বুড়ি বেঙসানুর দিকে তাকিয়ে খাপেগা বলেছে, শোন বেঙসানু, সিজিটো হুই জামাতসুর ইজ্জত নিয়েছে। তার দাম দিতে হবে তোকে। সারুয়ামারু হল জামাতসুর সোয়ামী। দুটো শুয়ার আর সাতটা বর্শা দিয়ে দে সারুয়ামারুকে।
বুনো বানরীর মতো খেঁকিয়ে উঠেছে বুড়ি বেঙসানু, কেন? এত দেব কেন? হুই জোরি বংশের বউর ইজ্জত এত দামি নাকি? বলিস কি রে খাপেগা শয়তান!
খাপেগা আর বুড়ি বেঙসানু যখন কথা বলছিল, চারপাশে মানুষের জটলাটা চুপ করে শুনছিল। ফের তারা তুমুল শোরগোল বাধিয়ে দিয়েছে। সবার ওপর গলা চড়িয়েছিল সারুয়ামারু, ইজ্জতের কথা বলতে তোর লজ্জা হল না বুড়ি মাগী? নো ইহি-আঙশিঙ ইহাঙসা! বস্তির সবাই জানে, তোর সোয়ামী জেভেথাঙের মুণ্ডু কেটে নিয়ে গিয়েছিল সালুয়ালাঙের মানুষগুলো। তার বদলা নিতে পেরেছিস? তবে কোন মুখে ইজ্জতের ফুটানি করছিস লো শয়তানী!
সকলে মাথা ঝাঁকিয়েছে, হু-হু–
এবার মিইয়ে গিয়েছে বুড়ি বেঙসানু। নিস্তেজ গলায় সে বলেছে, আচ্ছা আচ্ছা, হুই দুটো শুয়ার আর সাতটা বর্শা দিয়ে তোর বউটার ইজ্জতের দাম দেব। আমার সোয়ামীর মুণ্ডুর কথা বললি, সেঙাই যে সেদিন খোনকেকে মেরে এল। তাতে বুঝি বদলা নেওয়া হয় না?
খুব বদলা নিয়েছে! তাচ্ছিল্যে ঠোঁট দুটো বেঁকে গেল সারুয়ামারুর, মাথা আনতে পেরেছে সেঙাই? তোদের জোহেরি বংশের মাথা ওরা নিয়েছে। ওদের পোকরি বংশের মাথা যেদিন আনতে পারবি সেদিন মুখ নেড়ে কথা বলবি, তার আগে নয়। হু-হু–
হু-হু– সকলে গোলাকার কামানো মাথা ঝকিয়ে সায় দিয়েছে।
দুটো শুয়োর আর সাতটা বর্শার বদলে সারুয়ামারুর বউ জামাতসুর ইজ্জতের দাম ঠিক করে দিয়েছিল খাপেগা সর্দার। এবার সকলে ছত্রখান হয়ে যে যার কেসুঙের দিকে চলে যেতে শুরু করেছে।
ভিড়ের ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠেছিল, আমরা ভাবতাম, সিজিটোটা অন্যরকম। আমাদের সঙ্গে তার হালচাল মেলে না। এখন দেখছি তা নয়।
ঠিক বলেছিস। জা কুলি রাতের অন্ধকারে কে একজন মজাদার ভঙ্গিতে বলেছে, পরের বউর কাছে পিরিত ফুটাবে না তো কেমনতরো পাহাড়ী মানুষ! জরিমানা দেবে, দুটো মাথা ফাটবে মেয়েমানুষের জন্যে, তা নয়, মাঝে মাঝে বস্তি ছেড়ে কোথায় কোনো চুলোয় যে চলে যায় হুই সিজিটো! আজ দেখলাম, নাঃ, যতই দূরদেশে যাক, যতই সাদা মানুষের গল্প বলুক, আসলে ও পাহাড়ীই। পাহাড়ী রক্ত রয়েছে ওর বুকে। শয়তানটা আমাদের থেকে আলাদা হয়ে থাকে। এইবার? হো-হো-হো
হু-হু– আরো কজন সায় দিতে দিতে দূরের কেঙগুলোর দিকে চলে গিয়েছিল, আজকের রাত্তিরটা সিজিটোর গল্প করে কাটানো যাবে বউর সঙ্গে। বড় মজাদার কেচ্ছা।
