্গে মোরাঙের দিকে চলে গিয়েছিল সারুয়ামারু। সেই মানুষই কী কারণে যেন আচমকা ঘরে ফিরেছিল, আর ফিরেই পরস্পরের বাহুবন্দি দু’টি পাহাড়ী নরনারীকে দেখেছিল। সিজিটো আর জামাতসু। বন্য মানুষ। সাঁ করে বাঁশের দেওয়াল থেকে বর্শা নিয়ে ছুঁড়ে মেরেছিল সারুয়ামারু। অব্যর্থ লক্ষ্য। ফলাটা জামাতসুর কবজিতে গেঁথে গিয়েছিল। আর মাচান থেকে লাফিয়ে উল্কার মতো বাইরের পাহাড়ে পালিয়ে গিয়েছিল সিজিটো। সিজিটোর সঙ্গে সঙ্গে কোহিমায় গিয়ে ঘর বাঁধার রমণীয় স্বপ্নটাও বিলীন হয়ে গিয়েছিল জামাতসুর।
কিছুক্ষণ আগে তামুন্যর কাছ থেকে খানিকটা আরেলা পাতা নিয়ে এসে জামাতসুর কবজির ক্ষতে লাগিয়ে দিয়েছে সারুয়ামারু। তারপর বুড়ি বেঙসানুর কাছ থেকে দুটো শুয়োর আর সাতটা বর্শা এনেছে। জামাতসুর ইজ্জতের দাম। ঘরে এসে হুঙ্কার দিয়েছিল সারুয়ামারু, দ্যাখ মাগী, তোর ইজ্জতের দাম আদায় করলাম।
এখন তারই পাশে একটা প্রকাণ্ড মোষের মতো ভোঁসভোঁস করে ঘুমোচ্ছে সারুয়ামারু।
কিন্তু ঘুম আসছে না জামাতসুর। কোন সুদূরে, আকাশের আনিজা উইখুর পরপারে নির্বাসিত হয়েছে তার ঘুম। শুধু দুচোখের মণিতে একটি মুখের প্রতিচ্ছায়া ফুটে উঠেছে। সে ছবি সিজিটোর। সিজিটো এখন কত দূরে? সে কি তার কথাই ভাবছে? তার স্বপ্নই দেখছে?
.
১৪.
কাটিরি কেসুঙে আজ বিরাট ভোজ। আওশে ভোজ। এই ভোজের জন্য একটা প্রকাণ্ড মোষ বলি দেওয়া হয়েছে। কেসুঙের সামনে পাথুরে চত্বরটা রক্তে লাল হয়ে গিয়েছে। বিশাল প্রাণীটার ধড় আর মুণ্ডু আলাদা হয়ে দু’দিকে ছিটকে পড়ে রয়েছে।
পলিঙা এবং মেহেলী চলে এল কাটিরি কেসুঙে। কেসুঙের চারপাশে গ্রামের সব মানুষ পাহাড়ী মৌমাছির মতো ভনভন করছে। এমন একটা ভোজের কারণে সকলে রীতিমতো উল্লসিত। কাটিরি কেসুঙে আজ সমস্ত গ্রামখানার নিমন্ত্রণ। এই বংশের ছেলে বিয়ে করে সালুয়ালাঙ গ্রামটাকে আজ প্রথম ভোজ খাওয়াচ্ছে। প্রথমতো ভোজ দিয়ে দাম্পত্য জীবনের জন্য স্বীকৃতি আর শুভেচ্ছা আদায় করছে সমাজের কাছ থেকে।
বাঁ দিকে রান্নার আয়োজন। বড় বড় মাটির পাত্র। পুরুষানুক্রমে পুড়তে পুড়তে সেগুলো কালো হয়ে গিয়েছে। বিরাট বিরাট কাঠের হাতা। আরেক দিকে অজস্র মানুষের জটলা। তুমুল হইচইতে কাটিরি কেসুঙটা মুখর হয়ে উঠেছে, উত্তাল হয়ে উঠেছে।
এদিকে আসতে আসতে পলিঙা বলল, কি লো মেহেলী, তোর লগোয়া পনকে (প্রেমিক) তো দেখালি না? শুধু গল্পই বললি তার। কেমন দেখতে সেঙাইকে? খাসা চেহারা বুঝি?
চমকে মেহেলী তাকাল পলিঙার দিকে। হ্যাঁ, পলিঙা তার সই, তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। তার কাছে সেই আশ্চর্য বিকেলে সেঙাইকে প্রথম দেখার পর তার অনেক গল্প করেছে মেহেলী। পাহাড়ী কুমারী তার যৌবনের সমস্ত মাধুর্য দিয়ে সে গল্পে রং চড়িয়েছে। তার মনের মানুষের রূপ দিয়ে একটি চকিত বিভ্রমের সৃষ্টি করেছে পলিঙার চেতনায়।
পলিঙা আবার বলল, এত ভালো তোর পিরিতের মানুষটা! এত সুন্দর! কত কথা বলেছিস তার সম্বন্ধে, একদিনও তো তাকে দেখালি না। দেখালে আমি ভাগিয়ে নেব নাকি?
চারিদিকে একবার চনমনে চোখে তাকিয়ে চাপা গলায় মেহেলী বলল, আজ দেখাব। এখন কাটিরিদের মাংস নিয়ে বাড়ি ফিরব। তারপর যাব ডাইনি নাকপোলিবার কাছে। সেখান থেকে ফিরে তোকে দেখাব সেঙাইকে। খবদ্দার সেঙাই-এর কথা আর কাউকে বলবি না।