সিজিটোর একটা নতুন পরিচয় জানতে পেরেছে কেলুরি গ্রামের মানুষগুলো। আর সেই অপূর্ব উত্তেজক পরিচয়টা নানা রঙে, নানা কথায় আর নানা রসে ফেনিয়ে ফাঁপিয়ে সারা রাত ধরে তারা উপভোগ করবে।
প্রায়ই সুদূর পাহাড়চূড়া ডিঙিয়ে, অগুনতি উপত্যকা পেরিয়ে, কত মালভূমি উজিয়ে দূরের শহরে চলে যায় সিজিটো। আশ্চর্য রহস্যময় মানুষ সে। কত বিচিত্র দেশের, কত বিচিত্র মানুষের, কত অনাস্বাদিত খাবারের গল্প বলে। একই গ্রামের মানুষ হয়েও সে যেন আলাদা। এই মুহূর্তে জামাতসুর ইজ্জত নেবার মধ্যে কেলুরি গ্রামের লোকেরা জেনে গিয়েছে সিজিটো তাদেরই মতো। তাদের সঙ্গে সিজিটোর বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই। এটুকু আবিষ্কার করে তারা খুব খুশি।
মোরাঙের সামনে থেকে কেলুরি গ্রামের মানুষগুলো যার যার কেসুঙে চলে গিয়েছিল। চারপাশে খানিক আগের হইহল্লা আর নেই।
এবার বুড়ো খাপেগা তাকিয়েছে ওঙলের দিকে। তারপর বলেছে, কি রে, সেঙাই কোথায়? তাকে নিয়ে এসেছিস?
তাকে পেলুম না।
তাকে না নিয়েই চলে এলি তোরা? খাপেগার ঘোলাটে চোখ দুটো ধক করে জ্বলে উঠেছিল, কি রে রামখোর বাচ্চারা?
কী করব, তুই বল তো জেঠা। সেঙাই-এর খোঁজেই তো গেলাম। টিজু নদীর ওপারে চিতাবাঘ নিয়ে বেরিয়েছে টেমি খামকোয়ানু (বাঘ-মানুষ)। প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যে আসতে পেরেছি, তাই যথেষ্ট। ভয়ের সুরে বলেছে ওঙলে। একটু আগের চিতাবাঘ মারতে যাবার কাহিনী, চিতাবাঘের গায়ে বর্শা লাগার পর চিতাবাঘ এবং সেই সঙ্গে একটি মানবিক গলার আর্তনাদ–কিছুই সে বাদ দেয়নি।
হু-হু, বুঝতে পেরেছি। এ হুই নানাকোয়া বস্তির মেজিচিজুঙের কাজ। হুই সালুয়ালাঙ আর নানকোয়া বস্তিতে বড় পিরিত। আচ্ছা দেখা যাক, কী করা যায়–দাঁতে দাঁত ঘষে বলেছে বুড়ো খাপেগা।
আমার মনে হচ্ছে, বুঝলি জেঠা, সেঙাই সালুয়ালাঙের দিকে যায়নি। নদীর পারে দাঁড়িয়ে আমরা কত তড়পালুম। হো হো করে অনেক হল্লা করলুম। তবু সালুয়ালাঙ বস্তির দিক থেকে কোনো সাড়া পেলুম না। ওঙলে বলেছিল।
হু-হু– আশ্চর্য গম্ভীর দেখিয়েছিল বুড়ো খাপেগার দাড়িগোঁফহীন মুখখানা। কী একটা ভাবনার অতল স্তরে সে যেন তলিয়ে গিয়েছে, তাই তো, সেঙাইটা গেল কোথায়?
এতক্ষণ মোরাঙের বাইরে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল সারুয়ামারু। এইমাত্র সে ফিরে এসে বলেছে, দুটো শুয়োর আর সাতটা বর্শা দিয়ে আমার বউর ইজ্জতের দাম দিলে চলবে না সদ্দার। হুই শয়তান সিজিটো একবার বস্তিতে ঢুকলে হয়, জানে মেরে ফেলব।
দাঁতমুখ খিঁচিয়ে গর্জে উঠেছে বুড়ো খাপেগা, চুপ কর শয়তানের বাচ্চা।
